সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ভারতের নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) রাডারে এ বার প্রাক্তন ভোটকুশলী এবং জন সুরাজ পার্টির (Jan Suraaj Party) প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishor)। বিহার (Bihar) ও পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) ভোটার তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে, এমন অভিযোগে কমিশনের তরফে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক নোটিস পাঠানো হয়েছে। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি ১৯৫০ সালের ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (Representation of the People Act, 1950) অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য হবে।
কমিশন সূত্রে জানা খবর, ২৮ অক্টোবর প্রশান্ত কিশোরকে লেখা নোটিসে তাঁর কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে, কীভাবে একই সঙ্গে দুটি রাজ্যে তিনি ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, বিহারের রোহতাস জেলার সাসারাম লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে থাকা করহগর (Karhagar) বিধানসভা কেন্দ্র এবং দক্ষিণ কলকাতার (South Kolkata) ভবানীপুর (Bhowanipore) বিধানসভা কেন্দ্র, দুই জায়গাতেই তাঁর নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে। নির্বাচন আইনের ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি কেবল একটি নির্বাচনী কেন্দ্রে ভোটার হিসেবে নাম রাখতে পারেন। করহগর বিধানসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিকের তরফে পাঠানো নোটিসে বলা হয়েছে, “ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (Indian Express)-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভবানীপুরের ২১বি রানিশঙ্করী লেনের সেন্ট হেলেন স্কুলের (St. Helen’s School) বুথে ভোটার হিসেবে প্রশান্ত কিশোরের নাম রয়েছে। একই সঙ্গে করহগরের ভোটার তালিকাতেও তাঁর নাম নথিভুক্ত।” চিঠিতে প্রশান্ত কিশোরের বিহারের ঠিকানাসহ তাঁর ভোটার আইডি নম্বরেরও উল্লেখ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এক সিনিয়র কর্তা জানান, “এটি আইনের পরিপন্থী। ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করার সময় প্রত্যেক নাগরিককে ঘোষণা করতে হয় যে তিনি অন্য কোনও নির্বাচনী এলাকায় ভোটার হিসেবে নাম রাখেননি। যদি দেখা যায়, কেউ একাধিক রাজ্যে ভোটার হিসেবে নাম রেখেছেন, তা হলে সেটা সরাসরি আইনভঙ্গের শামিল।”
প্রশান্ত কিশোরকে সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জবাব দিতে বলা হয়েছে। কমিশনের তরফে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব না পেলে তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে। এই নোটিসের খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। বিহারে তাঁর নতুন দল জন সুরাজ পার্টি (Jan Suraaj Party) -এর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রশান্ত কিশোর যেভাবে দেশজুড়ে রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছেন, সেই প্রেক্ষিতে এই নোটিস তাঁর ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছিলেন প্রশান্ত কিশোর এবং তাঁর সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)। সেই সময় থেকেই তিনি ভবানীপুরে নিয়মিত কাজ করতেন। সেই সূত্রেই সম্ভবত তাঁর নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন কিছু মহল। তবে সেটি যদি হয়ে থাকে, তা প্রশাসনিক ত্রুটির ফল কিনা বা ইচ্ছাকৃতভাবে নাম রাখা হয়েছে কিনা, তা এখন কমিশনের তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
রাজনৈতিক মহলে জল্পনা, বিহারে নিজের দলকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করানোর লড়াইয়ে থাকা প্রশান্ত কিশোরের জন্য এই বিতর্ক সময়োপযোগী নয়। জন সুরাজ পার্টি আগামী নির্বাচনে বিহারের একাধিক আসনে প্রার্থী দেবে বলে ঘোষণা করেছে। ফলে এখন তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভাবমূর্তিই প্রশ্নের মুখে।
এক রাজনৈতিক কূটনীতিক বলেন, “প্রশান্ত কিশোর এমন এক ব্যক্তি যিনি দেশের একাধিক রাজ্যে নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত এই অভিযোগ নিঃসন্দেহে প্রতিপক্ষ দলগুলির হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে।” আইনজ্ঞদের মতে, যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে প্রশান্ত কিশোর স্বেচ্ছায় বা ইচ্ছাকৃতভাবে দু’টি রাজ্যে নাম রেখেছেন, তা হলে তাঁর ভোটার তালিকা থেকে একটি নাম বাদ দেওয়া হতে পারে এবং ভবিষ্যতে তাঁকে প্রশাসনিক জরিমানার মুখোমুখিও হতে হতে পারে। তবে যদি দেখা যায় এটি প্রশাসনিক ভুল, তাহলে কেবল সংশোধনের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশন উভয় রাজ্যের সংশ্লিষ্ট দফতরকে নির্দেশ দিয়েছে, তারা যেন প্রশান্ত কিশোরের ভোটার আইডি নম্বর যাচাই করে দেখে এবং তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে। কমিশনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, “আমরা চাই না কারও বিরুদ্ধে অন্যায় অভিযোগ উঠুক, তবে গণতন্ত্রের সুষ্ঠু প্রক্রিয়া রক্ষার স্বার্থে প্রতিটি ভোটারের রেকর্ড স্বচ্ছ হতে হবে।” তবে প্রশান্ত কিশোর এখন পর্যন্ত এই অভিযোগ সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা গেছে, তিনি শিগগিরই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করবেন এবং প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নেবেন। এই নোটিসে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে রাজনৈতিক নেতাদের নাগরিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নও। একজন ভোটার হিসেবে আইন মেনে চলা যেমন প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য, তেমনই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সেই দায় আরও বেশি। সেটিই এখন জনমতকে প্রভাবিত করছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sasraya News Sunday’s literature Special | 26th October 2025, Edition 85 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ২৬ অক্টোবর ২০২৫, রবিবার | সংখ্যা ৮৫




