শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : মহাকাশ (Space) অভিযানের সঙ্গে মানবজীবনের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। চাঁদ, মঙ্গল কিংবা তারও বাইরে বসতি স্থাপনের স্বপ্ন এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়। তবে এই স্বপ্নের মাঝেই উঠে আসছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, মহাকাশে দীর্ঘ সময় কাটালে মানুষের প্রজনন ক্ষমতার উপর কী প্রভাব পড়তে পারে? সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয় (University of Adelaide) -এর গবেষকদের করা এক পরীক্ষায় উঠে এসেছে, মাধ্যাকর্ষণ-শূন্য পরিবেশ শুক্রাণুর কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এমন পরিবেশে শুক্রাণুর গন্তব্য নির্ধারণের ক্ষমতা কমে যেতে পারে। অর্থাৎ, ডিম্বাণুর দিকে সঠিক ভাবে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারে।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নিকোল ম্যাকফারসন (Nicole McPherson) বলেন, ‘মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে শুক্রাণুর চলন থেমে যায় না, কিন্তু তারা সঠিক দিশা খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ে।’ এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, সমস্যা মূলত গতিতে নয়, বরং দিকনির্দেশনায়। এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতেই কৃত্রিমভাবে মাধ্যাকর্ষণ-শূন্য পরিবেশ তৈরি করেন। ‘৩ডি ক্লিনোস্ট্যাট’ (3D Clinostat) নামের একটি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে এই পরিবেশ গড়ে তোলা হয়। তারপর মানুষের পাশাপাশি শূকর ও ইঁদুরের শুক্রাণু নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়, যাতে বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপর প্রভাব বোঝা যায়। পরীক্ষায় দেখা যায়, মাধ্যাকর্ষণ-শূন্য অবস্থায় শুক্রাণুগুলি অস্বাভাবিক ভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকটা এমন, যেন চোখ বাঁধা অবস্থায় কেউ দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গবেষকদের ভাষায়, ‘শুক্রাণুগুলি কখনও নিজেদের লেজের দিকেই ঘুরে ফিরে আসছিল, যেন নির্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজে পাচ্ছে না।’
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে যখন বিজ্ঞানীরা স্ত্রী জনননালীর মতো একটি কৃত্রিম প্রণালী তৈরি করে সেখানে শুক্রাণুর গতি পর্যবেক্ষণ করেন। দেখা যায়, মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে খুব কম সংখ্যক শুক্রাণু সেই প্রণালী পেরিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে পারছে। অন্যদিকে, স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণযুক্ত পরিবেশে সেই সংখ্যা অনেক বেশি। নিকোল ম্যাকফারসনের কথায়, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি, মাধ্যাকর্ষণ থাকলে অনেক বেশি শুক্রাণু নির্দিষ্ট পথে এগোতে পারে, কিন্তু শূন্য মাধ্যাকর্ষণে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।’ এই পর্যবেক্ষণ শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রেও মিলেছে। গবেষণায় আরও জানা যায়, শুক্রাণুর গঠন বা শারীরিক গতির মধ্যে বড় কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি। অর্থাৎ, তারা চলতে পারছে, কিন্তু সঠিক পথে এগোতে পারছে না। এই বিষয়টি গবেষকদের ভাবাচ্ছে, কারণ এতে বোঝা যাচ্ছে যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি শুধু শরীরের উপর নয়, কোষের আচরণেও প্রভাব ফেলে।
এর আগে ২০২৪ সালের আর একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, মাধ্যাকর্ষণের পরিবর্তনে শুক্রাণুর শক্তি ও সক্রিয়তা কমে যেতে পারে। নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এখন ধারণা করা হচ্ছে, শুধু শক্তি নয়, দিক নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে এই পরিবর্তন। কিন্তু এই বিষয়ে একমত নন সব গবেষকই। গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন, মাধ্যাকর্ষণ-শূন্য পরিবেশেও কিছু শুক্রাণু সঠিক ভাবে ডিম্বাণু খুঁজে পেতে পারে। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ ভাবে প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় না, কিন্তু সাফল্যের হার কমতে পারে। ম্যাকফারসন বলেন, ‘মাত্র ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা মাধ্যাকর্ষণ-শূন্য পরিবেশে থাকলেও প্রজনন ক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে।’ দীর্ঘ সময় থাকলে এই প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
এই গবেষণার ফলাফল মহাকাশ অভিযানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশযাত্রা বা অন্য গ্রহে বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে মানব প্রজনন একটি বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। সেই কারণে এই ধরনের গবেষণা আগামী দিনের মহাকাশবিজ্ঞানে নতুন দিশা দেখাতে পারে। একই সঙ্গে এই গবেষণা পৃথিবীতেও প্রজনন সংক্রান্ত গবেষণায় নতুন দিক খুলে দিতে পারে। মাধ্যাকর্ষণ কী ভাবে কোষের আচরণকে প্রভাবিত করে, তা বোঝার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। উল্লেখ্য, মহাকাশ এখন আর শুধু অভিযান নয় মানবজীবনের বিস্তারের ক্ষেত্র। কিন্তু সেই পথে এগোতে গেলে শরীরের সূক্ষ্মতম স্তর, কোষের আচরণ নিয়ে আরও গভীর ভাবে ভাবতে হবে, সেটাই এই গবেষণা নতুন করে মনে করিয়ে দিল।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Tabu father surname, Tabu personal life | তাবাসসুম ফাতিমা থেকে তাবু, বাবার পরিচয় মুছে ফেলার কঠিন সিদ্ধান্তের কারণ কী?



