BJP new state committee Bengal, Samik Bhattacharya | ভোট সামনে রেখেই সাংগঠনিক ছক: শমীকের নতুন কমিটিতে বিজেপির ‘লড়াই’ আর ‘লড়ানো’র বিভাজন

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমশ বাড়তে থাকলেও, তার অনেক আগেই সংগঠনের রণকৌশল তৈরি করে ফেলল রাজ্য বিজেপি। নতুন রাজ্য কমিটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই পরিষ্কার হয়ে গেল, কারা ভোটে লড়বেন আর কারা সংগঠনের ভরকেন্দ্র হয়ে ভোট করাবেন। বিজেপি’র রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Shamik Bhattacharya) -এর ঘোষিত এই কমিটিতে এক দিকে যেমন সুকান্ত মজুমদার (Sukanta Majumdar) জমানার বহু পরিচিত মুখ দায়িত্বে বহাল, তেমনই অন্য দিকে ‘আদি’ ও ‘নব্য’ বিজেপির ভারসাম্য রক্ষার সচেতন প্রয়াসও চোখে পড়েছে। এই কমিটি শুধু আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির রাজনৈতিক অঙ্কের খসড়া বলেই মত রাজনৈতিক সমালোচকদের।

শমীক ভট্টাচার্য ফেসবুকে বাংলার শিক্ষার অবনতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ছাত্রশূন্য স্কুল, শিক্ষক সংকট, গবেষণার পতন, সব মিলিয়ে রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্র নিয়ে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি।
শমীক ভট্টাচার্য। বিজেপি-এর রাজ্য সম্পাদক, পশ্চিমবঙ্গ। ছবি : সংগৃহীত

বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোয় সভাপতির পরে সাধারণ সম্পাদক পদকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে ধরা হয়। সেই কারণেই নতুন কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে কারা থাকছেন, কারা বাদ পড়ছে, তা নিয়ে আগ্রহ ছিল রাজনৈতিক মহলে। সুকান্ত মজুমদারের সময়ে রাজ্য বিজেপির পাঁচ জন সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে দু’জন এই কমিটিতেও একই দায়িত্বে বহাল রইলেন।

আরও পড়ুন : BJP Kerala, Thiruvananthapuram Mayor | ৪৫ বছরের বামদূর্গ ভেঙে ইতিহাস, তিরুবন্তপুরমে বিজেপির মেয়রকে চিঠি লিখে ‘নতুন রাজনীতির’ বার্তা মোদীর

তাঁরা হলেন হুগলির প্রাক্তন সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায় (Locket Chatterjee) এবং পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় মাহাতো (Jyotirmoy Mahato)। তাঁদের রেখে দেওয়া মানেই সংগঠনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বলেই মনে করছে বিজেপির অন্দরমহল। অন্য দিকে, আগের কমিটির বাকি তিন সাধারণ সম্পাদক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় (Jagannath Chatterjee), অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) এবং দীপক বর্মন (Dipak Barman), এই তিনজনকে সরাসরি সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে সহ-সভাপতি করা হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অগ্নিমিত্রা আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক এবং দীপক ফালাকাটার বিধায়ক। বিজেপি সূত্রের খবর, দু’জনেই আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে আবার লড়বেন। জগন্নাথ গত বিধানসভা নির্বাচনে সিউড়ি কেন্দ্রের প্রার্থী ছিলেন এবং এ বারও তাঁকেই ওই কেন্দ্রে নামানো হতে পারে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।

এই রদবদলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিজেপি নেতৃত্বের একাংশ স্পষ্ট করেছে, ‘নির্বাচন লড়া আর নির্বাচন লড়ানো এক বিষয় নয়।’ যাঁরা ভোটে নামবেন, তাঁরা নিজেদের কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকবেন। কিন্তু যাঁরা সাধারণ সম্পাদক পদে থাকবেন, তাঁদের দায়িত্ব গোটা রাজ্যে দলকে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়া। অর্থাৎ, শমীক ভট্টাচার্য -এর নতুন কমিটিতে এই দুই ভূমিকার স্পষ্ট বিভাজনই মূল দর্শন। এই নীতির নেপথ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল (Sunil Bansal)। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভোটে লড়া এবং শীর্ষ সাংগঠনিক দায়িত্ব একসঙ্গে চলবে না। নতুন কমিটিতে তাঁর সেই নির্দেশিকার প্রতিফলন পরিষ্কার। সাধারণ সম্পাদক পদে লকেট ও জ্যোতির্ময় ছাড়াও নতুন মুখ হিসেবে জায়গা পেয়েছেন উত্তরবঙ্গের বাপি গোস্বামী (Bapi Goswami), রাঢ়বঙ্গের সৌমিত্র খাঁ (Saumitra Khan) এবং কলকাতার শশী অগ্নিহোত্রী (Shashi Agnihotri)। জ্যোতির্ময় ও সৌমিত্র সাংসদ হওয়ায় বিধানসভা ভোটে তাঁদের লড়ানো হবে না। লকেট নিজেই ভোটের ময়দানে না নেমে সাংগঠনিক কাজে মন দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বাকি দুই সাধারণ সম্পাদককেও সংগঠনের দক্ষ ‘ম্যানেজার’ হিসেবেই বেছে নেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় স্পষ্ট ‘আদি’ ও ‘নব্য’ বিজেপির সমন্বয়। বহুদিনের সংগঠক বাপি গোস্বামী উত্তরবঙ্গ বিজেপিতে পরিচিত একটি দাপুটে নাম। দীর্ঘদিন জেলা সভাপতি থাকার অভিজ্ঞতা তাঁকে ‘আদি’ বিজেপির প্রতিনিধিত্বকারী করে তুলেছে। আবার অন্য দিকে, সৌমিত্র খাঁ তুলনামূলক ভাবে ‘নব্য’ বিজেপির মুখ হলেও, পরপর দু’বার সাংসদ হিসেবে জয়, নিজের এলাকায় সংগঠন ধরে রাখা এবং ভোট করিয়ে আনার ক্ষমতা তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। শশী অগ্নিহোত্রী ফরওয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) ছেড়ে বিজেপিতে এলেও, সদস্য সংগ্রহ থেকে বুথ সশক্তিকরণ, প্রতিটি স্তরে সংগঠনের কাজে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে অন্তত দু’জন মহিলাকে রাখার দলীয় নীতিও তাঁর ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে।

আরও পড়ুন : Dilip Ghosh | ‘মাঠজুড়ে খেলব, দল চাইলে লড়ব’ : সল্টলেকে আক্রমণাত্মক দিলীপ ঘোষ

নতুন কমিটিতে সহ-সভাপতি পদেও চমক রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া প্রবীণ নেতা তাপস রায়কে (Tapas Roy) সহ-সভাপতি করা হয়েছে। কলকাতার রাজনীতিতে অভিজ্ঞ এই বিধায়কের ভাবমূর্তি তুলনামূলক ভাবে স্বচ্ছ বলেই বিজেপির অন্দরে মূল্যায়ন। বিজেপি সূত্রের খবর, দলে যোগ দেওয়ার সময়ই তাঁকে ‘যথাযোগ্য দায়িত্ব’ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন শমীক। এছাড়াও সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন আলিপুরদুয়ারের সাংসদ মনোজ টিগ্গা (Manoj Tigga), প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী (Debasree Chaudhuri) ও নিশীথ প্রামাণিক (Nisith Pramanik)। ‘আদি’ বিজেপির রাজু বন্দ্যোপাধ্যায় (Raju Banerjee) ও সঞ্জয় সিংহ (Sanjay Singh) যেমন জায়গা পেয়েছেন, তেমনই ফরওয়ার্ড ব্লক থেকে আসা ‘নব্য’ নেতা প্রবাল রাহাকেও (Prabal Raha) সহ-সভাপতি করা হয়েছে। সংগঠনের নানা স্তরে দক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে পরিচিত হওয়াই তাঁর পদোন্নতির কারণ বলে মনে করছেন দলীয় নেতৃত্ব।

শমীকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বিদ্যাসাগর মিস্ত্রিকে (Vidyasagar Mistry) যুগ্ম কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে। দলের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও তহবিলের উপর সরাসরি নজর রাখতেই তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে বিজেপি সূত্রের দাবি। সংখ্যালঘু মোর্চার সভাপতি পদে ফিরেছেন আলি হোসেন (Ali Hossain)। বসিরহাট দক্ষিণের উপনির্বাচনে শমীকের জয়ের সময় সংখ্যালঘু এলাকায় সংগঠনের কাজ করে তিনি নজর কেড়েছিলেন। যুব মোর্চা ও মহিলা মোর্চায় শমীক কোনও পরিবর্তন আনেননি। যথাক্রমে ইন্দ্রনীল খাঁ (Indranil Khan) এবং ফাল্গুনী পাত্র (Falguni Patra) আগের দায়িত্বেই বহাল। তবে বদল এসেছে এসসি, এসটি ও ওবিসি মোর্চায়। এসসি মোর্চার সভাপতি হয়েছেন সুজিত বিশ্বাস (Sujit Biswas), এসটি মোর্চার দায়িত্ব পেয়েছেন মালদহ উত্তরের সাংসদ খগেন মুর্মু (Khagen Murmu), আর ওবিসি মোর্চার নেতৃত্বে আনা হয়েছে বালুরঘাটের নেতা শুভেন্দু সরকারকে (Shubhendu Sarkar)। উল্লেখ্য যে, শমীকের নতুন কমিটি এক দিকে নির্বাচনের আগে বিজেপির ‘ভোটের মুখ’ স্পষ্ট করেছে, অন্য দিকে সংগঠনের চালিকাশক্তিকে আলাদা করে সাজিয়েছে। এই কমিটি কতটা কার্যকর হয়, তারই উপর অনেকাংশে নির্ভর করবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লড়াই।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Samik Bhattacharya 2026 Election | ২০২৬ ভোটের আগে বিজেপি কর্মীদের ঝাঁপানোর ডাক শমীক ভট্টাচার্যের

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন