সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ইরানে ফের গ্রেপ্তার নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী সমাজকর্মী নার্গিস মোহাম্মদি (Narges Mohammadi)। গত শুক্রবার ইরানের পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী তাঁকে আটক করে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া এই মানবাধিকারকর্মীর গ্রেপ্তারের খবরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠন, নোবেল কমিটি এবং একাধিক দেশ এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উল্লেখ্য, নার্গিস মোহাম্মদির সংগঠন ‘নার্গিস ফাউন্ডেশন’ (Narges Foundation) -এর দাবি, পূর্ব ইরানের মাশহাদ (Mashhad) শহরে বিশিষ্ট আইনজীবী খোসরু আলিকোরদি (Khosrow Alikordi) -এর স্মরণসভায় তিনি যোগ দিতে গিয়েছিলেন। সেখানেই ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী তাঁকে ঘিরে ধরে। অভিযোগ, গ্রেপ্তারের আগে তাঁকে মারধরও করা হয়। স্মরণসভায় উপস্থিত বহু মানুষ এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন বলে দাবি করেছে ফাউন্ডেশন।
খোসরু আলিকোরদি ছিলেন ইরানের মানবাধিকার আন্দোলনের পরিচিত মুখ। কিছুদিন আগেই নিজের কার্যালয় থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। তাঁর মৃত্যু ঘিরে দেশজুড়ে শোক ও ক্ষোভের আবহ তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষিতেই মাশহাদে আয়োজিত স্মরণসভায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন নার্গিস মোহাম্মদি। কিন্তু শেষ শ্রদ্ধা জানানো তো দূরের কথা, তাঁকে ফের কারাগারে পাঠানো হল, এই ঘটনাকে ‘নির্মম ও অমানবিক’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন মানবাধিকারকর্মীরা। প্রসঙ্গত, ইরানে মহিলাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই সরব নার্গিস মোহাম্মদি। এই লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবেই ২০২৩ সালে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার (Nobel Peace Prize) দেওয়া হয়। নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, “ইরানে নারীদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের প্রতিবাদ এবং মানবাধিকারের পক্ষে তাঁর নিরলস সংগ্রাম বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে।”
সূত্রের খবর, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের কারাব্যবস্থার নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়েছেন নার্গিস। বেশিরভাগ সময়ই তাঁকে কাটাতে হয়েছে তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগার (Evin Prison) -এ। কারাগারে থেকেও তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে লেখালেখি ও প্রতিবাদ চালিয়ে গিয়েছেন। সেই কারণেই প্রশাসনের চোখে তিনি বরাবরই ‘অস্বস্তিকর’ চরিত্র। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁকে সাময়িক মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে হয়ত ইরান সরকার কিছুটা নরম হবে। কিন্তু ফের গ্রেপ্তারের ঘটনায় সেই আশা কার্যত ভেঙে পড়েছে। সমালোচকদের মতে, নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরও একজন সমাজকর্মীকে এভাবে আটক করা ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতির বাস্তব চিত্রই তুলে ধরছে।
৫৩ বছর বয়সি নার্গিস মোহাম্মদির গ্রেপ্তারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নোবেল কমিটি (Nobel Committee)। এক বিবৃতিতে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “আমরা এই গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানাই এবং ইরান সরকারের কাছে অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাচ্ছি।” একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলকেও ইরানের উপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে শনিবার ভোররাত পর্যন্ত এই গ্রেপ্তারি নিয়ে ইরান সরকারের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। অতীতে অবশ্য এই ধরনের ঘটনায় তেহরান বরাবরই ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’র যুক্তি তুলে ধরেছে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, নার্গিসের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলির বেশিরভাগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পরিসংখ্যান বলছে, নার্গিস মোহাম্মদিকে এখনও পর্যন্ত মোট ১৫ বার গ্রেপ্তার করেছে ইরানের প্রশাসন। পাঁচটি মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে এখনও ১৫৪টি অভিযোগ ঝুলে রয়েছে বলে সূত্রের খবর। বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় সাজা মিলিয়ে নার্গিস মোট ৩১ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। এত দীর্ঘ সাজা কোনও সহিংস অপরাধ ছাড়াই, এই বিষয়টিই আন্তর্জাতিক মহলে ইরানের সমালোচনার অন্যতম কারণ।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নার্গিস -এর এই গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union) -এর একাধিক নেতা, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch) ইরানকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছে। তাঁদের বক্তব্য, নোবেলজয়ী একজন সমাজকর্মীকে এভাবে দমন করা মানে মানবাধিকারের প্রতি চূড়ান্ত অবজ্ঞা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, নার্গিস মোহাম্মদির ফের গ্রেপ্তার শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, এটি ইরানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরও যদি একজন সমাজকর্মী নিরাপদ না থাকেন, তবে সাধারণ মানুষের অবস্থা কতটা ভয়াবহ, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির অন্দরে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Iran marathon hijab controversy | ইরানের ম্যারাথনে হিজাব ছাড়া দৌড়ে ঝড়, আয়োজক গ্রেফতার, সাহসী নারীদের পক্ষে জনমত উত্তাল




