নবারুণ দাস, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : প্রকৃতির সৌন্দর্য যে কত বিচিত্র রূপে ধরা দিতে পারে, তার অন্যতম দর্শনীয় স্থান ছত্তীসগঢ়ের বস্তার জেলার তীরথগড় জলপ্রপাত (Teerathgad Waterfalls)। ঘন অরণ্যের বুক চিরে একের পর এক ধাপে নেমে আসা সাদা জলরাশি দূর থেকেই তৈরি করে এক অন্য রকম দৃশ্য। প্রায় ৩০০ ফুট উচ্চতার এই জলপ্রপাত কঙ্গের ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের (Kanger Valley National Park) প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের অন্যতম আকর্ষণ। পাহাড়, জঙ্গল, পাথর আর জলের মিলনে তৈরি তীরথগড়ের পরিবেশ পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই আকর্ষণের কেন্দ্র। ছত্তীসগঢ়ের বস্তার অঞ্চল তার অরণ্য, পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য পরিচিত। সেই ভূপ্রকৃতির মধ্যেই কঙ্গের ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের বিস্তীর্ণ সবুজের ভিতরে অবস্থান তীরথগড় জলপ্রপাতের। শহরের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে যাঁরা প্রকৃতির কাছাকাছি কয়েকটি মুহূর্ত কাটাতে চান, তাঁদের কাছে এই জায়গার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। এখানে পৌঁছনোর পর প্রথম যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা হল পাথুরে স্তরের উপর দিয়ে নেমে আসা জল। উঁচু থেকে নিচে নামার সময় জল একটানা সরল পথে না গিয়ে একাধিক ধাপ তৈরি করে এগিয়ে যায়। সেই কারণেই তীরথগড়কে নিয়ে পর্যটকদের আগ্রহ এত বেশি।
এই জলপ্রপাতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মুঙ্গা বাহার নদীর (Munga Bahar River) নাম। নদীর জলই পাথুরে ভূখণ্ড পেরিয়ে নিচের দিকে নেমে গিয়ে জলপ্রপাতের রূপ নিয়েছে। বর্ষার সময়ে জলের পরিমাণ বাড়লে তীরথগড়ের দৃশ্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তখন পাহাড়ি ঢাল বেয়ে দ্রুত গতিতে জল নেমে আসে। পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে তৈরি হয় জলকণার অসংখ্য ঝিলিক। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজ অরণ্যের মাঝখানে সাদা রঙের একটি বিশাল পর্দা ঝুলছে। তীরথগড়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার ধাপ-ধাপ গড়ন। অনেক জলপ্রপাত যেখানে একটি নির্দিষ্ট খাড়া প্রান্ত থেকে নীচে পড়ে, সেখানে তীরথগড়ে জল পাথরের বিভিন্ন স্তর ধরে নেমে আসে। ফলে এক জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে জলপ্রপাতের উচ্চতা, গতি ও চারপাশের অরণ্যের দৃশ্য একসঙ্গে উপভোগ করা যায়। পাথরের স্তরগুলির বিন্যাসের সঙ্গে জলের গতিপথ মিলে একটি স্বাভাবিক দৃশ্যপট তৈরি করেছে, যার কোনও কৃত্রিম সংযোজনের প্রয়োজন নেই। তীরথগড় জলপ্রপাতের অবস্থান কঙ্গের ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের ভিতরে হওয়ায় এর চারপাশের পরিবেশও বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। ঘন গাছপালা, পাহাড়ি পথ ও অরণ্যের নীরবতার মধ্যে জল পড়ার শব্দ পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে অন্য মাত্রা দেয়। শহরে বসবাসকারী মানুষের কাছে এই ধরনের পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই আলাদা। এখানে মোবাইলের স্ক্রিন বা ব্যস্ত রাস্তার পরিবর্তে সামনে থাকে গাছের সারি, পাথুরে ঢাল এবং প্রবাহিত জল।
বস্তারের প্রাকৃতিক পর্যটনের মানচিত্রে তীরথগড়ের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে একাধিক প্রাকৃতিক আকর্ষণ থাকলেও জলপ্রপাতটির ধাপে ধাপে নেমে আসা জলধারা তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। পর্যটকেরা সাধারণত প্রকৃতির দৃশ্য উপভোগ, ছবি তোলা এবং আশপাশের অরণ্য ঘুরে দেখার জন্য এখানে আসেন। বর্ষাকাল ও তার পরবর্তী সময়ে জলপ্রপাতের জলধারা তুলনামূলক ভাবে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তবে পাহাড়ি জলপ্রপাতের ক্ষেত্রে আবহাওয়া ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত জলের সময়ে পাথর ভিজে পিচ্ছিল হয়ে যেতে পারে। তীরথগড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত নিকটবর্তী শহর জগদ্দলপুর (Jagdalpur)। বস্তার অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটি পর্যটকদের জন্য যাতায়াতের একটি বড় কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে। জগদ্দলপুর থেকে তীরথগড়ের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার বলে জানা যায়। ফলে শহর থেকে সড়কপথে দিনের মধ্যে জলপ্রপাত ঘুরে আসার পরিকল্পনা করা যায়। নিকটবর্তী রেল সংযোগের ক্ষেত্রেও জগদলপুর গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে থেকে বস্তার ভ্রমণে আসা পর্যটকদের কাছে তাই জগদলপুরকে কেন্দ্র করে তীরথগড়-সহ আশপাশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক স্থান ঘোরার সুযোগ তৈরি হয়।
তীরথগড়কে শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখলে জায়গাটির প্রকৃত গুরুত্বের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এটি কঙ্গের ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের অরণ্যভূমির অংশ। ফলে পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্লাস্টিক, বোতল, খাবারের প্যাকেট বা অন্য কোনও বর্জ্য ফেলে যাওয়ার প্রবণতা অরণ্য ও জলপ্রপাতের পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রকৃতির এই ধরনের জায়গায় পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ তাই অত্যন্ত প্রয়োজন। তীরথগড়ের সৌন্দর্যের আর একটি দিক হল এর নৈঃশব্দ্য। জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছলে প্রথমে হয়ত জলের গর্জনই কানে আসে। কিন্তু তার বাইরে অরণ্যের গভীর শান্ত ভাব গোটা পরিবেশকে ঘিরে থাকে। পাথরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জল, গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা আলোর ঝলক এবং পাহাড়ের সবুজ আবরণ মিলিয়ে তৈরি হয় এমন একটি দৃশ্য, যা ব্যস্ত জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অনেক পর্যটকের কাছে এই স্বাভাবিক পরিবেশই তীরথগড় ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
আরও পড়ুন : Kandy Honemoon Travelog | মধুচন্দ্রিমায় ক্যান্ডি: প্রেম, প্রকৃতির আতিথেয়তায়
বস্তারের পর্যটন নিয়ে আলোচনা হলে তীরথগড়ের নাম তাই বারবার উঠে আসে। প্রায় ৩০০ ফুটের এই ধাপযুক্ত জলপ্রপাত একদিকে যেমন ভূপ্রকৃতির বৈচিত্র্য তুলে ধরে, অন্যদিকে তেমনই কঙ্গের ভ্যালির অরণ্যসম্পদের সঙ্গে জল ও পাহাড়ের সম্পর্কও সামনে আনে। মুঙ্গা বাহার নদীর প্রবাহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই প্রাকৃতিক দৃশ্য বহু দূর থেকে আসা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। জগদ্দলপুর থেকে মাত্র কয়েক দশ কিলোমিটারের পথ পেরিয়েই এমন এক জায়গায় পৌঁছনো যায়, যেখানে শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে যায়। সামনে খুলে যায় অরণ্য আর পাহাড়ের অন্য একটি জগৎ। তার মাঝখানে পাথরের ধাপ বেয়ে নেমে আসে তীরথগড়ের জল। কখনও শান্ত, কখনও প্রবল জলের এই পরিবর্তনশীল রূপই জলপ্রপাতটির সৌন্দর্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আবার, ছত্তীসগঢ় রাজ্যের বস্তারকে যারা শুধু মানচিত্রের একটি অঞ্চল হিসেবে দেখেন, তাঁদের কাছে তীরথগড় নতুন করে সেই ভূখণ্ডকে চিনিয়ে দিতে পারে। এখানে প্রকৃতি কোনও একক উপাদানেই সীমাবদ্ধ না। নদী রয়েছে, পাহাড় রয়েছে, অরণ্য রয়েছে, তার সঙ্গে রয়েছে উচ্চতা থেকে নেমে আসা জলধারার দুরন্ত ছন্দ। কঙ্গের ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের সবুজ পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রায় ৩০০ ফুটের তীরথগড় জলপ্রপাত তাই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। জগদলপুর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটারের এই যাত্রা শেষ হলে যে দৃশ্য সামনে আসে, তা বস্তারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অনন্য রূপে তুলে ধরে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Hampi Travelog | মাতাঙ্গ পাহাড়ের চূড়ায় নিঃশব্দ বিস্ময়, সূর্যাস্তের আলোয় হাম্পি



