সাশ্রয় নিউজ ★ মুর্শিদাবাদ : মুর্শিদাবাদে মাদক পাচার মামলায় প্রশাসনিক কড়াকড়ি আরও তীব্র হল। টানা দু’দিন ধরে চলা অভিযানের দ্বিতীয় দিনে হুমায়ুন কবীরের (Humayun Kabir) বেয়াই তথা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী শরিফুল শেখের (Shariful Sheikh) প্রায় ৮ কোটি টাকার সম্পত্তি ‘সিল’ করল জেলা পুলিশ। এর ফলে সোমবার থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট প্রায় ১৮ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে জেলায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। পুলিশ আগেই জানিয়েছিল, আদালতের নির্দেশ মেনে এই সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের অভিযান এক দিনে শেষ হবে না। সেই অনুযায়ী সোমবার অভিযান শুরু হয় এবং মঙ্গলবার দ্বিতীয় দফায় আরও বিস্তৃত পরিসরে তল্লাশি ও সিল করার কাজ চলে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই মুর্শিদাবাদের লালগোলা (Lalgola) এবং সংলগ্ন এলাকায় শরিফুল শেখের মালিকানাধীন একাধিক বাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পুলিশ পৌঁছে যায়। পুলিশ সূত্রে খবর, শুধু মঙ্গলবারই ছ’টি বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে সিল করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৮ কোটি টাকা।
শুধু আবাসন নয়, অভিযানের আওতায় এসেছে শরিফুল শেখের ইটভাটা, হোটেল, দোকান ও অন্যান্য বাণিজ্যিক সম্পত্তিও। সোমবার প্রথম দিনে তাঁর বাসভবন-সহ বিভিন্ন জায়গায় হানা দিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। দু’দিন মিলিয়ে মোট অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। জেলা পুলিশের এক কর্তা জানান, ‘আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আমরা প্রতিটি সম্পত্তির নথি খতিয়ে দেখে আইনি প্রক্রিয়ায় সিল করেছি। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং আইনসম্মত।’ পুলিশ সূত্রে আরও জানা যায়, শরিফুল শেখের বিরুদ্ধে আন্তঃরাজ্য মাদক পাচারচক্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকার একাধিক তথ্যপ্রমাণ হাতে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা এই পাচারচক্রের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে শরিফুলের সম্পত্তির যোগসূত্র মিলেছে। সেই কারণেই মাদক বিরোধী আইনের (NDPS Act) একাধিক ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, বিপুল অঙ্কের এই সম্পত্তির বড় অংশই মাদক কারবার থেকে আসা কালো টাকায় তৈরি।
জেলা পুলিশের একাধিক সূত্রের মতে, এই আর্থিক তদন্ত শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজনে আরও আর্থিক নেটওয়ার্ক, বেনামি সম্পত্তি এবং সহযোগীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। পুলিশের বক্তব্য, ‘মাদক পাচার শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ। তাই আমরা মূল আর্থিক শিরদাঁড়ায় আঘাত করতে চাই।’ উল্লেখ্য যে, এই অভিযানের রাজনৈতিক দিকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শরিফুল শেখ হলেন ভরতপুরের বিধায়ক এবং জনতা উন্নয়ন পার্টির (Janta Unnayan Party) প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবীরের (Humayun Kabir) কন্যার শ্বশুর। ফলে গোটা ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। হুমায়ুন কবীর প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, এই অভিযান রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ। তাঁর দাবি, ‘আমার পরিবারকে টার্গেট করা হচ্ছে। আইনকে সম্মান করি, কিন্তু এই পদক্ষেপ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রয়োজনে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হব।’
কিন্তু, প্রশাসন এই অভিযোগ মানতে নারাজ। পুলিশের একজন শীর্ষ আধিকারিক বলেন, ‘আইনের চোখে সবাই সমান। অভিযুক্ত ব্যক্তি কার আত্মীয়, তা বিবেচ্য নয়। আমাদের কাছে যে তথ্যপ্রমাণ রয়েছে, তার ভিত্তিতেই আদালতের অনুমতি নিয়ে এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।’ প্রশাসনের দাবি, রাজনৈতিক চাপ বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তদন্ত চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। অন্যদিকে, স্থানীয় স্তরে এই অভিযানের প্রভাব স্পষ্ট। লালগোলা ও সংলগ্ন এলাকায় মঙ্গলবার দিনভর পুলিশের উপস্থিতি নজরে পড়ে। অনেক জায়গায় কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে। কেউ কেউ প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলেছেন। তবে সাধারণ মানুষের একাংশের মত, মাদক পাচারের মতো অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মাদক মামলায় শুধু গ্রেফতার নয়, আর্থিক শিকড়ে আঘাত করার প্রবণতা বেড়েছে। সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের মতো পদক্ষেপ অপরাধচক্রকে দুর্বল করতে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। মুর্শিদাবাদের এই ঘটনা তারই এক উদাহরণ।উল্লেখ্য, হুমায়ুন কবীরের (Humayun Kabir) বেয়াই শরিফুল শেখের (Shariful Sheikh) বিরুদ্ধে এই অভিযান শুধু একটি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রাজ্যজুড়ে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর মনোভাবের স্পষ্ট বার্তা বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। তদন্ত এগোলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিচ্ছে পুলিশ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Naushad Siddiqui, Humayun Kabir | হুমায়ুনের জোট দাবিতে জল ঢাললেন নওশাদ, আলিমুদ্দিনে বৈঠকের পর আইএসএফের অবস্থান স্পষ্ট




