সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বেজিঙ: বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমেরিকা এবং চিন -এর সম্পর্ক নতুন মোড়ের ইঙ্গিত দিল। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের আবহে বেজিঙে মুখোমুখি বৈঠকে বসলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)। দুই রাষ্ট্রনেতার কথাবার্তা এবং শরীরী ভাষায় মিলল সম্পর্ক মেরামতির স্পষ্ট আভাস। আলোচনার শুরুতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে সহযোগিতার বার্তা তুলে ধরলেন জিনপিং, আর সেই সুরেই সায় দিলেন ট্রাম্পও। বৃহস্পতিবার সকালে বেজিঙের তিয়েনানমেন স্কোয়ারে (Tiananmen Square) অবস্থিত ‘গ্রেট হল অফ দ্য পিপল’ (Great Hall of the People)-এ লাল গালিচা পেতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান শি জিনপিং। নির্ধারিত সময়ের আগেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন চিনা প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প পৌঁছনোর পর দুই রাষ্ট্রনেতার করমর্দন এবং পরস্পরের প্রতি উষ্ণ আচরণ আন্তর্জাতিক মহলে নজর কেড়েছে। এরপর তাঁরা একসঙ্গে বৈঠক কক্ষে প্রবেশ করেন, যেখানে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের শুরুতেই ট্রাম্প বলেন, ‘আপনার বন্ধু হতে পেরে আমি সম্মানিত।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই বৈঠক আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং এখানে উপস্থিত শিল্পপতিরাও আপনার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন।’ এই সাক্ষাৎকে ‘এ যাবৎকালের অন্যতম বৃহৎ শীর্ষ সম্মেলন’ হিসেবেও উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে, শি জিনপিং ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমরা যদি একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে সঙ্গী হিসেবে দেখি, তা হলে দুই দেশের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের উচিত একে অপরকে সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করা। গোটা বিশ্ব এই বৈঠকের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।’ তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে সহযোগিতা এবং পারস্পরিক উন্নতির প্রসঙ্গ।
দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের শুল্ক নিয়ে উত্তেজনা এবং বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। গত বছর বাণিজ্য শুল্ক বৃদ্ধি নিয়ে ওয়াশিংটন (Washington) এবং বেজিঙ (Beijing)-এর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতির পর এই সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, আদৌ কি বরফ গলবে? অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই সফর প্রায় ৯ বছর পর কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্টের চিন সফর হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এর আগে ২০১৭ সালে শেষবার চিন সফরে গিয়েছিলেন তিনিই। তবে এ বার সফরের শুরু থেকেই এক ভিন্ন আবহ লক্ষ্য করা গিয়েছে। বেজিঙ বিমানবন্দরে ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন চিনা ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং (Han Zheng)। অতীতে এমন উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিকে পাঠানো হয়নি, যা কূটনৈতিক দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিন দিনের এই সফরে বুধবার বিকেলেই বেজিঙে পৌঁছন ট্রাম্প। তাঁর সফরসূচিতে একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, বাণিজ্য আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক কর্মসূচী রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই শীর্ষ বৈঠক, যেখানে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণ হতে পারে। বৈঠকের আগে থেকেই দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা চলছিল। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা চুক্তির বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, তবে আলোচনার সুর ইতিবাচক বলেই মনে করা হচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা এবং চিন দুই প্রধান শক্তি। তাদের সম্পর্কের ওঠানামা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং কূটনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। সেই প্রেক্ষিতে ট্রাম্প-জিনপিং বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বৈঠকের সময় দুই নেতার আচরণ, হাসি-মুখে কথাবার্তা এবং একে অপরকে সম্মান জানানোর ভঙ্গি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তবে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি কতটা বাস্তব রূপ পাবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের উপর। বাণিজ্য শুল্ক, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, এই সব বিষয় এখনও দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে রয়েছে। তবু আপাতত বেজিঙের এই বৈঠক বিশ্ব রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে সহযোগিতার পথে হাঁটার যে ইঙ্গিত দুই দেশের রাষ্ট্রনেতারা দিয়েছেন, তা ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : US Dollar, Donald Trump : মার্কিন ডলারে ট্রাম্পের স্বাক্ষর, ১৬৫ বছরের প্রথা ভাঙল আমেরিকা



