সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে এন চন্দ্রশেখরনের (N Chandrasekaran) তৃতীয় দফার মেয়াদ নিয়ে বোর্ডের সিদ্ধান্তের পরেই তৈরি হয়েছে নতুন আইনি জটিলতা। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে পরিচালনা পর্ষদ চন্দ্রশেখরনকে আরও পাঁচ বছরের জন্য চেয়ারম্যান পদে রাখার প্রস্তাবে অনুমোদন দিলেও টাটা ট্রাস্টসের (Tata Trusts) চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা (Noel Tata) সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। দুই ট্রাস্ট-মনোনীত পরিচালকের ভোট একদিকে না যাওয়ায় তৈরি হয় অচলাবস্থা। সেই পরিস্থিতিতে স্বাধীন পরিচালক হরিশ মানওয়ানি (Harish Manwani) কাস্টিং ভোট প্রয়োগ করে প্রস্তাবের পক্ষে সিদ্ধান্ত দেন। এরপরই প্রশ্ন উঠেছে, টাটা সন্সের সংস্থার বিধি অনুযায়ী এই ভোট আদৌ যথেষ্ট কি না। টাটা ট্রাস্টসের বক্তব্য, চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের মনোনীত পরিচালকদের প্রয়োজনীয় সমর্থন না থাকায় সিদ্ধান্তটি আইনগতভাবে বৈধ নয়। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে টাটা সন্সের পরিচালনা পর্ষদের গঠন এবং টাটা ট্রাস্টসের বিশেষ অধিকার। টাটা ট্রাস্টসের হাতে টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। বোর্ডে ট্রাস্টসের দু’জন মনোনীত পরিচালক রয়েছেন, নোয়েল টাটা এবং ভেনু শ্রীনিবাসন (Venu Srinivasan)। চেয়ারম্যান পদে চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগ নিয়ে এই দুই পরিচালকের অবস্থান এক হয়নি। নোয়েল প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেন, অন্য দিকে ভেনু শ্রীনিবাসন সমর্থন করেন। ফলে ট্রাস্টসের দুই প্রতিনিধির ভোট কার্যত দুই দিকে চলে যায়।
এই পরিস্থিতিতে বোর্ডের বৈঠকে চন্দ্রশেখরন নিজে ভোটদানে অংশ নেননি বলে উল্লেখ। কারণ আলোচ্য বিষয় ছিল তাঁর নিজের পুনর্নিয়োগ। অন্য দিকে, নোয়েল ও ভেনুর ভোটে সমতা তৈরি হলে বৈঠকে সভাপতিত্বকারী স্বাধীন পরিচালক ও নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটির চেয়ারম্যান হরিশ মানওয়ানি কাস্টিং ভোট প্রয়োগ করেন। সেই ভোটের পর চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বোর্ডের চূড়ান্ত ভোট ৪-১ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই আপত্তি তুলেছেন নোয়েল টাটা। টাটা ট্রাস্টসের তরফে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের মনোনীত পরিচালকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের বিশেষ বিধান রয়েছে। একজন ট্রাস্ট-মনোনীত পরিচালক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার পর অন্য কোনও পরিচালকের কাস্টিং ভোট দিয়ে সেই প্রয়োজনীয় সমর্থনের ঘাটতি পূরণ করা যায় না, এমনই অবস্থান নিয়েছে ট্রাস্টস। টাটা ট্রাস্টস বৃহস্পতিবারের বোর্ড বৈঠকের পর প্রকাশিত বিবৃতিতে চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্তকে আইনগত ভাবে অকার্যকর বলে দাবি করেছে।
আরও পড়ুন : Ratan Tata refused invitation | রাজকীয় সম্মানের চেয়েও মানবিকতা বড়: রতন টাটার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত
এই আইনি বিতর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের (D. Y. Chandrachud) আইনি মতামত। টাটা ট্রাস্টসের অনুরোধে দেওয়া ওই মতামত নোয়েল টাটা বোর্ডের বৈঠকে পেশ করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, টাটা সন্সের বিধিতে ট্রাস্টসের মনোনীত পরিচালকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন একটি পৃথক এবং বাধ্যতামূলক শর্ত। বোর্ডের সাধারণ ভোটে সমতা হলে কাস্টিং ভোট প্রয়োগের বিধান থাকলেও সেই কাস্টিং ভোট দিয়ে ট্রাস্টসের মনোনীত পরিচালকদের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের শর্তকে অতিক্রম করা যায় না, এমনটাই ওই আইনি মতামতের বক্তব্য। ফলে এখন প্রশ্ন শুধু চন্দ্রশেখরন চেয়ারম্যান থাকছেন কি না, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন উঠছে, তাঁকে পুনর্নিয়োগের জন্য যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, সেটি টাটা সন্সের Articles of Association বা সংস্থার বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। টাটা ট্রাস্টসের দাবি, বিষয়টি নিয়োগের প্রক্রিয়াগত বৈধতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অন্য দিকে বোর্ডের সিদ্ধান্তে চন্দ্রশেখরনের তৃতীয় দফার মেয়াদ অনুমোদিত হয়েছে। ফলে দু’পক্ষের অবস্থানের মধ্যে ফারাক এখন প্রকাশ্য।
বিতর্কের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, চন্দ্রশেখরনের নিজের আগের সিদ্ধান্ত। গত ১২ অগস্ট তিনি টাটা সন্সের বোর্ডকে জানিয়েছিলেন, বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে তিনি আর চেয়ারম্যান পদে পুনর্নিয়োগের জন্য নিজেকে প্রস্তাব করবেন না। তাঁর বর্তমান মেয়াদ ২০২৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা ছিল। টাটা ট্রাস্টসের বক্তব্য, চন্দ্রশেখরনের ওই সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছায় নেওয়া এবং প্রকাশ্যে জানানোর পরে সেটি চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে পরে তাঁকে পুনর্নিয়োগের জন্য বোর্ডের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ট্রাস্টস। টাটা ট্রাস্টসের বক্তব্য অনুযায়ী, চন্দ্রশেখরনের পদত্যাগ বা পুনর্নিয়োগের প্রশ্নে একবার সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর সংস্থার কর্মী, ঋণদাতা, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং শেয়ারহোল্ডাররা সেই সিদ্ধান্তকে সামনে রেখেই নিজেদের পরিকল্পনা করতে শুরু করেছিলেন। ফলে পরে সেই সিদ্ধান্ত বদলে তাঁকে পুনরায় চেয়ারম্যান করার প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে ট্রাস্টস। তাদের মতে, এখন সংস্থার নেতৃত্বে পরিবর্তনের জন্য উত্তরসূরি বাছাইয়ের প্রক্রিয়াই এগোনো উচিত ছিল।
আরও পড়ুন : Ratan Tata : রতন টাটা একটি অনন্য জীবনের নীরব রূপকথা
ভেনু শ্রীনিবাসনের অবস্থানও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে অন্য একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে। ‘স্যার দোরাবজি টাটা ট্রাস্ট’ -এর তরফে তাঁর প্রতিনিধিত্বের বৈধতা নিয়ে আপত্তি রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য দিকে ভেনুর অবস্থান, টাটা ট্রাস্টসের একাধিক শাখার সমর্থন তাঁর সঙ্গে রয়েছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট ট্রাস্টের আপত্তি তাঁর বোর্ডে প্রতিনিধিত্বকে অকার্যকর করে না, এমন যুক্তিও সামনে এসেছে। এই বিরোধের মধ্যে টাটা ট্রাস্টসের বিশেষ অধিকারই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। টাটা সন্সে ট্রাস্টসের মালিকানা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হওয়ায় সংস্থার প্রশাসনিক কাঠামোয় তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চেয়ারম্যান নিয়োগ, আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ কর্পোরেট কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাস্টসের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ বিধান রয়েছে। ফলে দুই ট্রাস্ট-মনোনীত পরিচালকের মধ্যে মতভেদ তৈরি হওয়ায় সেই বিশেষ অধিকারের প্রয়োগ কী ভাবে হবে, তা নিয়েই বর্তমান বিরোধ।
চন্দ্রশেখরনের তৃতীয় দফার মেয়াদ অনুমোদনের ঘটনাটি তাই একজন চেয়ারম্যানের পুনর্নিয়োগের বিষয় হয়ে থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে টাটা সন্সের পরিচালন কাঠামো, ট্রাস্টসের বিশেষ অধিকার, বোর্ডের ভোটের নিয়ম ও কাস্টিং ভোটের সীমা। টাটা ট্রাস্টস ইতিমধ্যেই তাদের অবস্থান প্রকাশ করেছে। তাঁদের বক্তব্য, নোয়েল টাটা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার পরে প্রয়োজনীয় ট্রাস্ট-মনোনীত পরিচালকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়া যায়নি। অন্য দিকে, বৃহস্পতিবারের বোর্ডের সিদ্ধান্ত কার্যত চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্বকে আরও পাঁচ বছরের জন্য বহাল রাখার পথ তৈরি করেছে। বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত এখন পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। টাটা ট্রাস্টসের তরফে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাস্টসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁদের হাতেই রয়েছে।
এই বিরোধের প্রভাব টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ কর্পোরেট পরিকল্পনাতেও পড়তে পারে। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বের প্রশ্নের পাশাপাশি টাটা সন্সের সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি নিয়েও সংস্থার মধ্যে মতভেদ রয়েছে বলে উল্লেখ। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিয়ন্ত্রক কাঠামো, টাটা সন্সের আর্থিক অবস্থান ও সম্ভাব্য তালিকাভুক্তির মতো বিষয়গুলি নিয়ে বোর্ড ও ট্রাস্টসের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে বর্তমান চেয়ারম্যানের পুনর্নিয়োগ বিতর্ক আরও বৃহত্তর কর্পোরেট প্রশাসনিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। প্রসঙ্গত, চন্দ্রশেখরন ২০১৭ সালে টাটা সন্সের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে টাটা গোষ্ঠীর বিভিন্ন ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে একাধিক বড় সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন তাঁর তৃতীয় দফার মেয়াদ নিয়ে বোর্ডের অনুমোদন মিললেও সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে টাটা ট্রাস্টসের আপত্তি নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ফলে আগামী দিনে বোর্ডের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে কি না, নাকি বিষয়টি আরও আইনি বা কর্পোরেট প্রক্রিয়ার মধ্যে যায়, সেদিকেই নজর থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই মুহূর্তে চন্দ্রশেখরনের তৃতীয় দফার মেয়াদ নিয়ে বোর্ডের অনুমোদন ও টাটা ট্রাস্টসের আইনি আপত্তি, দু’টিই আলাদা বাস্তবতা। বোর্ড ভোটাভুটির মাধ্যমে পুনর্নিয়োগ অনুমোদন করেছে। আবার টাটা ট্রাস্টস দাবি করছে, সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী সেই সিদ্ধান্ত বৈধ হয়নি। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের আইনি মতামতও ট্রাস্টসের অবস্থানকে সমর্থন করে বলে তারা জানিয়েছে। ফলে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে চন্দ্রশেখরনের প্রত্যাবর্তন আপাতত বোর্ডরুমের সিদ্ধান্তে থেমে নেই; এর পরের পর্ব নির্ধারিত হতে পারে সংস্থার বিধি, শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার এবং সম্ভাব্য আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi 76th birthday | Shah Rukh Khan Salman Khan wishes PM Modi | প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনে দুই খানের শুভেচ্ছা, শাহরুখের বার্তায় কী ছিল আর সালমানের সম্বোধনে কেন নজর?




