সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার আগেই রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে একসঙ্গে দু’টি বড় পদক্ষেপের ঘোষণা। একদিকে বজবজ শিল্পতালুক (Budge Budge industrial park) –সহ বিভিন্ন এলাকায় ৩২টি সংস্থার হাতে শিল্পের জন্য জমি তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি, অন্যদিকে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস (Haldia Petrochemicals) -এর প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকার নতুন উৎপাদন ইউনিটের উদ্বোধনের দিন ঘোষণা। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর শিল্প সংস্থাগুলির হাতে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগোবে। আর ১৪ অক্টোবর, দুর্গাপুজোর মহাষষ্ঠীর আগে, হলদিয়ায় নতুন প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা। শিল্প ও বিনিয়োগকে ঘিরে এই জোড়া ঘোষণাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই নজর পড়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে পূর্ব মেদিনীপুর দুই শিল্পাঞ্চলের দিকেই। রাজ্য সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বজবজ শিল্পতালুকে ৩২টি শিল্পগোষ্ঠীকে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির হাতে জমি তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসনিক স্তরে জমি হস্তান্তরের পর সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রকল্পগুলির কাজ কত দ্রুত শুরু হয়, এখন সেদিকেই দৃষ্টি থাকবে।
বজবজে একসঙ্গে এতগুলি সংস্থাকে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব শুধু জমি বরাদ্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিল্প সংস্থাগুলি সেখানে প্রকল্প গড়ে তুললে তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে নির্মাণ, পরিবহণ, সরবরাহ, গুদামজাতকরণ, পরিষেবা এবং বিভিন্ন সহায়ক ব্যবসা। ফলে একটি বড় শিল্পপ্রকল্পের প্রভাব অনেক সময় মূল কারখানার গণ্ডি পেরিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে। নতুন কারখানা তৈরি হলে সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ঠিকাদারি, পরিবহণ, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, খাদ্য সরবরাহ এবং অন্যান্য পরিষেবা ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। এই কারণে ৩২টি সংস্থার জমি হস্তান্তরকে ঘিরে শিল্পাঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে প্রকল্পগুলির প্রকৃত কর্মসংস্থান সংখ্যা, বিনিয়োগের পরিমাণ ও উৎপাদন শুরু হওয়ার সময়সীমা সংস্থাভেদে আলাদা হবে। জমি হাতে পাওয়ার পর নির্মাণকাজ, অনুমোদন এবং উৎপাদন পর্ব কত দ্রুত এগোয়, তার উপরই বাস্তব কর্মসংস্থানের পরিমাণ নির্ভর করবে। বজবজের পাশাপাশি নজর এখন হলদিয়ার দিকেও। প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে তৈরি নতুন প্রকল্পটি হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রকল্পটির আওতায় ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদনের পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে এবং ১৪ অক্টোবর উদ্বোধনের দিন ধার্য করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এই প্রকল্পের উদ্বোধনের কথা জানিয়েছেন।
এই প্রকল্পের গুরুত্ব আরও একটি জায়গায়। পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে একটি বড় উৎপাদন ইউনিট তৈরি হলে তার সঙ্গে যুক্ত অনুসারী শিল্প বা Downstream Industries-এর জন্য নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হতে পারে। মূল কারখানা থেকে উৎপাদিত রাসায়নিক উপাদানকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন শিল্প সংস্থা নিজেদের উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। ফলে একটি বড় প্রকল্পকে কেন্দ্র করে পরবর্তী পর্যায়ে আরও ছোট ও মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। সূত্রের খবর, হলদিয়া প্রকল্পে ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদনের পাশাপাশি Olefin Conversion Technology-র ভিত্তিতে propylene উৎপাদনের ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়েছে। প্রকল্পটির শিল্পগত পরিধি তাই শুধু একটি নতুন কারখানা চালুর মধ্যে আটকে থাকছে না; এর সঙ্গে পেট্রোকেমিক্যালের পরবর্তী স্তরের উৎপাদন ব্যবস্থার যোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। উল্লেখ্য, হলদিয়া এমনিতেই পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলির একটি। সেখানে পেট্রোকেমিক্যাল পরিকাঠামো সম্প্রসারিত হলে কাঁচামাল নির্ভর শিল্প, প্লাস্টিক, রাসায়নিক এবং অন্যান্য অনুসারী উৎপাদন ক্ষেত্রের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ শিল্প পরিকাঠামো উন্নয়ন নিগমের তথ্যেও হলদিয়া শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন শিল্প ইউনিট, সড়ক-রেল-সমুদ্রপথে কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহণের পরিকাঠামোর উল্লেখ রয়েছে।
রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক শিল্প-ঘোষণাগুলির মধ্যে হলদিয়ার এই ৬,০০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এর আগে সরকারের তরফে অন্যান্য শিল্প ও প্রযুক্তি প্রকল্প নিয়েও একাধিক ঘোষণা করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় পুজোর আগে হলদিয়ায় এত বড় বিনিয়োগের প্রকল্প চালু করার সিদ্ধান্ত শিল্পক্ষেত্রে নতুন পর্বের সূচনা করতে পারে বলে সরকারি মহলের বক্তব্য। তবে শিল্প বিনিয়োগের ঘোষণা থেকে বাস্তবে কর্মসংস্থান তৈরির পথটি কয়েকটি ধাপের। জমি বরাদ্দের পর প্রকল্পের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি বসানো, উৎপাদন শুরু এবং পূর্ণ ক্ষমতায় পৌঁছতে সময় লাগে। একইভাবে নতুন শিল্পের সঙ্গে স্থানীয় যুবসমাজ কতটা যুক্ত হতে পারবেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে ৩২টি সংস্থার জমি হস্তান্তর এবং হলদিয়ার নতুন ইউনিট চালুর পর আগামী কয়েক মাসে প্রকল্পগুলির বাস্তব অগ্রগতিই নজরের কেন্দ্রে থাকবে।
পুজোর মরশুমের আগে শিল্পক্ষেত্রে এই দুই ঘোষণা একই সঙ্গে সামনে আসায় রাজ্যের বিনিয়োগ মানচিত্র নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বজবজে জমি পাওয়া ৩২টি সংস্থার প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় শিল্পকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে। অন্যদিকে হলদিয়ার ৬,০০০ কোটি টাকার প্রকল্প চালু হলে পূর্ব মেদিনীপুরের শিল্প অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরোক্ষ কাজ এবং সহায়ক শিল্পের বিস্তার কতটা হয়, তার হিসাব অবশ্য প্রকল্পগুলি পূর্ণমাত্রায় চালু হওয়ার পরই পাওয়া যাবে। প্রসঙ্গত, ২৩ সেপ্টেম্বর জমি হস্তান্তর ও ১৪ অক্টোবর হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের নতুন ইউনিটের উদ্বোধন, এই দুই তারিখ এখন রাজ্যের শিল্পমহলের নজরে। একদিকে নতুন শিল্পপ্রকল্পের জন্য জমি, অন্যদিকে বড় বিনিয়োগের উৎপাদন ইউনিট, পুজোর আগে বাংলার শিল্পক্ষেত্রে এই দুই পদক্ষেপ আগামী দিনে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ছবিতে কতটা পরিবর্তন আনে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari on Annapurna Diwas | West Bengal Annapurna Yojana : ভাতা নয়, এবার সংস্কারের সরকার! অন্নপূর্ণা দিবসে শুভেন্দুর নিশানায় মমতা, মহিলাদের জন্য একগুচ্ছ ঘোষণা




