সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ৫জি-৬জি নেটওয়ার্ক, ডেটা সেন্টার থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্রযুক্তির প্রতিটি স্তরে দ্রুত বদল ঘটছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর, যা আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নীতি আয়োগ (NITI Aayog) -এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস, ভারতের সেমিকন্ডাক্টর বাজার আগামী এক দশকে অভূতপূর্ব গতিতে বাড়তে পারে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বর্তমানে ভারতের সেমিকন্ডাক্টর চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আগামী বছরগুলিতে এই প্রবণতা আরও ত্বরান্বিত হবে। হিসাব অনুযায়ী, বছরে গড়ে প্রায় ১৯ শতাংশ হারে এই বাজার বাড়তে পারে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ২০৩০ অর্থবর্ষে বাজারের আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার। এরপর পরবর্তী পাঁচ বছরে এই বৃদ্ধি আরও জোরদার হয়ে ২০৩৫ নাগাদ ২০০ বিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
নীতি আয়োগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘সেমিকন্ডাক্টর ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।’ বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence), ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT), ক্লাউড কম্পিউটিং, স্বয়ংক্রিয় যানবাহন এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তির বিস্তারে এই চিপের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। ডিজিটাল পরিষেবার প্রসার এবং ডেটা ব্যবহারের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে উন্নত মানের সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সেমিকন্ডাক্টর বাজারে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রিপোর্টে উল্লেখ, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এই শিল্প ৬.৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী কয়েক বছরে সেই হার বেড়ে ৮.৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে। ২০২৪ সালে যেখানে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৩১ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০৩০ সালে তা ১,০২৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩৫ সালে ১,৫৪৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ভারতের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি শুধুমাত্র ব্যবহারকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না বলেও মত দিয়েছে নীতি আয়োগ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘ভারতকে প্রযুক্তির নিচের স্তরের ভোক্তা হিসেবে আটকে থাকলে হবে না, বরং ভবিষ্যতের উদ্ভাবনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হতে হবে।’ এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ডিজাইন সক্ষমতা বৃদ্ধি, উন্নত প্যাকেজিং প্রযুক্তি এবং কৌশলগত উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খল অত্যন্ত জটিল এবং পারস্পরিক নির্ভরশীল। ফলে কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি উৎপাদন ও সরবরাহে পড়ে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, অতীতে এমন পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এই কারণেই এখন বহু দেশ নিজেদের শক্তিশালী স্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর পরিকাঠামো গড়ে তুলতে উদ্যোগী হচ্ছে।
ভারতও সেই পথে এগোতে চাইছে। কেন্দ্রীয় স্তরে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ, উৎপাদন সংক্রান্ত প্রণোদনা এবং প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এই উদ্যোগ সফল হলে শুধু আমদানি নির্ভরতা কমবে না, বরং রপ্তানির ক্ষেত্রেও বড় সুযোগ তৈরি হবে। সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবহার এখন আর শুধু স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, এমনকি কৃষিক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আধুনিক সেন্সর এবং প্রসেসরের সাহায্যে কৃষিজমির তথ্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করছে। প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য উন্নত চিপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের ফলে কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে গবেষণা, ডিজাইন, উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিপুল সংখ্যক দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে। ফলে শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাতেও নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। প্রসঙ্গত, বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা যখন তীব্র হচ্ছে, তখন ভারতের সামনে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি শুধু নিজের চাহিদা মেটাবে না, তা বৈশ্বিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। নীতি আয়োগের এই রিপোর্ট সেই সম্ভাবনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Kakoli Ghosh Dastidar resignation news, TMC internal conflict | দুর্নীতি থেকে ‘নৈতিক অভিঘাত’ : তৃণমূলের সব পদ ছাড়লেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার চিঠিতে বিস্ফোরক বার্তা



