সংবেদন শীল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : সম্পর্কের শুরু অনেক সময়ই রঙিন কুয়াশায় ঢাকা থাকে। প্রথম দৃষ্টি, প্রথম কথা, প্রথম আকর্ষণ এসব কিছু যেন একটি অদৃশ্য মায়ার পর্দায় মোড়া। কিন্তু সময় যত এগোয়, ততই সামনে আসে, আমরা যাকে ভালবেসেছিলাম, সে কী সত্যিই সেই মানুষটি? নাকি আমাদের নিজের মনের গড়ে তোলা এক কল্পচরিত্র? উল্লেখ্য, আধুনিক মনস্তত্ত্বের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তক কার্ল জুঙ্গ (Carl Jung) এই প্রশ্নের গভীরে প্রবেশ করেছিলেন। তাঁর মতে, নারী-পুরুষের সম্পর্কের জটিলতা বোঝার জন্য কেবল বাহ্যিক আচরণ বিশ্লেষণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অবচেতন মনের অন্তর্লোককে অনুধাবন করা।জুঙ্গ বলেন, সম্পর্কের প্রারম্ভে নারী প্রায়শই পুরুষকে তার বাস্তব সত্তা হিসেবে দেখেন না; কিন্তু নিজের মনের গভীরে গড়ে ওঠা একটি ফ্যান্টাসি পুরুষ -এর প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখেন। এই প্রতিচ্ছবিই পরবর্তীতে প্রত্যাশা, আকর্ষণ এবং হতাশার উৎস হয়ে ওঠে। প্রথম পরিচয়ের মুহূর্তে পুরুষ ভাবে, ‘সে আমাকে চাইছে’। কিন্তু জুঙ্গের বিশ্লেষণ বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। নারী অনেক সময় পুরুষকে একটি যাচাইযোগ্য অবজেক্ট হিসেবে বিচার করে, তার কল্পনায় নির্মিত আদর্শ চরিত্রের সঙ্গে বাস্তব মানুষটির মিল আছে কি না, তা পরখ করে দেখে। অথচ সেই কল্পচিত্র বাস্তব পুরুষের প্রকৃত সত্তা নয়। এই প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কার্ল জুঙ্গ (Carl Jung) ‘অ্যানিমাস’ (Animus) ধারণা সামনে আনেন। অ্যানিমাস হল নারীর অবচেতনে নিহিত পুরুষ-প্রতিমা বা পুরুষসত্তা। শৈশব, সামাজিক অভিজ্ঞতা, পিতৃ-প্রভাব এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ মিলিয়ে এই অ্যানিমাস গড়ে ওঠে। ফলে যখন কোনও নারী কোনও পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই আকর্ষণ বাস্তব ব্যক্তির প্রতি না, তা আসলে নিজের অবচেতনে লালিত অ্যানিমাসের প্রতিফলনের প্রতি।
এ বিষয়ে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, নারী নিজেও সচেতনভাবে বুঝতে পারেন না যে তিনি এই মানসিক প্রক্ষেপণের মধ্যে রয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তিনি একজন বাস্তব মানুষকে নির্বাচন করছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি এমন একটি চরিত্রকে খুঁজছেন, যার রূপরেখা তাঁর মনে বহু আগেই আঁকা হয়েছে। আর বাস্তব পুরুষটি যেন সেই নাটকের একজন অভিনেতা মাত্র। যখন বাস্তব মানুষটি সেই কল্পিত চরিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, তখন সম্পর্কের ভাঙন শুরু হয়। পুরুষ হতবাক হয়ে ভাবেন, ‘আমি তো বদলাইনি, তবে কেন সে বদলে গেল?’ জুঙ্গের মতে, এখানে পরিবর্তন বাস্তবে নয়; আসলে ভেঙে পড়ে কল্পনার কাঠামো। এই অবস্থায় পুরুষও সমানভাবে ভুল করে। অনেক পুরুষ নারীর আকর্ষণকে সরাসরি আমন্ত্রণ হিসেবে ধরে নেন। তাঁরা মনে করেন, গ্রহণযোগ্যতা মানেই গভীর বোঝাপড়া। অথচ বাস্তবে তাঁরা হয়ত একটি মানসিক প্রক্ষেপণের অংশ হয়ে উঠেছেন।
এই জটিল মানসিক বিন্যাস থেকে মুক্তির পথ হিসেবে জুঙ্গ যে ধারণাটি দিয়েছেন, তা হল ‘ইন্ডিভিডুয়েশন’ (Individuation)। ইন্ডিভিডুয়েশন মানে নিজের সত্তাকে সম্পূর্ণভাবে জানা, নিজের শক্তি ও দুর্বলতাকে স্বীকার করা এবং অন্যের অনুমোদনের উপর নির্ভর না করে আত্ম-উপলব্ধির ভিত গড়ে তোলা। জুঙ্গের ভাষায়, প্রকৃত পরিণত পুরুষ সেই, যে নিজের অবচেতন মনের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে। যে নিজের ভেতরের ‘অ্যানিমা’ (Anima) অর্থাৎ নিজের অন্তর্গত নারীসত্তাকে চিনতে পারে। কারণ জুঙ্গের মতে, পুরুষের মনেও একটি অবচেতন নারী-প্রতিমা কাজ করে, যা তার আবেগ, সম্পর্ক ও প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করে। আধুনিক সমাজে বহু পুরুষ নিজেদের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে অপরের প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেকে বদলাতে থাকেন। তাঁরা ভাবেন, এটিই ভালবাসার প্রমাণ। কিন্তু জুঙ্গ সতর্ক করে বলেন, ‘নিজেকে হারিয়ে ফেলা কোনও প্রেম না, এটি আত্মপ্রতারণা।’ জুঙ্গের মতে, প্রকৃত আকর্ষণ জন্ম নেয় তখনই, যখন একজন মানুষ নিজের পরিচয়ে দৃঢ় ও স্বতন্ত্র থাকে। রহস্যময়তা এখানে কৃত্রিম অভিনয় না। আসলে তা নিজের গভীরতা ও আত্মসচেতনতার ফল। তিনি মনে করতেন, সম্পর্কের সুস্থতা নির্ভর করে পারস্পরিক বাস্তবতার ওপর। কল্পনার ওপর না। যদি দু’জন ব্যক্তি নিজেদের অবচেতন প্রক্ষেপণ সম্পর্কে সচেতন হন, তবে সম্পর্কের মধ্যে কমবে ভুল বোঝাবুঝি।
কিন্তু এই আত্ম-অনুসন্ধানের পথ খুব সহজ নয়। মানসিক একাগ্রতার সাহস প্রয়োজন, প্রয়োজন নিজের অন্ধকার দিকগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি। কিন্তু এই পথেই লুকিয়ে আছে মুক্তি; কারণ ভালবাসা আর কল্পনার নাট্যমঞ্চ না, আসলে তা দুইটি স্বতন্ত্র সত্তার মিলন। এবিষয়ে কার্ল জুঙ্গ (Carl Jung) কোনও সহজ সমাধান দেননি। তিনি বলেননি, কীভাবে কাউকে ধরে রাখতে হবে। তিনি শিখিয়েছেন, কীভাবে নিজেকে খুঁজে পেতে হয়। কারণ যে মানুষ নিজের সত্তায় প্রতিষ্ঠিত, তাকে বোঝা সহজ হয়; আর সে-ও অন্যকে বাস্তব রূপে দেখতে শেখে। পুরুষ কেন নারীকে বুঝতে ব্যর্থ হয়, এই প্রশ্নের উত্তরে জুঙ্গের দর্শন আমাদের সামনে একটি গভীর আয়না তুলে ধরে। সেই আয়নায় আমরা দেখি যে সমস্যা কেবল অন্যের না ; সমস্যা আমাদের নিজস্ব অবচেতন মানসিক গঠনেরও। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার আগে প্রয়োজন আত্মপরিচয় গঠন। কল্পনার পুরুষ বা নারী না। বাস্তব মানুষকে দেখতে শেখাই হতে পারে সুস্থ ভালবাসার প্রথম শর্ত। যে পুরুষ নিজের ভিত নির্মাণ করে, যে নারী নিজের অ্যানিমাসকে সচেতনভাবে উপলব্ধি করে তাদের সম্পর্ক হয় সমতার, বোঝাপড়ার এবং পরিণত ভালবাসার। আর সেখানেই জুঙ্গের মনস্তত্ত্ব আধুনিক সময়ের সম্পর্কের সংকটের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে, এই সময়েও প্রাসঙ্গিক।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Akshaye Khanna Kangana Ranaut relationship | অক্ষয় খন্নার নীরবতায় থেমে গিয়েছিল কঙ্গনা রানাওয়াতের প্রেমের ইচ্ছে




