Sasraya News Sunday’s literature Special | 26th October 2025, Edition 85 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ২৬ অক্টোবর ২০২৫, রবিবার | সংখ্যা ৮৫

SHARE:

ম্পাদকীয়

সদ্য শেষ হল বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গা পুজো ও কালী পুজো। ইংরেজি বছরের শেষের ডঙ্কা বাজল অক্টোবরের শেষ মানেই আর দুই মাস নভেম্বর ও ডিসেম্বর।

উপবাসের সময় কলা (Banana), বাতাবি লেবু (Batabi Lemon), নারকেল (Coconut), আখ (Sugarcane) এবং পানিফল (Pan Leaves) পুজোর কাজে ব্যবহার করলে বিশেষ ফলপ্রসূ হয়। এই উপকরণগুলো কেবল পবিত্রতা বৃদ্ধি করে না, তা সূর্যদেবের কাছে ভক্তির প্রকাশ হিসেবে ধরা হয়।
ছট পুজো। ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত

ছট পুজো জগদ্ধাত্রী পুজো কার্ত্তিক পুজো সব একে একে চলে গেলেই বড়দিন এর উৎসবে মেতে উঠবে বিশ্ব। মানুষের সংস্কৃতি সৃষ্টির সকল ধর্মের ভালবাসা ও আবেগের মধ্যে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ভরপুর উদ্বেগ ও আনন্দের লীলায় শেষ হয় দিনের পর দিন। সকলে ভাল ও সুস্থ থাকুন। ছট পুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজোর আগাম শুভেচ্ছা ও ভালবাসা জানাই।🍁

 

 

🍁মহামিলনের কথা
 

সীতারাম লীলা আলেখ্য

শ্রী প্রমোদ রঞ্জন গুপ্ত

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

[শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাষণের অংশ বিশেষ ]

স্ত্রীগণের পৃথক যজ্ঞ নাই, দান নাই, তপস্যা নাই, ব্রত নাই, পূজা নাই— আছে শুধু পতিনারায়ণ ব্রত। আমার স্বামী নারায়ণ— এই ভাবে যে নারী স্বামীসেবা করেন, তার অন্য কোন ধর্ম কর্ম করতে হয় না।
এক রাজার মনে একদিন প্রশ্ন জাগলো যে আমি রাজা– আমারই অর্থে অমাত্যসকল, প্রজাবর্গ, আত্মীয় স্বজন, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা সকলেই ভরণপোষণ করে সুখে আছে– একথা কি সকলে স্বীকার করবে? আচ্ছা, আমি স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ভাবে সকলকেই জিজ্ঞাসা করবো। রাজা পর পর স্ত্রী, পুত্র প্রভৃতিকে জিজ্ঞাসা করলে তারা উত্তর দিলো— হে মহারাজ! আপনার কৃপায় আমরা সংসারে নানাবিধ ভোগ্যবস্তু লাভ করে পরম আনন্দে বাস করছি,অতএব আপনার অনুগ্রহেই আমরা সুখী ৷
তারপর রাজা স্বীয় কন্যাকে সম্বোধন করে বললেন, —বলতো মা,তুমি কার দ্বারা সুখী?
কন্যা উত্তর দিলেন, —“বাবা, আমি আমার প্রারব্ধে সুখী৷” রাজা মনে করেছিলেন কন্যা নিশ্চয়ই বলবে “বাবা তোমার কৃপায় সুখী৷” কিন্তু কন্যার বিপরীত উত্তরে রাজা অত্যন্ত রুষ্ট হলেন। মানুষের কামনা প্রতিহত হলে ক্রোধরূপে পরিণত হয়৷ এখানেও তাই হলো, রাজা কন্যার কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন— তুমি আমার স্নেহের দ্বারা পালিত, সর্ব্বদা রক্ষিত, অর্থ দ্বারা পুষ্ট ও নানা প্রকার ভোগ্য বস্তু বসন ভূষণ আহারাদি আমা কর্ত্তৃকই নিয়ত লাভ করেছ, আজ তুমি আমার মুখের সামনে বললে— “আমার প্রারব্ধে আমি সুখী৷” তুমি কি প্রকারে তোমার প্রারব্ধে সুখী হলে?
কন্যা উত্তর দিল, “বাবা! আমি আমার পূর্ব্ব সুকর্মের ফলে এই প্রারব্ধ লাভ করেছি যে রাজকন্যা হবো। তাই— আমার প্রারব্ধের ফলে আমি সুখ দুঃখ ভোগ করি,আপনার কাছ থেকে কোন সুখ বা দুঃখ আমি পাই না ৷”
রাজা কন্যার কথায় অধিকতর ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, “ওরে সূয়া, দেখি তোর প্রারব্ধে তুই কেমন সুখী!” এই বলে রাজা একদিন এক জরাগ্রস্ত ভিক্ষুক ব্রাহ্মণকে দেখে বললেন, “হে ব্রাহ্মণ ! আমি আমার কন্যা অনসূয়াকে তোমার করে সম্প্রদান করবো— তুমি কি স্বীকৃত আছ?”
রাজার কথা শুনে ব্রাহ্মণ বললেন, “হে মহারাজ! আপনি কি হেতু আমাকে উপহাস করছেন? আমি জরাগ্রস্ত দরিদ্র ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ, আমার কিছুমাত্র সম্বল নাই, আমি গাছতলায় অবস্থান করি, আমায় কন্যা দান করবেন বলে কেন উপহাস করছেন—”
রাজা বললেন, “না না, আমি উপহাস করি নাই, সত্যই আমি আমার কন্যাকে তোমায় সম্প্রদান করবো৷”
রাজা তার কন্যা অনসূয়াকে সেই ব্রাহ্মণের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বললেন,”মা! এই তোমার স্বামী, তোমার প্রারব্ধে নিশ্চয় এই স্বামী লাভই ছিল?”
কন্যা সহাস্যবদনে উত্তরদিল, “হাঁ বাবা,আমি এই স্বামীর দ্বারাই সুৃখী হবো, আমার প্রারব্ধে এই স্বামীলাভই ছিল৷”
বিয়ের পর থেকেই সেই কন্যার কাজ— কেবলমাত্র স্বামীসেবা৷ স্বামীসেবা জীবনের ব্রত মনে করে কায়মনোবাক্যে শুধু স্বামীসেবা করতে লাগলেন৷ নিত্য স্বামীকে নারায়ণবোধে পূজা করা, চরণামৃত পান করা এবং যথাসময়ে স্নান করান, খাওয়ান, স্বামীর শয়নাবস্থায় পদসেবা ও বাতাস করা প্রভৃতি সেবার দ্বারা স্বামীকে নিরন্তর আনন্দে সুখে রাখেন৷ স্বামীসেবা ছাড়া অনসূয়ার আর কোন কামনাই রইলো না৷ ব্যাপার হলো— মানুষ দুঃখ পায় কিসে ? যতদিন তারা বাইরের থেকে সুখ নিতে চায়। চোখ রূপের জন্য, জিভ রসের জন্য, ত্বক স্পর্শের জন্য, কান শব্দের জন্য নাসিকা গন্ধের জন্য ছুটছে; কিন্তু বাইরের সুখে তো আনন্দ নাই ৷ ক্ষণিক আনন্দের পরই জ্বালা প্রদান করে। সত্যিকারের আনন্দ বাইরে নয়—ভেতরে। নিজের হৃদয়ে আনন্দের রাজ্য, আলোর রাজ্য,ধ্বনির রাজ্য আছে— পৌঁছুতে হবে সেখানে ৷ যত মানুষ বাইরে থেকে যত যত সুখ নিতে থাকবে, তত দুঃখ অশান্তি ও জ্বালাই সার হবে। আর মানুষ যত যত ভেতরের দিকে যেতে চেষ্টা করবে; তত তত আনন্দের রাজ্যে গিয়ে পৌঁছে যাবে। স্বামীসেবা ব্যতীত সতী অনসূয়ার আর বাইরের সুখের কোন কামনা না থাকায় নিরন্তর স্বামীসেবা, পূজা ও স্বামীর ধ্যানে এক আনন্দ রাজ্যের সন্ধান তিনি পেলেন৷ নিজের কোন সুখের কথা চিন্তা না করে স্বামী কি প্রকারে সুখী হবেন— এই ছিল তার চিন্তা ৷ স্বামী যে নারায়ণ— এই জ্ঞান অনসূয়ার দৃঢ় হয়েছিল ৷

একবার বৈকুণ্ঠে শ্রীভগবানের সমীপে ব্রহ্মা, শিব ও ইন্দ্রাদি দেবগণ উপস্থিত ছিলেন ৷ প্রসঙ্গক্রমে তাঁরা আলোচনা করেন দেবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠা কে? সতীত্বে পাতিব্রত্যে কার নাম সর্ব্বাগ্রে উচ্চারিত হবে? কোন কোন দেবতা বললেন,”জগন্মাতা পার্ব্বতী দেবীই সতীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠা। গতজন্মে স্বামী নিন্দা শুনেই তিনি প্রাণত্যাগ করেন ৷”
আবার কোন দেবতা বললেন,”জগজ্জননী কমলাই সর্ব্বশ্রেষ্ঠা ৷”
এমন সময় হরিগুণগান করতে করতে দেবর্ষি নারদ সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রশ্ন করলেন— “আজ আপনাদের কি প্রসঙ্গ হচ্ছে?” দেবগণ বললেন,”সতীর প্রসঙ্গ। স্ত্রীগণের মধ্যে সতীত্বে পাতিব্রত্যে কে শ্রেষ্ঠা? দেবীগণের মধ্যে কার স্থান সবার উচ্চে?”
“শ্রীনারদ বললেন, যদি কোন অপরাধ না নেন তো বলি, সতীগণের মধ্যে মর্ত্যে অত্রিপত্নী অনসূয়ার স্থান সবার উপরে৷”
নারদের কথায় ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর— ব্রাহ্মণের বেশ ধারণ করে অত্রিমুনির আশ্রমে এসে উপস্থিত হয়ে বললেন, “আমরা অতিথি, আজ মধ্যাহ্নে এখানে আহার করবো। মুনিবর! আপনার সাধ্বী স্ত্রী যদি নিজ হাতে রান্না করে ও বিবস্ত্রা হয়ে লজ্জা ত্যাগ করে আমাদের খাওয়াতে পারেন, তবে আমরা খেতে পারি৷”
অত্রিমুনি ব্রাহ্মণগণের কথায় ভীত ও চমৎকৃত হয়ে গেলেন ! তখন তিনি সে কথা অনসূয়াকে বললেন,অনসূয়া স্বামীকে প্রণাম করে বললেন, “আপনি চিন্তা করবেন না, আমি আপনার কৃপায় ব্রাহ্মণগণকে আনন্দিত মনে ভোজন করাবো।”
রান্নার পর অনসূয়া হাতে জল নিয়ে বললেন, “যদি আমি সতী হই, কায়মনোবাক্যে শুধু স্বামীসেবা করে থাকি, স্বপনেও কখনো পরপুরুষের কথা চিন্তা না করে থাকি, তবে এই ব্রাহ্মণ বেশধারী ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব শিশু হউন৷”
তৎক্ষণাৎ ব্রাহ্মণ বেশধারী ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর শিশু হয়ে গেলেন৷ অনসূয়া তাঁদের প্রীতমনে খাওয়ালেন। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর শিশুরূপে হামাগুড়ি দিয়ে আশ্রমে খেলা করেন। ওদিকে দেবগণ, জগজ্জননী কমলা, ব্রহ্মাণী এবং পার্ব্বতীদেবী চিন্তা করতে লাগলেন— ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর কেন এখনও ফিরে এলেন না ৷ তারপর তাঁরা অত্রিমুনির আশ্রমে উপস্থিত হয়ে দেখেন— ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর শিশু হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে ঘুরে খেলা করছেন এবং মা অনসূয়া তাঁদের পুত্রভাবে পালন করছেন। দেবীগণ সতী অনসূয়াকে নিজ নিজ পরিচয় দিয়ে বললেন, “মা! আমাদের স্বামীরা কোথায়?” অনসূয়া ক্রীড়ারত শিশুত্রয়কে দেখিয়ে বললেন,”এঁরাই আপনাদের স্বামী৷”
তাঁরা সমস্ত অবগত হয়ে অনসূয়ার পাতিব্রত্যকে শ্রেষ্ঠ স্বীকার করলেন। জগন্মাতা কমলা ও পার্বিবতীদেবী অনসূয়াকে বললেন,”হে সতীশিরোমণি পতিব্রতে! তোমার পাতিব্রত্যের শক্তিতে স্বয়ং ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর শিশু হয়ে আছেন, তুমি তাঁদের মুক্ত কর৷ তাঁরা যেন আপন আপন স্বরূপ প্রাপ্ত হন। তোমার অনন্য পতিসেবায় আমরা অত্যন্ত খুশি হয়েছি। তোমার পতি-নারায়ণ রোগ ও জরা মুক্ত হয়ে সুন্দর শরীর ধারণ করে দীর্ঘজীবী হোন৷”
পতিব্রতা অনসূয়া পুনরায় হাতে জল নিয়ে বললেন, “যদি আমি কায়মনোবাক্যে কেবলমাত্র পতিসেবা করে থাকি, পতি নারায়ণ যদি আমার প্রতি প্রসন্ন থাকেন, তবে হে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর, —আপনারা আপন আপন রূপ ধারণ করুন।”
তাঁরা আপন আপন স্বরূপ প্রাপ্ত হয়ে আনন্দিত মনে অনসূয়াকে বললেন, “মা, তুমি বর প্রার্থনা কর৷ তুমি যা চাও তাই দিবেন ৷” সতী অনসূয়া বললেন, “আপনারা তিনজনেই আমার পুত্র হোন্ ৷” ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর ভগবান দত্তাত্রেয় রূপে অনসূয়ার পুত্র হয়েছিলেন ৷
একদিন অত্রিমুনি স্ত্রীর অনন্য ভক্তিসহকারে সেবার দ্বারা সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “অনসূয়া! তোমার একনিষ্ঠ সেবায় আমি পরম প্রীতিলাভ করেছি, তুমি মনোমত বর প্রার্থনা কর৷”
অনসূয়া বললেন, “আপনি যখন আমার প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন এইতো আমার বর, অন্য বরে আমার প্রয়োজন নাই ৷”
তারপর অত্রিমুনি একটি বিরাট যজ্ঞানুষ্ঠান করেন। সে যজ্ঞে ব্রহ্মা বিষ্ণু শিবাদি দেবগণ, বহু মুনিও ঋষিগণ শুভাগমন করেন। পৃথিবীর সমস্ত রাজগণ পর্য্যন্ত সে মহাযজ্ঞে যোগদান করত কৃতার্থবোধ করেছিলেন। যজ্ঞান্তে সমস্ত রাজগণ যখন মহামুনি অত্রি ও অনসূয়াকে প্রণাম করে বিদায় নেন,তখন অনসূয়া তাঁর পিতা রাজাকে প্রণাম করতে দেখে বললেন,”বাবা! বাবা! আমায় প্রণাম করবেন না, আমি আপনার কন্যা অনসূয়া৷”
রাজা পুনরায় কন্যা অনসূয়াকে লাভ করে ও তাকে জগৎপূজ্যা দেখে আনন্দসাগরে নিমজ্জিত হলেন ৷
তাই বলছিলাম— সতীনারী অসাধ্যসাধন করতে পারেন৷ ভারত হলো বৈকুণ্ঠের প্রাঙ্গণ, এই ভারতে স্বামীসেবাই নারীর পরম ধর্ম ৷🍁 (বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)

 

🍁ফিরেপড়া | গল্প 

 

শুনেছি, সামুকাকারা মস্ত জমিদার ছিলেন। কিন্তু দেশভাগের পর কলকাতায় এসে বেশ অসুবিধার মধ্যেই পড়েছিলেন। নইলে, আমাহেন অসুরকে সুরের জগতে হাতছানি দিতে তিনি আদৌ রাজি হতেন না। ওঁর নিজের গলাটা বা গায়কি যে খুব ভালো ছিল এমন আমার মনে পড়ে না। কিন্তু উনি খুব বড়ো জাতের শিল্পী ছিলেন। বড়ো গায়কদের মধ্যে কিছু মানুষকে দেখেছি পরবর্তী জীবনে, যাঁদের শিল্পীসত্তা বলে কিছু যে আছে একথা স্পষ্টভাবে তো দূরের কথা, অস্পষ্টভাবেও অনুভব করিনি। না তাঁদের বহিরঙ্গরূপে,না অন্তরঙ্গ রূপে। সে কারণেই সামুকাকার স্মৃতি মনে এখনও উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

 

গানের সামুকাকা


বুদ্ধদেব গুহ

বাইরে বিকেল হয়ে এল। জীবনেও বিকেল হব হব। এই সব মুহূর্তে পিছনে হেঁটে যেতে ইচ্ছে করে। ঝরা পাতা আর ঝরা স্মৃতি মাড়িয়ে কবর দেওয়া জীবনকে রেজারেক্টেড করতে ইচ্ছে হয় বড়ো। কত পথ পেরিয়ে এলাম, শহর বনের দেশ বিদেশের কত বর্ণনা, কত নারী, কত সুখ, কত দুঃখ। হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা লালচে-হলুদ ফুলের পাপড়ির মতো স্মৃতির টুকরো ভিড় করে মাথার মধ্যে। তারপরই বর্তমান দৌড়ে এসে মনকে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেপ্তার করে বর্তমানের কয়েদঘরে ঢুকিয়ে দেয়। ভাবা হয় না, যাওয়া হয় না। ফেলে-আসা পথ আর সুঁড়িপথে। তবু। কচিৎ অবসরের ফাঁক-ফোঁকে স্মৃতির খড়কুটো মুখে করে সাহসী চড়ুইয়ের মতো ভাবনা উড়ে এসে ডানা ফরফর করে কিছুক্ষণ। তার পরেই আবার উড়ে যায়। আসে, যায়, বাসা বাঁধে না। পরিসর নেই।

ছেলেবেলায় আমাকে গান শেখাবার জন্যে সামুকাকা আসতেন। সামু লাহিড়ী।

সামুকাকা ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন। পায়ে পাম্প সু। গায়ের রং কালো। বরেন্দ্রভূমির মানুষদের তীক্ষ্ণ নাসার প্রতীকি চিহ্নে চিহ্নিত। হাসিটা ছিল বড়ো মিষ্টি।

দিলরুবার নীলরঙা কভারটি মুখ নীচু করে খুলতে খুলতে সেই যে হেসেছিলেন সামুকাকা। সেই হাসিটির কথা এখনও মনে পড়ে বার বার। আজও সেই হাসির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝে উঠতে পারিনি। সেই হাসির মধ্যে বড়ো জ্বালা ছিল। অসহায়তা এবং হয়তো একটু ঘৃণাও!

আমি তানপুরা ছেড়ে গান গাইতাম এবং উনি দিলরুবা বাজিয়ে সঙ্গত করতেন। শেখাতেনও দিলরুবা বাজিয়েই। বড়ো চমৎকার হাত ছিল ওঁর। হাতের দরদে বড়ো যন্ত্রণা হত বুকের মধ্যে। ওই বয়েসেও। ঘরের আলো নিবিয়ে দিতে বলতেন। কোনোদিন বারান্দাতেও বসতাম। জানালা দিয়ে জ্যোৎস্না এসে পড়ত ঘরের মধ্যে। আর ওঁর দিলরুবার কান্নায় সারা পাড়া ভিজে যেত। হারমোনিয়াম ছিল না, তা নয়, কিন্তু দিলরুবা এবং তানপুরা বাঁধার কাজে লাগানো ছাড়া হারমোনিয়াম ব্যবহৃত হত না। কোনোদিন হঠাৎ ইচ্ছে হলে সামুকাকা মায়ের অর্গান বাজিয়েও গান শোনাতেন বা, শেখাতেন। সেদিন গান শেখার চেয়েও অনেক বড়ো প্রাপ্তি জুটত।

মা কখনো সন্ধ্যাবেলা চান করে উঠে স্নিগ্ধরূপ এবং সদ্যস্নাতা শরীরের সুগন্ধে ঘর ভরে দিয়ে এসে দাঁড়াতেন। সামুকাকাকে দু-একটি বিশেষ গান গাইতে অনুরোধ করতেন। কোনো কোনোদিন মা নিজেও গাইতেন অর্গান বাজিয়ে।

দারুণ সুরেলা ছিল মায়ের গলা। আরও একটা ব্যাপার ছিল মায়ের গানে। মা যখন গাইতেন তখন তাঁর গান যেন তাঁকে কলকাতা থেকে অনেক দূরে মায়ের ছেলেবেলার স্মৃতিবিজড়িত উশ্রী নদী, খান্ডুলিপাহাড় আর শালবনের জগতে ভাসিয়ে নিয়ে যেত। মনে হত, শুধু নিজেকেই নয়, যাঁরাই তাঁর গান শুনতেন, তাঁরাই তাৎক্ষণিক পরিবেশ থেকে অনেক দূরে চলে যেতেন মনে মনে।

শুনেছি, সামুকাকারা মস্ত জমিদার ছিলেন। কিন্তু দেশভাগের পর কলকাতায় এসে বেশ অসুবিধার মধ্যেই পড়েছিলেন। নইলে, আমাহেন অসুরকে সুরের জগতে হাতছানি দিতে তিনি আদৌ রাজি হতেন না। ওঁর নিজের গলাটা বা গায়কি যে খুব ভালো ছিল এমন আমার মনে পড়ে না। কিন্তু উনি খুব বড়ো জাতের শিল্পী ছিলেন। বড়ো গায়কদের মধ্যে কিছু মানুষকে দেখেছি পরবর্তী জীবনে, যাঁদের শিল্পীসত্তা বলে কিছু যে আছে একথা স্পষ্টভাবে তো দূরের কথা, অস্পষ্টভাবেও অনুভব করিনি। না তাঁদের বহিরঙ্গরূপে,না অন্তরঙ্গ রূপে। সে কারণেই সামুকাকার স্মৃতি মনে এখনও উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

আমার জীবনের প্রথম গানের শিক্ষক বলেই নয়, সামুকাকাকে কোনোদিনও ভুলতে পারব না। নিশ্চয়ই এ জীবনে, অন্য একটি বিশেষ ঘটনার জন্যে।

এক রবিবার, সকালবেলা আমি বসে পড়াশোনা করছি, সামুকাকা হঠাৎ এলেন, সেই সময়ে, সেদিনে তাঁর আসার কথা ছিল না। তিনি আসতেন সপ্তাহের বিশেষ দিনে, সন্ধ্যেবেলায়। খুব আস্তে কথা বলতেন উনি। বাকি কথাটাকে উচ্চারণ করতেন বাঁকি। দেখাতে বলতেন, ঠাহর, আর কথায় কথায় বলতেন চিন্তা করো একবার। উত্তরবঙ্গের মানুষরা অনেকেই এই রকম বলে থাকেন।

খুব আস্তে আস্তে উনি বললেন, মা কোথায়? আমি ভিতরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে এলাম।

মা চানে গেছেন।

দেরি হবে খুব?

আবার গেলাম।

ফিরে এসে বললাম, একটু।

সামুকাকা স্থির হয়ে সোফায় বসে রইলেন। ঘড়ি দেখলেন একবার। হলঘরের দেওয়ালে টাঙানো বাঘের-হাঁ করা মুখের দিকে চেয়ে থাকলেন শূন্যদৃষ্টিতে, সামান্য বিরক্তি মিশিয়ে।

চা খাবেন?

না। আজ, এখন নয়।

মা বাথরুমে গেলে বেশ সময় নিতেন। তারপর চান সেরে উঠে বড়ো করে সিঁদুরের টিপ পরতেন। কিউটিকুরা পাউডারের গন্ধ ছাপিয়ে উঠত চানের পরেই, পাটভাঙা শাড়ির গন্ধর সঙ্গে।

ওঁর সঙ্গে গান এবং অন্যান্য ব্যাপারে কথা বলার চেষ্টা করছিলাম আমি, কিন্তু সেদিন সব কথাই সামুকাকা এড়িয়ে গেলেন। মিনিট সাত-আট বসেই, উঠে দাঁড়ালেন। হঠাৎই।

বললেন, চলি। আমার একটু তাড়া ছিল। বুঝলে।

মাকে কি বলব কিছু?

বলবে? নাঃ। কী আর বলবে?

বাড়িতে ঠাকুমা আছেন। ডাকব? বাবা তো কলকাতায় নেই। তানুকাকাও নেই।

জানি। না না, ঠাকুমাকে আর ডাকবে কেন? সামুকাকা চলে যাবার মিনিট পাঁচেক পর মা এলেন। কোথায়? কোথায় গেলেন রে উনি?

উনি তো চলে গেলেন।

সে কি? আশ্চর্য মানুষ তো। হঠাৎ যখন এসেছিলেন এমন করে, নিশ্চয়ই জরুরি কথা ছিল কোনো। তুই বসালিনা কেন জোর করে?

বললেন যে, তাড়া আছে।

বাড়ি চিনিস?

আমি কী করে চিনব?

ড্রাইভারেরও তো অসুখ। ঠিকানা দিয়ে কাউকে পাঠালে হত। কী যে করি!

কী আর করবে? তেমন জরুরি কিছু হলে কি আর বসতেন না? এদিকে বোধ হয় কোনো কাজে এসেছিলেন।

জানি না।

মা বললেন।

পরের সপ্তাহে সামুকাকার সেদিন আসার কথা, সেদিন তিনি এলেন না। তার পরের সপ্তাহে এলেন, যেমন আসতেন সন্ধ্যেবেলায়। আমার ঘরের ফরাসে বসে উনি মুখ নীচু করে দিলরুবার কভারের বোতাম খুলছিলেন। সামনে তেপায়াতে জলখাবার আর চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল পাখার হাওয়াতে।

সেদিন কেন এসেছিলেন সামুকাকা? মা আপনাকে জিগগেস করতে বলেছেন। আপনিও চলে গেলেন, আর মা-ও বাথরুম থেকে বেরুলেন। মাকে কি ডাকব?

সামুকাকা, বোতাম খোলা বন্ধ রেখে উদাস চোখে জানালা দিয়ে বাইরের নারকোল গাছগুলোর দিকে একটুক্ষণ চেয়ে রইলেন। আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে, সামান্য কেশে হেসে বললেন। একটা ঘটনা…

ওঁর মুখে আশ্চর্য এক হাসি ঘাসের মতো লেগে রইল।

কি?

আমার স্ত্রী মারা গেলেন।

কখন? কবে?

ওই রবিবারই, যেদিন তোমাদের এখানে এসেছিলাম, সকাল আটটায়। কিছু টাকার দরকার ছিল। তাই…

আমি আর কথা না বলে এক দৌড়ে গিয়ে মাকে ডেকে আনলাম। মা তো শুনে কেঁদেই ফেললেন। মাকে আমি কখনো শব্দ করে কাঁদতে শুনিনি। চোখ দিয়ে জল গড়াত শুধু।

ছিঃ ছিঃ। আপনি তো ওকেও বলতে পারতেন।

সামুকাকা তাচ্ছিল্যের গলায় বললেন, দুর–মৃত্যুর মতো অমোঘ এবং তুচ্ছ ব্যাপারের জন্য আপনার চানের ব্যাঘাত করতে চাইনি বউদি! মৃত্যু আসেই, মানুষকে চানও করতে হয়। দুটোই অমোঘ ব্যাপার। সব হয়ে গেছে। ঠিকঠাক। কিছুই ঠেকে থাকেনি!

মা বললেন, ছিঃ ছিঃ কী যে করলেন আপনি।

বলেই, চলে গেলেন।

ফিরে এলেন খামভরতি টাকা নিয়ে।

সামুকাকা হাসলেন।

বললেন, টাকার দরকার তো ছিল তাঁরই। দোষ ছিল না। পার্টিশনের ধাক্কাটা সামলেই উঠতে পারলো না। একভাবে থেকে এসেছে ছোটোবেলা থেকে, আর এককেবারে হঠাৎই অন্যরকম। সকলে সব কিছু অ্যাডজাস্ট করে নিতে পারে না, বুঝলেন বউদি! ও পারেনি।

মা বললেন, এটা রাখুন। রাখুন। এই যে, শুনছেন।

দুর–বলে আবারও হাসলেন সামুকাকা।

মুখ ফিরিয়ে বললেন, সাহায্য, দান এসব নেওয়ার অভ্যাস নেই বউদি। লোককে চিরদিন তো দিয়েই এসেছি, লোকের জন্যে করেই এসেছি, নিইনি কারো কাছে থেকে কখনো। হয়তো শিগগিরই অভ্যেস করে ফেলতে পারব। কিন্তু এখনও সময় লাগবে।

মুখ নামিয়ে একটু চুপ করে থেকে বললেন, দুঃখ কষ্ট ওসব তাকেই বেজেছিল বেশি করে। সে চলে যাওয়াতে, আমার সব প্রয়োজনই আপাতত ফুরিয়ে গেছে।

একটু আবার চুপ করে থেকেই বললেন, ধরো, ধরো গান ধরো। গানের মতো জিনিস নেই। প্রাণ, মানুষের প্রাণ কত সহজে চলে যায়। এই তো! আমার হাতের মধ্যেই চলে গেল। কত বছরের। পার্টনার। গান কিন্তু থেকেই যায়। গানের প্রাণ অজেয়, অমর, আশ্চর্য। বউদি বসুন, বসুন। আজ আমরা সকলে একসঙ্গে গান গাই, গান শুনি।

চা-জলখাবার সবই তো ঠান্ডা হয়ে গেল।

মা বললেন, স্বগতোক্তির মতো।

মাকে খুব অপরাধী-অপরাধী দেখাচ্ছিল।

যাক। আপনি অর্গানে বসুন।

দিলরুবার নীলরঙা কভারটি মুখ নীচু করে খুলতে খুলতে সেই যে হেসেছিলেন সামুকাকা। সেই হাসিটির কথা এখনও মনে পড়ে বার বার। আজও সেই হাসির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝে উঠতে পারিনি। সেই হাসির মধ্যে বড়ো জ্বালা ছিল। অসহায়তা এবং হয়তো একটু ঘৃণাও!

সেই ঘৃণা কার প্রতি? তাঁর নিজের প্রতি? অথবা আমাদের প্রতিই কি? সেদিন বুঝিনি, খুবই ছোটো ছিলাম। আজও যে পুরো বুঝি এমনও নয়, কিন্তু মন বুঝি-বুঝি করে।

বড়োই লজ্জা পাই।🍁

 

 

🍂ধারাবাহিক পন্যাস

 

কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।

 

শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

একটি দৃশ্যের জন্ম

মানুষের নিজের পা যখন অবাধ্য হয়ে যায় তখনই জীবনে এক একটি দৃশ্যের জন্ম হয়। কেন হয়, হিরণ্য জানে না। নিজের পা, নিজের শরীরের অঙ্গ, তবু এতখানি বেপরোয়া হয়ে উঠবে কেন? ইচ্ছে করলে তো আটকে রাখা যায় নির্দিষ্ট পথে, নিয়মে বাঁধা রুটিনে। টিউশনের সময় মতো যাওয়া, ক্লাস নেওয়া, খাতা দেখা, বাজার থেকে সবজি আনা, মাসের প্রথম সপ্তাহে বিদ্যুতের বিল জমা দেওয়া, এসব তো তারই নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি। তবু হিরণ্যর ক্ষেত্রে পা যেন অন্য কারও নির্দেশ শোনে, নিজের বশে থাকে না। যেন পথই পায়ের মালিক, পথই বলে দেয়, আজ নতুন কিছু দেখবি, আজ নতুন পথে চলবি।

অরুণিমা বলেছিল, একটা কথা বলব? আমাদের ছবিগুলো জমিয়ে রেখো না, ডিলিট করে দিও। মেসেজগুলোও মুছে দিও। নইলে কষ্ট পাবে। ধরে নাও, আজ থেকে আমরা কেউ কারও পরিচিত নই। আমাদের আর দেখা না হওয়াই উচিত। পারলে ফেসবুকে আমাকে ব্লক করে দিও। হিরণ্য প্রতিটি কথা পালন করেছিল। ছবি, মেসেজ সব মুছে ফেলেছিল। শুধু ফেসবুকের জানলাটা বন্ধ করতে পারেনি। পরে অরুণিমাই জোরে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।

অনেক সময় সে ভাবে, এ অবাধ্যতা আসলে পায়ের নয়, তার ভেতরে লুকোনো এক অচেতন ইচ্ছার, যা মুখে প্রকাশ পায় না, কিন্তু পা হয়ে ওঠে তার মুখপাত্র। সেই চিন্তাই আবার আজ হিরণ্যর মাথায় ঘুরপাক খেল। দুপুরবেলা হঠাৎ এক অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল, টুংটাং করে বেজে উঠল মোবাইল। এর পিছনে পায়ের কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয়। তবু রিংটোন শুনে তার পা চঞ্চল হয়ে উঠল। সে চাইছিল ফোনটা রিসিভ না করতে। মন বলছিল, ধুর, কোথাকার কে! হয়ত ইনিয়ে-বিনিয়ে গল্প করবে সাতকাহন, কিংবা পুরনো কোনও পরিচিত নিজের সাফল্যের দেমাক দেখাবে, বলবে কীভাবে জীবনে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে ওপরে উঠেছে, গাড়ি কিনেছে, শহরের ফ্ল্যাটে থাকে। তখন তার নিজের ছোট টিউশনি জীবনের সামনে সে একেবারে তুচ্ছ হয়ে যাবে। কিন্তু পাদুটি যেন হাতকে উসকানি দিল, আঙুলে চাপ পড়ল কল বাটনে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে বলে উঠল, হ্যালো?
গলার স্বর চিনতে কোনো কষ্ট হল না। সৌম্য। সেই হাজার ওয়াটের হাসি, সেই চওড়া গলার উচ্ছ্বাস। দশকের ব্যবধানেও অটুট। কলেজজীবনের আড্ডাঘরে যে সবসময় প্রাণসঞ্চার করত, হিরণ্যকেও টেনে নিয়ে যেত উন্মাদনার আবেশে। সৌম্যর গলা ভেসে এল, কাল আমাদের অনুষ্ঠানে আসতে পারবি? তোর কবিতা শুনব।
কবিতা! শব্দটা শুনেই বুকের মধ্যে ধাক্কা লাগল। কবিতা তো বহু আগেই বিদায় নিয়েছে হিরণ্যর জীবন থেকে। কবিতা নামক সোনার মাছিটাকে সে খুন করে ফেলেছে নিজের হাতে। যাকে কবর খুঁড়ে আবার তুলতে গেলে কেবল দুর্গন্ধ, কেবল অতীতের ছাই মিলবে। কতদিন ধরে সে আর কবিতার দিকে তাকায়নি। খাতার কোণে লেখা শেষ কয়েকটি লাইনও এখন ধুলো জমে আছে আলমারির নিচে। কবিতা তার কাছে বিলাসিতা। এখন টিউশনই তার ধ্যানজ্ঞান। ক্লাস নাইনের এক ব্যাচকে ডেকেছে কাল। পরীক্ষার আগে শেষ মুহূর্তের কিছু টিপস দেওয়া বাকি। কবিতার জন্য সময় নেই, কবিতা তার জীবনে কোনও প্রয়োজনীয়তাও নেই।
তবু তার পা দু’টি হঠাৎ চিড়বিড় করে উঠল। যেন বলল, চলো হিরণ্য। মাথাটাও অনিচ্ছায় নড়ে গেল। বুকের মধ্যে কৌতূহল দানা বাঁধল। সে বলে ফেলল, কোথায়?
সৌম্য হাসল, কবিতা কর্নার। বিকেল পাঁচটায়।
কবিতা কর্নার! শব্দ দু’টি কানে আসতেই মস্তিষ্কে ঝলসে উঠল স্মৃতি। সেই কলেজজীবন, সেই আড্ডা, কাগজ-কলমের শব্দ, কবিতার উন্মাদনা, রাতভর লিখে যাওয়া, অরুণিমার চোখের আলো। যেন সব একসঙ্গে ফিরে এলো। অবাধ্য পা আরও জোরে টানতে লাগল, যেতেই হবে।
পরদিন দুপুর। আকাশে হালকা কুয়াশা, রোদ ম্লান। হিরণ্য টিউশনের খাতা গুছিয়ে বেরোল। মন তার চঞ্চল, বুক ধড়ফড় করছে। বাইরে রাস্তায় শোরগোল, বাসস্ট্যান্ডে লাইন। দুপুরের বাস সাধারণত ফাঁকাই থাকে, কিন্তু আজ ভিড়। ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে দাঁড়িয়ে পড়ল হিরণ্য। প্রতিটি স্টপেজে সে তাকায়, যদি কেউ নামে, যদি একটা সিট খালি হয়। মানুষের মুখ পড়তে ভালবাসে সে। ভিড় বাসে অচেনা মুখের ভিড়ে কত গল্প লুকিয়ে থাকে। কারও চোখে ক্লান্তি, কারও চোখে আশা, কারও ঠোঁটে বিরক্তি।
হিরণ্যর চোখ হঠাৎ থমকে গেল। বুকের ভেতর যেন ধাক্কা খেল। অরুণিমা। হ্যাঁ, অরুণিমাই তো! কোঁকড়ানো চুল, চোখে সানগ্লাস, গালের নিচে সেই তিল ধ্রুবতারার মতো জ্বলছে। চোখের সামনে যেন হঠাৎ বাস্তব আর অতীত মিলেমিশে এক হয়ে গেল।
আজ তার পা ভয়ানক ভুল করেছে। যদি মুখোমুখি হয়ে যায়, যদি চোখে ফুটে ওঠে সেই অস্বস্তিকর জিজ্ঞাসা, তুমি এখনও একজন পরস্ত্রীর ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছো হিরণ্য? কী চাও তুমি? আমার সংসারের শান্তি নষ্ট করতে?
তার মনে হল, এখনই নেমে যাবে বাস থেকে, আবার বাড়ি ফিরে যাবে। তারপর সৌম্যকে ফোন করে জানিয়ে দেবে, যেতে পারলাম না রে, শরীর খারাপ লাগছিল। হয়ত সৌম্য বিশ্বাস করবে না, কিন্তু অন্তত একটুখানি সম্মানজনক পথ পাওয়া যাবে।
অরুণিমা তাকিয়ে আছে জানলার বাইরে। বাইরেও তেমন কিছু নেই, বিবর্ণ দেওয়াল, ভিখিরি, রাজনৈতিক ফেস্টুন। তবু সেই চোখদুটি যেন অন্য জগতের।
হিরণ্যর মনে হল, আজ তার নিজের মতোই অরুণিমার পাদুটোও অবাধ্য হয়ে গিয়েছে। একজন বিখ্যাত চিকিৎসকের স্ত্রী হয়েও সে খেয়ালিপনায় কি না একা একা লোকাল বাসে উঠে পড়েছে। যদি হঠাৎ মুখোমুখি হয়ে যায়? যদি তিরস্কার করে অরুণিমা বলে ওঠে, ফেসবুকে তোমাকে ব্লক করেছি, তবু এতটুকু লজ্জা হয়নি তোমার? তখন কী উত্তর দেবে হিরণ্য?
চোখের সামনে ভেসে উঠল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বিকেল। মলিন আলো, ভেজা হাওয়া। ক্যানটিনের শেষ বেঞ্চে বসে অরুণিমা বলছিল, তুমি খুব কষ্ট পাবে জানি, আমিও পাচ্ছি। কিন্তু আগামী মাসে এক ডাক্তারের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে বাবা। আমার একদম ইচ্ছে নেই। কী করব বলো, বাবার অবাধ্য হব?
হিরণ্য তখনও গম্ভীর, একটুও কণ্ঠ কাঁপেনি। বলেছিল, না, একদমই না। এটাই তো স্বাভাবিক এখন। প্রেম তো আসলে বিয়ের আগে দু বছরের বিএড কোর্স মাত্র।
অরুণিমা চেয়ে ছিল, তুমি রাগ করছ?
উদাস হেসেছিল হিরণ্য, সে হিম্মতও আমার নেই। আমি শুধু ভাবছি, আমার পা দু’টো এতদূর হেঁটে এল কেন ভুল করে।
অরুণিমা বলেছিল, একটা কথা বলব? আমাদের ছবিগুলো জমিয়ে রেখো না, ডিলিট করে দিও। মেসেজগুলোও মুছে দিও। নইলে কষ্ট পাবে। ধরে নাও, আজ থেকে আমরা কেউ কারও পরিচিত নই। আমাদের আর দেখা না হওয়াই উচিত। পারলে ফেসবুকে আমাকে ব্লক করে দিও।
হিরণ্য প্রতিটি কথা পালন করেছিল। ছবি, মেসেজ সব মুছে ফেলেছিল। শুধু ফেসবুকের জানলাটা বন্ধ করতে পারেনি। পরে অরুণিমাই জোরে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।
বাসটা হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল। হিরণ্য তাকাল সামনে। অরুণিমা নেই। কবে যে নেমে গেছে সে বুঝতেই পারেনি। সিটে এখন অন্য এক মহিলা বসে আছে, জানলার বাইরে তাকিয়ে। হিরণ্যর বুকের ভেতর কেমন ঠাণ্ডা হল। যেন কেউ তার হাত থেকে একটা পুরনো বই টেনে নিয়ে গেল। 🍁 (চলবে)

 

 

 

🍂বিতা

 

গৌরশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

সে যে আমার অতীত

অনেক মৃত্যুর কথা শুনি
তেমন মৃত্যুর পরে
মাঝে মাঝে মনে হয়
কোনো একদিন
এমন মৃত্যুও এসে
আমাকে ছুঁয়ে দিতে পারে

তাকে দেখি কতভাবে
প্রত্যুষে গনগনে দিনের আলোয়
আবার কখনো
গভীর রাতে ঘুমে ও জাগরণে
কখনো শিয়রে দাঁড়ায় এসে
শব্দহীন আবছা আলোয়

সে জানে বর্তমান ও আমার অতীত

 

 

লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল -এর একটি কবিতা

বহুধা

শঙ্খ বাজার সাথে সাথে অন্ধকার পর্দাটা কেঁপে ওঠে কোমলতার ফ্রেমে– সঙ্গমরঙের রেখায় তিরতির বয়ে চলেছে নৈঃশব্দের পরমা গতি; সেই ঋজু শরীরের রক্তচন্দন গাছটি আকুতির পোট্রের্ট আঁকে– সাথে লেজঝোলা পাখির কথনে জেগে উঠছে উঠোনের প্রশ্বাস– হলুদ ফুলের জলদাগ নিয়ে মাটির জঙ্ঘায় নামে শীতশীত দিগন্ত

কোনো ছায়া নেই প্রাহরিক সীমানায়– নদীর আকার বুঝতে না বুঝতেই বনবাদাড় বেরিয়ে আসে বহুধায়– আজন্ম রাতের শেষে আমিও অনন্তকাল– উচ্ছ্বাসে পল্লবিত গোত্রহীন আমাদের দারিদ্র্য অথবা অহংকার

বুকের ভেতর কাঁপতে থাকে সূর্যোদয়

 

 

ফাল্গুনী চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

প্রেম ফাইল ১৮

রাস্তা বদলে যায় নি ভুলের উষ্ণতায় জ্বলছিল কিছুটা সময় চলো সমুদ্রের ধারে ঘুরে আসি যেখানে সুর্য টমেটো রংয়ে ডুবছে স্বেত বস্ত্র জোড়াই তুলে নিই অসংখ্য আগাছায় বন উৎসবের আয়োজন অযত্নে পড়ে থাকা পাপড়ির শেষ যেখান থেকে বিপ্লব হাতছানি দেয় প্রেমের কান্ডারী হবো তাই শূন্য থেকে শোরগোলের দিকে জল হয়ে আসা নিসর্গের রং এ পড়ে থাকা বসন্ত মুছছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক রাশ নীল ছায়া জলের বাইরে ডুবুরি হয়ে আসার কথা কেউ জানে না জানে না চোখের ভিতর অস্থিরতার হাট আর মগ্নতায় ছেপে যাওয়া মাইল

 

 

বিশ্বজিৎ মণ্ডল -এর দু’টি কবিতা 

নদীর পদ্য

নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে অস্ফূট শুনেছি- ঘৌড়দৌড়ের শব্দ
পাশ দিয়ে বয়ে চলা মন্দাকিনীতে কারা যেন লিখে গেছে
স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস

ইদানিং তোমাকে ভালো লাগে না নদীপাড়…
এত জলকন্যার আর্তনাদ, কেঁপে ওঠে বিগত
শতাব্দীর দুর্বল পাঁজর

আমিও যোদ্ধা ছিলাম, ভাবনাতেই সাজিয়েছি বাসভূম
পেঁচার কর্কশ ডাকে, আমিও একদিন জীবনানন্দ…

জলসিড়ি নদী পেরোব বলে পা রাখতেই
বুকের মধ্যে জমে ওঠে,কীর্তনখোলা কিংবা নাফনদী…
আর জলচারী মানুষের চূড়ান্ত হাহাকার

এইবার নদী ছেড়ে উঠে আসি মনসামঙ্গলে
গাঙুড়ের শান্ত জলে মান্দাস ভাসিয়ে আমি এখন
লখিন্দর তুমি আমার বদ্ধ বেহুলা

 

আজ, কাল কিংবা পরশু

কনেদেখা আলোয় এসে দাঁড়িয়েছি উপান্তে
পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মশগুল জাহ্নবী

এই বয়সে আলো খুঁজতেই আঁখিপল্লব বেয়ে নেমে আসে
ভুল পর্যটনের কবিতা
বলতে পারিনি, কৈশোরে লেখা গোপন চিঠির কথা
যখন বেলা চলে গেল, বুঝে গেছি গড়িয়ে গেছে
আমাদের পাখিবেলার দিন

এখন অলিন্দের ওপাশে জমে আছে আমাদের
নিমগ্ন সংলাপ
ফিশফাস ডাকে তোমাকে আঁকা সংগোপন
তখন কতবার পথ হাতড়ে খুঁজেছি, পিয়ন কাকার পথ
‘আজও চিঠি নেই’— এইসব নির্মমতা এঁকে চলে গেছেন
পরিচিত সেই মুখ

আজ শব্দ খুঁজি না,পথ হাতড়াইনা সোনাঝুরি তলায়
কেবল উপত্যকার পাশে হরিনরোদ মেখে
ঘুমিয়ে পড়ি, আমাদের প্রাক্তন বিকেলে

এখন ফেরার পালা…
এই বুঝি কোনো গ্যালোপিনে তুলে দেব আমার সর্বস্ব

তারপর প্রণম্য চুল্লিতে লিখে দেব, আমাদের ভুল শতনাম

 

 

মমতা রায় চৌধুরী -এর একটি কবিতা 

ভালবাসা তুমি কোথায়?

ভালবাসা তুমি আজ বড্ড ছদ্মবেশী
খুঁজে মরি পাহাড় থেকে সমুদ্রের তলদেশে।
ভালবাসা তুমি আজ বড্ড স্বার্থপর
হারিয়ে গেছো ধর্ম, রাজনীতি, দলাদলি
বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে।

তবুও খুঁজছি আশায় বুক বেঁধে
জানি একদিন আসবে ফিরে
হয়ত বা কোনও ক্লান্ত দুপুরে বটের ছায়ার নিচে
নয়ত পাড়া গাঁয়ের এদোপুকুরের কলমি শাকের
ঘ্রাণে।

ভালবাসা জানি তুমি আসবে ফিরে
ঝরঝর মুখর কোনও কদম বাদল দিনে।
হয়ত তোমায় পাব শিউলি ঝরা শরৎ সকালে বা হেমন্তের কোন বিষন্ন বিকেলে
বসন্তের ঘেরাটোপে নবারুণ হয়ে।
ভালবাসা তুমি যেখানেই থাকো
আসবে ফিরে আবার আমার গোপন তটে।

 

 

সঞ্জয় আচার্য -এর একটি কবিতা

জুয়াড়ি

ক্ষীর সমুদ্রে ভেসে ভেসে স্নান।
কপর্দক শূন্য হলে এবেলা ওবেলা সামবেদগান।

শান্ত হয় পঞ্চমে স্পন্দিত চিৎকার,
হারিয়ে আঁধার– হৃদয় মচকা ফুলের পাপড়ি,
দিঘিজলে দিনগুলি কেটেছিল যার।

সে ধরেছে বাজি মগ্ন পৃথিবী
মাতাল মুকুটে তার কাঙ্ক্ষিত আলো
হেলাফেলা,
সম্বল আর কিছু নেই, দুমুঠো আকাশ আছে
কিঞ্চিৎ রোদ ছায়া, পঞ্চবি ডালও
এটুকুই মোটে,
পেটপুরে কী যে তার তৃপ্তি নামে আর ওঠে।

কপর্দক শূন্য হয়ে বাড়ি ফেরার পথ
কার মধ্যরাত,কার দুঃখের ঢেউ?
রুপোলি খাতের জলে,
জুয়াড়ি ওপরে তোলে ডোবায় অতলে।

কী আনন্দ! কী আনন্দ! ওই
ক্ষীর সমুদ্র ভেসে যায় মৃত্তিকার কোলে।

 

 

মিঠুন চক্রবর্তী -এর তিনটি কবিতা

ভাল ও বাসা

দু’টি শব্দ। হাত ধরে পাশাপাশি
হাঁটতে হাঁটতে
আকাশে ছড়িয়ে দিচ্ছিল রাঙা আবির

তারপর একদিন
ধোঁয়াশার ভেতরে হাত ছেড়ে গেল
দু’জন দুদিকে গিয়ে
একজন ভাল থাকল, অন্যজন বাসা পেল

যে বাসা পেল রোজ ভোরে উড়ে এসে
সারাদিন
হারানো পথে খুঁজে বেড়ায় অন্য শব্দটিকে

ভাল আছে যে, সে ফেরে কী করে !
বাসা জানে ভালবাসা কষ্টের ছুরি মারে

 

 

গাঁট

দু’টো সুতো
দু’জনকে আষ্টেপৃষ্ঠে সমান ভাবে জড়িয়ে ধরলে
গাঁট হয়,
বোঝেনি অবুঝ সুতো
তাই একা একা পাক খেয়ে অন্য সুতোকে
জড়িয়েছে হাজারবার

তারপর দিনের শেষে পশ্চিমে যখন আলো ডুবে গেছে
অনেক দূরের পূবে একই সূর্য ছড়িয়েছে নতুন সকাল

অন্য সুতো সহজ টানে মুক্ত হয়ে বলে ‘ফস্কা গেরো’
রাতের অন্ধকারে
দোমড়ানো মোচড়ানো বুকে দাঁড়িয়ে থাকে
অন্য সুতোর শূন্যতা জড়িয়ে একাকী সুতোটি

 

 

ডাক

এক কোকিলের ডাকে বন্ধু বসন্ত আসে ফিরে
শিমুল পলাশ পুষ্প ফোটে শূন্য গাছের অন্তর চিরে
তুমি বন্ধু কেমন সুজন, থাকো যোজন দূরে
বসন্ত কী ফুরিয়ে যাবে মনস্তাপে পুড়ে…

নদীর ডাকে নৌকা ভাসে, বানের ডাকে ঘর
আমার ডাকে কই আসো বন্ধু , আমি যেন পর!

কলমি ঢাকে নিঃসঙ্গ ওই ঝিলের শূন্য দুপুর,
রাতের ফাঁকা মাঠ ভরিয়ে জ্যোৎস্না বাজায় নূপুর
তুমি বন্ধু কেমন সুজন, থাকো যোজন দূরে
বসন্ত কী ফুরিয়ে যাবে মনস্তাপে পুড়ে…

চাঁদের ডাকে জোয়ার আসে, প্রাণের ডাকে স্বজন
আমার ডাকে কই আসো বন্ধু, আমি যেন নই আপন!

 

 

 

🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস

 

সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।

কিশাণগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়

২১.

কটা ফোল্ডিং ছুরি, সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার, পার্স। সব কিছু টি টেবলের উপর সাজানোর পর পঙ্কজ একবার অভ্যাস মতো শুতে যাবার আগে ক্যামেরায় তোলা ছবি গুলি দেখবে তারপর মোবাইলের ইন্সটাগ্রাম, ফেসবুক দেখে কমেন্ট টমেন্ট করে ঘুমিয়ে পড়বে। ছবিগুলো দেখতে দেখতে ম্যাডাম কর্মার কোলে থাকা একটা বেড়ালের ছবিতে চোখ আটকে যায়। ছবিটা বড় করে। পঙ্কজের নিজের চোখে বিস্ময়। সে অন্য আর যে দু’টি বেড়ালের ছবি তুলেছিল, মানে যেগুলো ম্যাডাম কর্মার পায়ে পায়ে ঘুরছিল,‌ সে দুটির ছবিও বড় করে দেখে। হ্যাঁ এক। এবার কুকুরটার ছবি দেখে ভাবনা মিলিয়ে নিলে নিজের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সত্যি খুব খুঁটিয়ে না দেখলে চোখে পড়ার কথা নয়। মাত্র তিনটে বেড়াল আর ওই একটা বড় কুকুরের ছবি তুলেছিল পঙ্কজ। আরও অনেক বেড়াল আর ছোটো কুকুর আছে। বেয়ারা প্রেমা দর্জি বলেছে প্রায় আটত্রিশটা পোষ্য আছে মালকিনের। সব কটেজে কটেজে ঘুরে বেড়ায়। বোর্ডাররা অনেকে কোলে করে তাদের নিজেদের ঘরে নিয়ে যায়। বিস্কুট, আইস্ক্রিম খাওয়ায়। পঙ্কজ দেখল, তার তোলা ছবির সব কটি প্রাণির একটি করে চোখের মণি নেই, সেখানে পাথরের মতো কিছু একটা বসানো। হ্যাঁ হ্যাঁ সফট টয়েসগুলোতে কুকুর বা বাঘের চোখ দেখেছে ফেলুদা, এমন জ্যান্ত। হঠাৎ মনে হলো ক্যামেরা নেই তো! ওই তো একটা বেড়াল শুয়ে আছে পাপোষের উপরে। মুহূর্তে পঙ্কজ উঠে দাঁড়ায়।
আরে হ্যাঁ, এই বেড়ালটার চোখও পাথরের। কিন্তু কিছুই করতে পারল না পঙ্কজ। তার ভাবনা যদি সত্যি হয়, তবে তো তাকে মনিটর করছে কেউ না কেউ ওই বেড়ালের চোখ দিয়ে। পঙ্কজ বেড়ালের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বেড়ালটিকে রুমের বাইরে বসার সোফার উপর নামিয়ে দেয়। সে দুবার মিঁউ ডেকে ওখানে ঘুমতে থাকে।
এবার সে মোবাইলে বোঁদের পাঠানো ছবিগুলো ভাল করে দেখতে থাকে। হেলমেটধারী কেমন করে বাচ্চা ছেলেটার মাথা খাচ্ছে, দেখে। রাগ হয়। কিন্তু হঠাৎ যেন সে কিছু একটা আবিস্কার করে। ভিডিওটা রিওয়াইন্ড করে। আরে লোকটা নিজের পরিবেশ না বুঝতে দেবার জন্য ক্যামেরার পেছনের তিন দিক সাদা কাপড় দিয়ে মুড়ে দিয়েছে বুঝতে পারে। কিন্তু হঠাৎ একটা দৃশ্যে যেন পেছনটা আলগা। সেখানে কিছু একটা ঝুলছে। কী ঝুলছে! একটু বড় করে পঙ্কজ দেখল একটা মুখোশ ঝুলছে যেন। আর হ্যাঁ, এটা তো কোনও ঘর নয়, একটা গাড়ি। লোকটা তো বেশ জাঁদরেল ক্রিমিন্যাল! অনেক ভাবনা চিন্তা করেছে! পঙ্কজের মনে হল, সে যেন এই মুখোশটা চেনে। এরকম মুখোশ সিকিমের হয়। এগুলো শুভ চিহ্ণ ওদের। তাহলে লোকটা এই অঞ্চলের হবে। মানে নর্থ ইস্টের। কিন্তু কেন তার মনে হচ্ছে এই মুখোশ আগেও দেখেছে এরকম গাড়ির রিয়ার উইণ্ডো থেকে ঝুলতে। তবে কি ওর গ্যারেজে এসেছিল কোনো গাড়ি! ভাবতে ভাবতে পঙ্কজ মোবাইলের গ্যালারি খুলে ফেলল। ওর অভ্যাস গাড়ি সাড়াতে এলে গাড়ির ছবি, গাড়ির নম্বর আর পার্টির নাম আর মোবাইল নম্বর নিয়ে নেয়া। মানে একটা গাড়ির ছবির সাথে পরপর ওগুলো যাবে।
লাফ দিয়ে ওঠা মানে ইউরেকাই তো। পঙ্কজ লাফিয়ে উঠল। তার রাতের ঘুম চটকে গেছে। পেয়ে গেছে, একদম মিলিয়ে সেই ছবি। গাড়ির নম্বর থেকেও মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়। মোটোর ভেহকলস এর সাইট আছে, সেখানে ঢুঁড়তে হবে। তার চে মোবাইল নম্বরের উপরে ভরসা রাখল। রাত এগারোটা সাধারণ মানুষের জন্য জেগে থাকার পক্ষে যথেষ্ট হলেও ড্রাইভার বিবেক প্রধান-এর কাছে কিছুই না। সে থাপা’স ইঞ্জিনিয়ারিং-এর নম্বর সেফ করেই রাখে। সেখান থেকে ফোন আসায় চমকে যায়। সাধারণত গাড়ি খারাপ যাদের হয় তারাই ফোন করে। এ দেখছি উল্টো! এত রাতে! সংসয় নিয়ে ফোন ধরে বিবেক প্রধান।
‘নমস্তে দাজু। হো ভনে মলাই। আজ রাতলাই ফোন গরাঁই?’
‘বিবেক, ম থাপা ইঞ্জিনিয়ারিংকা পঙ্কজ থাপা হুঁ।’
‘হো, দাদা ভন্নুহোস।’
‘ঠিক ছ, তপাই মহিনামা হামো গেরাজমা আয়নুভয়ো? কারমা সমস্যা কে থিয়ো? স্যর‍ স্যর‍ হুঁদা মুশিকল সুরু গর্ণ গাহো থিয়ো?’
‘হো হজুরামা।’
পঙ্কজ থাপা এখন একেবারে ড্রাইভারের প্রাণের ভেতর ঢুকে পড়তে চায়। সে আবার গাড়ির ভালমন্দ শুধোয়। ‘অহিলে কার ছ? কে উও কুনৌ সমস্যা ছ্যায়না?’
গদগদ স্বর বিবেকের। সে বলল, ‘উও সহি ছ, দাদা।’
এবার কাজের কথায় আসে পঙ্কজ থাপা। ‘আচ্ছা, বিবেক , ডব্লিউ বি জেড ০০৫৭৫৭৫৭ গাড়িটা কার? মানে আপনি কার গাড়ি চালান?’
‘কেন, আপনি তো জানেন, একবার আপনার সাথে কথা বলিয়ে দিয়েছিলাম না! পার্টসের দাম নিয়ে কথা বললেন।’
পঙ্কজ থাপার মনে পড়ছিল না। তবুও বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। ওকে একবার চাইছিলাম। ওর গাড়িটা খুবই ভালো গাড়ি। কোন ডিলারের কাছ থেকে নিয়েছেন, যদি জানা যেত। ভালো হত। দরকারে ওঁকে নিয়েই কিনতে যাব। যদি উনি একটু রাজি হন। জানেন তো চেনা-শোনা হলে ভাল। তা উনি কোথায় থাকেন?’
‘উনি তো অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ান। বিদেশেও যান। মাঝে মাঝে আমি তো তাকে বাগডোগরায় ছেড়ে দিয়ে আসি। বেশিটা সময় থাকেন দার্জিলিং-এ। কালিম্পং-এও থাকেন। কোথায় কখন থাকেন, বলা মুশকিল।’
পঙ্কজ থাপা যা চাইছিল, তাই পেয়ে গেছে। সে ভেতরে ভেতরে খুব উত্তেজিত। কিন্তু আরও একটু চাই তার। গলায় অধীরতা না নিয়ে পঙ্কজ জিজ্ঞাসা করে, ‘বিবেক, উনকো ফোন নম্বর দিন সকছ?’
ফোন নম্বর পেয়ে পঙ্কজ থাপা ইতস্তত করেও অ্যাসিস্ট্যান্ট এস পি সাহেবকে ফোন করে দেয়। না তিনি রাগেননি। বরং পঙ্কজের ইনিশিয়েটিভ নেয়া দেখে ভালো লেগেছে তাঁর। তিনি নিজেও সন্ধ্যাবেলার পঙ্কজের কথায় বিচলিত ছিলেন। নিজের ছেলেটা যে হেরোইনের নেশা করে তা বুঝতে পারছেন। আগের মতো পড়াশুনোয় যেন উৎসাহ নেই। সকাল বেলায় নারকোটিকের বড়বাবুর সাথে মিটিং রেখেছেন। আর বড় কথা হল, ঘন্টা খানেক আগে শিলিগুড়ি থেকে মন্ত্রী মশায়ের ফোন এসেছে এস পি সাহেবের কাছে। তিনি নাকি বলেছেন, স্কুলের ছাত্রদের ভেতর যারা নেশার সামগ্রী ছড়াচ্ছে, তাদের কাউকে যেন রেয়াত করা না হয়। অ্যাসিস্ট্যান্ট এস পি সাহেব কালিম্পং থানার বড়বাবুকে বলে দিলেন এই ফোন নম্বর ট্রাক করতে। আর সকাল ছটার মধ্যে যেন ফোর্স তৈরি রাখে। প্রথমে ভেবে ছিলেন ন’টা –দশ-টায় রেড করবেন ‘হেভেন হোকাস-পোকাস’। কিন্তু পঙ্কজ থাপার ফোন পেয়ে মত পাল্টালেন। যত তাড়াতাড়ি করা যায়, ভাল। পুলিশ অফিসারের ফোন ছেড়ে দিতে না দিতেই পঙ্কজের মোবাইলে বোঁদের কল এসে ঢুকেছে। সে উত্তেজিত। ‘বস, আর বেশি ভাবনা-চিন্তার দরকার নেই। যা করার করে ফেলেছি। ভোর ভোর রিসর্ট থেকে কেটে পড়ব। একদম ভোরে। সকলের ঘুম ভাঙার আগেই।’
পঙ্কজ থাপা ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘কেন, এই তো এলে বাবা, হেভেনে। এখনই সব আনন্দ নেওয়া হয়ে গেল! এই তো রিসর্ট বুক করার জন্য আমার মাথা খেয়ে ফেলছিলে দু’দিন আগেও। এর মধ্যে শখ শেষ! কাল সকালে যে আমরা ঘুরতে বেরোব বললাম, তার কী হল?’
বোঁদে ফিসফিস করে কথা বললেও, তার স্বর উত্তেজনায় ছমছম করছে। ‘আরে বস যে জন্য আসা তাই তো প্রথম চোটেই হয়ে গেছে। বেড়াল প্রথম রাতেই মারতে হয় শুনেছি। আমিও তাই অপেক্ষা করিনি। গঙ্গারাম আমার হেফাজতে।’
“ মানে!” 🍁 (চলবে)

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকারকার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকারঅঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী  সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্রসমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরেপড়া: গল্প’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন