প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ চেন্নাই: ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে যে কয়েকটি নাম সময়ের সীমানা পেরিয়ে কিংবদন্তীর মর্যাদা পেয়েছে, এমএস সুব্বুলক্ষ্মী (MS Subbulakshmi) তাঁদের অন্যতম। তাঁর কণ্ঠ, সাধনা, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি নিষ্ঠা ও দীর্ঘ শিল্পীজীবন এবার উঠে আসতে চলেছে বড়পর্দায়। আর সেই ঐতিহাসিক চরিত্রে অভিনয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন দক্ষিণী চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রশ্মিকা মন্দানা (Rashmika Mandanna)। ছবির আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে যথেষ্ট আগ্রহ। তার মধ্যেই সুব্বুলক্ষ্মীর চরিত্রে অভিনয় করার অনুভূতি প্রকাশ করে আবেগঘন মন্তব্য করেছেন রশ্মিকা মন্দানা।

সুব্বুলক্ষ্মীর জীবনকে কেবল মঞ্চের সাফল্য দিয়ে বিচার করতে চাইছেন না পরিচালক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, খ্যাতির পিছনে ছিল দীর্ঘ অনুশীলন, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং বহু ব্যক্তিগত ত্যাগ। আজকের সময়ে সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে খুব দ্রুত পরিচিতি পাওয়া সম্ভব হলেও সুব্বুলক্ষ্মীর ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল বহু দশকের সাধনা ও শিল্পচর্চার ভিতের উপর। সেই যাত্রার সাফল্যের পাশাপাশি জীবনের কঠিন অধ্যায়, সিদ্ধান্ত, ত্যাগ এবং ব্যক্তিগত অনুভূতিকেও ছবিতে জায়গা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। গৌতম তিনানুরীর কথায়, সুব্বুলক্ষ্মীর জীবন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা বুঝেছেন, তাঁর সাফল্যের পিছনে রাতারাতি পরিচিত হয়ে ওঠার কোনও পথ ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে নিজের শিল্পকে ঘষেমেজে তৈরি করেছিলেন তিনি। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবনকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে শুধু তাঁর বিখ্যাত গান কিংবা মঞ্চসাফল্য দেখানোই যথেষ্ট নয়। তাঁর অধ্যবসায়, ধৈর্য ও নিজের লক্ষ্যে পৌঁছনোর দীর্ঘ যাত্রাটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আরও পড়ুন : Sridevi life story : শ্রী আম্মা ইয়াঙ্গার আয়্যাপ্পন থেকে শ্রীদেবী, বর্ণময় জীবন
এই ছবির প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন বানি বাস (Vani Vass) এবং রকলাইন বেঙ্কটেশ (Rockline Venkatesh)। বানি বাস জানিয়েছেন, প্রায় ২৫টি ছবি প্রযোজনা করার পরেও এমএস সুব্বুলক্ষ্মীর জীবন নিয়ে এই ছবি তাঁর কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। তাঁর মতে, এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়া তাঁর পেশাগত জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একটি কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনকে বড়পর্দায় তুলে ধরার দায়িত্বকে তিনি বিশেষ সম্মানের সঙ্গে দেখছেন।

আরও পড়ুন : Aamir Khan Lalkara | ৬১-তে ২৫ বছরের যুবক আমির খান! ‘লালকারা’-র জন্য ফের বড় শারীরিক বদল
অন্য প্রযোজক রকলাইন বেঙ্কটেশের বক্তব্যেও উঠে এসেছে যে, ছবিটির দীর্ঘ প্রস্তুতির কথা। তাঁর দাবি, এমএস সুব্বুলক্ষ্মীর জীবন নিয়ে এই ছবি তৈরির পিছনে সাত থেকে আট বছর ধরে গবেষণা ও প্রস্তুতি চলেছে। শুধু তাঁর সংগীতজীবন না, ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন দিকও খতিয়ে দেখা হয়েছে। কারণ একটি জীবনীচিত্র তখনই পূর্ণতা পেতে পারে, যখন তার কেন্দ্রে থাকা মানুষটির জীবনের সাফল্যের পাশাপাশি সংগ্রাম ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলিও দর্শকের সামনে আসে। অন্যদিকে, সুব্বুলক্ষ্মীর চরিত্রে রশ্মিকা মন্দানাকে নির্বাচন করার বিষয়টিও দীর্ঘ আলোচনার পর চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন রকলাইন। এমন একটি চরিত্র, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল ঐতিহ্য এবং কোটি মানুষের আবেগ, সেখানে অভিনেত্রী নির্বাচন সহজ ছিল না। রশ্মিকাকে এই চরিত্রের জন্য বেছে নেওয়ার আগে নির্মাতারা দীর্ঘ সময় ধরে ভাবনাচিন্তা করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর অভিনয়ক্ষমতা ও চরিত্রটির প্রতি দায়বদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই তাঁকে নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্মাতারা।

এই দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজেও যে আবেগাপ্লুত, তা গোপন করেননি রশ্মিকা। চেন্নাইয়ের মিউজ়িক অ্যাকাডেমিতে ছবির সূচনা অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘একজন অভিনেত্রী হিসেবে এমন একটি চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পাওয়া আমার কাছে অত্যন্ত বড় প্রাপ্তি। এমএস সুব্বুলক্ষ্মী আম্মার ১১০তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে পেরে আমি গর্বিত। এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছে, যেন ঈশ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।’

রশ্মিকার কাছে এই চরিত্র শুধু আর পাঁচটি অভিনয়ের সুযোগের মতো না। তাঁর বক্তব্য, সুব্বুলক্ষ্মীর বিশাল জীবনকাহিনির সামান্য অংশকে পর্দায় তুলে ধরার সুযোগও তাঁর কাছে বিরাট সম্মানের। তিনি জানিয়েছেন, চরিত্রটির প্রতি যথাসম্ভব সুবিচার করার জন্য নিজের সমস্ত পরিশ্রম উজাড় করে দিতে চান। অভিনেত্রীর কথায়, ‘এমএস আম্মার অসাধারণ জীবনের একটি ছোট অংশের সঙ্গে যুক্ত হতে পারাটাই আমার কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এই চরিত্রের জন্য আমি নিজের সর্বশক্তি দিয়ে প্রস্তুতি নেব। তাঁকে পর্দায় এমনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে, যাতে দর্শক তাঁর জীবনকে নতুন করে অনুভব করতে পারেন।’

রশ্মিকা আরও জানিয়েছেন, এই চরিত্রের ক্ষেত্রে শুধু অভিনয় করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। সুব্বুলক্ষ্মীর ব্যক্তিত্ব, তাঁর শিল্পচর্চা, মঞ্চে উপস্থিতি, জীবনযাপনের ধরন এবং সঙ্গীতের প্রতি গভীর নিষ্ঠা, প্রতিটি বিষয় বুঝে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ভারতের সঙ্গীত ইতিহাসে সুব্বুলক্ষ্মীর অবস্থান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁকে পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও চরিত্রটির গভীরতা নষ্ট করতে পারে। ছবিটির আনুষ্ঠানিক সূচনার দিনটি একটি নতুন সিনেমার কাজ শুরুর দিন ছিল না। এক দিকে ছিল এমএস সুব্বুলক্ষ্মীর ১১০তম জন্মবার্ষিকী, অন্য দিকে তাঁর জীবন নিয়ে নির্মিতব্য চলচ্চিত্রের প্রথম পদক্ষেপ। একই অনুষ্ঠানে কমল হাসনের উপস্থিতি, সুব্বুলক্ষ্মীর পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ ও কর্নাটকী সঙ্গীতের শিল্পীদের উপস্থিতি ছবিটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, রশ্মিকা মন্দানা কীভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলবেন এমন এক শিল্পীকে, যাঁর কণ্ঠ ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে নিজস্ব জায়গা তৈরি করেছে? সুব্বুলক্ষ্মীর জীবন যে শুধু সাফল্যের গল্প নয়, তার মধ্যে রয়েছে পরিশ্রম, সম্পর্ক, দায়িত্ব, ত্যাগ এবং নিজের শিল্পকে জীবনের কেন্দ্রে রাখার দীর্ঘ সাধন, পরিচালকের বক্তব্যে তারই ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে ছবিটি কেবল একজন কিংবদন্তি গায়িকার জীবনী হিসেবে নয়, এক নারীর দীর্ঘ পথচলার গল্প হিসেবেও দর্শকের সামনে আসতে চলেছে। রশ্মিকার আবেগঘন বক্তব্য আর নির্মাতাদের দীর্ঘ গবেষণার দাবি ঘিরে তাই ছবিটি নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে একটি কঠিন দায়িত্বও, এমএস সুব্বুলক্ষ্মীর মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কতটা সংবেদনশীলতা ও গবেষণার সঙ্গে বড়পর্দায় তুলে ধরা যায়। এখন সেই উত্তর খুঁজতেই অপেক্ষা করতে হবে ছবিটির পরবর্তী কাজ এবং শেষ পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহে তার উপস্থিতির জন্য।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Elon Musk Partner Indian Origin | মাস্ক জানালেন তাঁর সঙ্গিনীর শিকড় ভারতে, ‘ইন্ডিয়ান অরিজিন’ পরিচয় ঘিরে আলোচনা তুঙ্গে




