সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তুলল কালীঘাট তৃণমূলের ভাঙন। দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় -এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র (Madan Mitra) আচমকাই শিবির বদল করে যোগ দিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) -এর দলে। বুধবার বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার কক্ষে তাঁর উপস্থিতি এবং সেখান থেকেই দলীয় সব পদ ছাড়ার ঘোষণা রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। সূত্রের খবর, এই সিদ্ধান্তের আগে হোয়াট্সঅ্যাপে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘সরি’ লিখে বার্তা পাঠান মদন। তাঁর এই পদক্ষেপ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, কেন এই হঠাৎ সিদ্ধান্ত? এর পেছনে কি চাপ, না কি দীর্ঘদিনের অস্বস্তি? ঘটনাচক্রে, শিবির বদলের ঠিক আগের দিনই এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (Enforcement Directorate) -এর পক্ষ থেকে তাঁর স্ত্রী ও দুই পুত্রকে তলব করা হয়েছিল পুরনিয়োগ সংক্রান্ত মামলায় বলে উল্লেখ। সেই ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে।
বুধবার সকালে নিজের গাড়ি চালিয়ে বিধানসভায় পৌঁছন মদন। সাদা পাঞ্জাবি ও কালো সানগ্লাসে তাঁকে দেখা যায় ঋতব্রতের পাশে বসে থাকতে। সেখানেই তিনি জানান, ‘আমি তৃণমূলেই আছি, শুধু ঘর বদল করেছি। আগের ঘরে হয়তো আরাম ছিল, এখানে কষ্ট আছে, আমি কষ্টটাই বেছে নিলাম।’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে জল্পনা আরও তীব্র হয়।
শিবির বদলের পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি মদন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন তিনি আমাদের পাশে থেকেছেন। আমরাও চেষ্টা করেছি নিজের মতো করে কাজ করার।’ তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান যে বদলেছে, তা পরিষ্কার করে দিয়েছেন তিনি। ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচিতেও তিনি ঋতব্রত শিবিরের সঙ্গে থাকবেন বলে জানান। বিধানসভায় বসেই দু’লাইনের কবিতা পাঠ করে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন মদন। তাঁর কথায়, ‘জীবনের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বুঝতে হচ্ছে কোন সাঁকো পার হতে হবে। আমি এখন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুধু তৃণমূলের বিধায়ক নই, আমি বাংলার বিধায়ক। দলের সব পদ ছেড়ে দিয়েছি, কিন্তু মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়িনি।’
শিবির বদলের পরেই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)-কে লক্ষ্য করে কড়া মন্তব্য করেন মদন। নাম না করেই তিনি বলেন, ‘ইতিহাসে লেখা থাকবে একজনের জন্যই বড় ক্ষতি হয়েছে।’ পরে সরাসরি অভিষেকের নাম নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ‘দলের ভেতরে শ্বাস নেওয়ার জায়গা ছিল না। ভয় তৈরি করা হচ্ছিল।’ এমনকি ইডি-র চাপ প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠতেই তিনি বলেন, ‘ইডির চেয়েও ভয়ঙ্কর অভিষেক।’ এই মন্তব্য ঘিরে তৃণমূলের অন্দরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও দলের তরফে একাংশের দাবি, এই শিবির বদলের পেছনে চাপের রাজনীতি কাজ করেছে। কালীঘাট তৃণমূলের নেতা কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) বলেন, ‘পরিবারকে নোটিস দিয়ে কাউকে বাধ্য করা হলে মানুষ তা দেখছে। শরীর অন্য দিকে গেলেও মন এখানে থাকবে।’ তাঁর এই মন্তব্যে পরিস্থিতির ইঙ্গিত স্পষ্ট।
অন্য দিকে বিজেপি (BJP) নেতা তাপস রায় (Tapas Roy) এই ঘটনাকে তৃণমূলের ভাঙনের বড় চিহ্ন বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘দলের ভিতরে যে অস্থিরতা চলছে, তা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এর প্রভাব রাজনীতিতে পড়বেই।’ উল্লেখ্য, রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে, বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূলের পরিষদীয় দলে বিভাজন তৈরি হয়েছিল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি বড় অংশ আলাদা অবস্থান নেয়। সেই শিবিরে ইতিমধ্যেই বহু বিধায়ক যোগ দিয়েছেন। অন্য দিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকা নেতাদের সংখ্যা ক্রমশ কমেছে। সেই তালিকায় এতদিন গুরুত্বপূর্ণ নাম ছিলেন মদন মিত্র। তাঁকে সাংগঠনিক দায়িত্ব দিয়ে দল ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন মমতা।
মদনের শিবির বদল সেই প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (Chandrima Bhattacharya), জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (Jyotipriya Mallick)-এর মতো একাধিক নেতা শিবির পরিবর্তন করেছেন। ফলে তৃণমূলের অন্দরের এই ভাঙন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। ঘটনার আরও একটি দিক হল সন্দীপন সাহা (Sandipan Saha)-র সঙ্গে মদনের যোগাযোগ। জানা গিয়েছে, শিবির বদলের আগের রাতে তিনি সন্দীপনের বাড়িতে যান। যদিও দেখা হয়নি, পরে ফোনে কথা হয় তাঁদের। মদন নিজেই জানিয়েছেন, ‘পুত্রসম’ সন্দীপনের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। এই যোগাযোগও শিবির বদলের প্রস্তুতির ইঙ্গিত বহন করে।
রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন, এই ভাঙন কোথায় গিয়ে থামবে? তৃণমূলের ভিতরে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, তা কি আরও বাড়বে? মদন মিত্রের মতো অভিজ্ঞ নেতার এই পদক্ষেপ রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। আগামী দিনে এই ঘটনার প্রভাব কতটা গভীর হয়, এখন সেটাই দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata supports Abhishek | দলত্যাগীদের কটাক্ষে তীব্র সুর, ‘বাঘের মতো লড়ছে অভিষেক’ : ভাইপোর পাশে দৃঢ় মমতা



