সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ওয়াশিংটন: পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা যখন ক্রমশ বিপজ্জনক দিকে এগোচ্ছে, ঠিক সেই সময়ই এক বিস্ফোরক মন্তব্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। ইরান (Iran) -মার্কিন সংঘাত ঘিরে যখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন ট্রাম্প দাবি করলেন, ‘ইরান আসলে চুক্তি করতে আগ্রহী, আর সেই চুক্তি আমেরিকার জন্য লাভজনক হতে চলেছে।’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে কূটনৈতিক মহলে। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল (Truth Social) -এ পোস্ট করে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরান আমাদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে চায়। এটা আমেরিকার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হতে পারে।’ একই সঙ্গে সমালোচকদের উদ্দেশে তাঁর কড়া ভাষা নজর কেড়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘পিছন থেকে ক্রমাগত সমালোচনা না হলে কাজ করা আরও সহজ হতো।’ শেষে তিনি বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বার্তা দেন, ‘চুপচাপ থাকুন, একটু ধৈর্য ধরুন, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
এই মন্তব্যের সময়টাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বাস্তবে পরিস্থিতি কিন্তু একেবারেই শান্ত নয়। মার্কিন সেনার একটি ড্রোন ভূপাতিত করার অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধে। তার জেরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম (CENTCOM বা US Central Command) পালটা বিমান হামলা চালিয়েছে ইরানের প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলিতে। এই হামলার জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (Islamic Revolutionary Guard Corps) মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানার দাবি করেছে।
সংঘাতের এই ধারাবাহিকতায় প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ইরান এবং লেবানন (Lebanon) -এ একাধিক হামলায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ ধীরে ধীরে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) ঘিরে সিদ্ধান্ত। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করার ইঙ্গিত দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের বক্তব্য নতুন প্রশ্ন তুলছে। তিনি যেখানে চুক্তির সম্ভাবনার কথা বলছেন, সেখানে বাস্তব পরিস্থিতি ক্রমেই সংঘর্ষমুখী হয়ে উঠছে। কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার পথ আপাতত আটকে রয়েছে বলেই জানা যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরা হচ্ছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনা। পাশাপাশি মার্কিন রাজনীতির দিক থেকেও এই ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই কারণেই দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইরানের অবস্থানও কঠোর। দেশের শীর্ষ আলোচক মহম্মদ বাঘের ঘালিবাফ (Mohammad Bagher Ghalibaf) জানিয়েছেন, ‘আমেরিকার ওপর ভরসা করা যায় না। আমাদের জনগণের অধিকার সুরক্ষিত না হলে কোনও চুক্তি সম্ভব নয়।’ তাঁর এই মন্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, তেহরান সহজে পিছিয়ে আসতে রাজি নয়।
এই সংঘাতের প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। লেবাননে হিজবুল্লাহ (Hezbollah)-এর বিরুদ্ধে ইজরায়েল (Israel)-এর সামরিক তৎপরতা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এই অবস্থায় মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও (Marco Rubio) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালাচ্ছেন বলে জানা গিয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির এই টানাপোড়েনে ট্রাম্পের মন্তব্য একদিকে যেমন আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে বাস্তব পরিস্থিতি তা নিয়ে সংশয় তৈরি করছে। যুদ্ধের আবহে দাঁড়িয়ে ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ এই বার্তা কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যে অস্থিরতার মেঘ জমেছে, তা কাটার কোনও লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Trump Xi Jinping meeting, US China relations | ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সঙ্গী হোক আমেরিকা-চিন’: ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠকে উষ্ণ বার্তা, বেজিঙে বদলাচ্ছে কূটনৈতিক সমীকরণ



