সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি/মাদ্রিদ: সমাজ পরিবর্তনের শক্তি কোথায় লুকিয়ে? আইন, বিজ্ঞান না মানুষের অনুভূতি এই প্রশ্নের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনলেন ভারতীয় নোবেলজয়ী সমাজকর্মী কৈলাশ সত্যার্থী (Kailash Satyarthi)। স্পেনের জেএলএফ ইন্টারন্যাশনাল (JLF International) অনুষ্ঠানের সূচনার আগে তাঁর বক্তব্য ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। মানবিকতা, সাহিত্য ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর মন্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের পোস্টে কৈলাশ সত্যার্থী জানান, তিনি স্পেনে আইই স্কুল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড আর্টস (IE School of Humanities and Arts) -এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আইই ইউনিভার্সিটি (IE University) -এর সিইও দিয়েগো দেল আলকাজার বেনজুমেয়া (Diego del Alcazar Benjumea)। এই আলোচনাতেই উঠে আসে সাহিত্য ও শিল্পকলার ভূমিকা নিয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা।
কৈলাশ সত্যার্থীর কথায়, ‘সাহিত্য পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। গল্প, কবিতা, গান কিংবা শিল্প—ইতিহাসে প্রতিটি বড় ন্যায়বিচার, সমতা এবং স্বাধীনতার আন্দোলনে এগুলির প্রভাব রয়েছে।’ তাঁর মতে, শুধু তথ্য বা তত্ত্ব নয়, মানুষের মন ও অনুভূতিতে যে পরিবর্তন আসে, তার পেছনে সাহিত্য ও শিল্পের বড় ভূমিকা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আইন মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, বিজ্ঞান জ্ঞান বাড়ায়। কিন্তু সাহিত্য মানুষের বিবেককে স্পর্শ করে।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান, সমাজে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে হলে মানুষের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধকে জাগিয়ে তুলতে হবে, আর সেই কাজটাই করে সাহিত্য।
কৈলাশ সত্যার্থী তাঁর বক্তব্যে মানবিকতার মূল উৎস নিয়েও আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ জন্মগতভাবেই সহানুভূতিশীল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভয়, ঘৃণা, অহংকার এবং বিভাজনের স্তর সেই মানবিকতাকে ঢেকে দেয়।’ তাঁর মতে, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং শিল্প সেই স্তরগুলো সরাতে সাহায্য করে এবং মানুষের ভিতরের সহানুভূতিকে আবার জাগিয়ে তোলে। এই প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ‘যখন আমরা মানুষের আত্মাকে আলোকিত করি, তখন সমাজও আলোকিত হয়। আর সমাজ আলোকিত হলে পরিবর্তন সম্ভব হয়।’ তাঁর এই বক্তব্য ইতিমধ্যেই বহু মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
জেএলএফ ইন্টারন্যাশনাল, যা জয়পুর লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল (Jaipur Literature Festival) -এর আন্তর্জাতিক সংস্করণ, সেখানে বিশ্বের নানা প্রান্তের সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ এবং শিল্পীরা একত্রিত হন। এই মঞ্চে কৈলাশ সত্যার্থীর বক্তব্য নতুন করে সাহিত্য ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে অনেককেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর বহু মানুষ তাঁর বক্তব্যের প্রশংসা করেছেন। কেউ লিখেছেন, ‘আজকের বিভক্ত সমাজে এই ধরনের চিন্তাভাবনা খুবই জরুরি।’ আবার কেউ বলেছেন, ‘শুধু প্রযুক্তি নয়, মানবিকতার দিকেও নজর দেওয়া দরকার।’
কৈলাশ সত্যার্থী দীর্ঘদিন ধরে শিশু অধিকার এবং শিক্ষার জন্য কাজ করে চলেছেন। তাঁর কাজের জন্যই তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তাঁর এই বক্তব্যে সেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি সবসময়ই সমাজে সহমর্মিতা এবং সমতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের সংঘাত, বিভাজন এবং সামাজিক সমস্যা দেখা যাচ্ছে, তখন সাহিত্য ও শিল্পের ভূমিকা নিয়ে তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন যতই এগোক, মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখা ততটাই জরুরি। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এক ধরনের সামাজিক বার্তা দিয়েছেন, পরিবর্তন শুধু নীতিনির্ধারণ বা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং মানুষের মন ও চিন্তার পরিবর্তনই আসল চাবিকাঠি। আর সেই পরিবর্তনের অন্যতম মাধ্যম সাহিত্য ও শিল্প। প্রসঙ্গত, স্পেনের মঞ্চ থেকে উঠে আসা এই ভাবনা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্ব পেয়েছে। কৈলাশ সত্যার্থীর এই বার্তা শুধু সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Kailash Satyarthi : কৈলাস সত্যার্থী: ‘শিশুরা যেন শুধু স্বপ্ন দেখে না, সেই স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেলতে পারে’



