তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ডিজিটাল যুগে সম্পর্কের সংজ্ঞাও যে বদলাবে, তা আর বলার কী। গত কয়েক বছরে ‘হট-টেক ডেটিং’ বা প্রযুক্তি-নির্ভর ডেটিংয়ের প্রবণতা দ্রুত বেড়েছে। একদা যা শুধুই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যবয়সী, পেশাজীবী এমনকী অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যেও। স্মার্টফোন, অ্যাপ এবং অ্যালগরিদমের দৌলতে সম্পর্ক খোঁজার প্রক্রিয়া এখন আগের তুলনায় অনেক সহজ, দ্রুত এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তবে এই প্রবণতা শুধু আধুনিকতার প্রতীক নয়; এটি সমাজের গভীর পরিবর্তন, একাকিত্বের নতুন ভাষা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন সমাজতাত্ত্বিকরা। ‘হট-টেক ডেটিং’ বলতে মূলত সেই সব অনলাইন বা অ্যাপ-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মকে বোঝানো হয়, যেখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দ, অভ্যাস, জীবনধারা এবং মানসিক চাহিদা অনুযায়ী সঙ্গী খুঁজে নিতে পারেন। জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপ যেমন টিন্ডার (Tinder), বাম্বল (Bumble), হিঞ্জ (Hinge) বা ভারতে ব্যবহৃত আইকুইটেড (Aisle) -এর মতো প্ল্যাটফর্ম এখন শুধু তরুণদের নয়, কর্পোরেট কর্মী, একাকী অভিভাবক, এমনকী বিচ্ছেদ-পরবর্তী জীবনে নতুন করে শুরু করতে চাওয়া মানুষদেরও আকর্ষণ করছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এর অন্যতম বড় কারণ জীবনযাত্রার পরিবর্তন। শহুরে জীবনে কাজের চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সামাজিক পরিসরের সংকোচন মানুষের স্বাভাবিক ভাবে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে বন্ধু, আত্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচয় হতো, এখন সেখানে প্রযুক্তিই হয়ে উঠেছে প্রথম সেতু। কলকাতার সমাজবিজ্ঞানী ড. অনির্বাণ সেন (Dr. Anirban Sen) -এর মতে, ‘ডেটিং অ্যাপ আসলে আধুনিক মানুষের একাকিত্বের সঙ্গে লড়াই করার একটি উপায়। এখানে মানুষ নিজের শর্তে, নিজের সময় অনুযায়ী সম্পর্কের খোঁজ করতে পারে।’ এই প্রবণতার আর একটি বড় দিক হল মধ্যবয়সীদের অংশগ্রহণ। আগে ৪০ বা ৫০ পেরলেই অনেকেই মনে করতেন নতুন সম্পর্ক মানেই সামাজিক প্রশ্নচিহ্ন। কিন্তু এখন সেই ধারণা ভাঙছে। বিবাহবিচ্ছেদ, সঙ্গীর মৃত্যু বা দীর্ঘদিন একা থাকার পরে বহু মানুষ আবার নতুন করে সঙ্গী খুঁজতে চাইছেন। প্রযুক্তি সেই জায়গায় এক-ধরনের নিরাপদ পরিসর তৈরি করে দিচ্ছে, যেখানে প্রথম পরিচয়েই সামাজিক চাপ তুলনামূলক কম।
কিন্তু, ‘হট-টেক ডেটিং’-এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সম্পর্কের মনস্তত্ত্বও বদলে দিচ্ছে। আগে সম্পর্ক গড়ে উঠত ধীরে, সময় নিয়ে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম আলাপের পরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এগোনো হবে কি না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে যেমন সময় বাঁচে, তেমনই ধৈর্যের অভাবও তৈরি হচ্ছে। মনোবিদ ড. মধুরিমা চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘ডেটিং অ্যাপ মানুষকে বিকল্পের ভিড়ে ফেলে দেয়। এতে সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা কিছুটা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।’ তবে এর ইতিবাচক দিকও কম নয়। অনেকেই মনে করেন, প্রযুক্তি-নির্ভর ডেটিং মানুষকে নিজের চাহিদা ও মানসিকতার ব্যাপারে আরও সচেতন করছে। অ্যাপে প্রোফাইল তৈরি করার সময় মানুষ নিজের পছন্দ-অপছন্দ, লক্ষ্য এবং সীমারেখা স্পষ্ট করে। এর ফলে অযথা সম্পর্কের জটিলতা কমে এবং সমমনা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা বাড়ে।
ভারতের মতো সমাজে, যেখানে এখনও অনেক ক্ষেত্রে বিয়ে ও সম্পর্ক পরিবারকেন্দ্রিক, সেখানে ‘হট-টেক ডেটিং’ একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি এখন মধ্যবয়সীরাও নিজেদের ব্যক্তিগত সুখকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন। সামাজিক সমালোচনার ভয় অনেকটাই কমেছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলিতে এই মানসিক পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। তবে নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভুয়ো প্রোফাইল, প্রতারণা বা মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও অস্বীকার করা যায় না। তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করার সময় ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে এবং আবেগের চেয়ে বাস্তববুদ্ধিকে প্রাধান্য দিতে।উল্লেখ্য যে, ‘হট-টেক ডেটিং’ শুধু ট্রেন্ড নয়, তা সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভাষা বদলে যাওয়ার একটি বাস্তব চিত্র। প্রযুক্তি এখানে মাধ্যম মাত্র, সম্পর্কের গভীরতা, স্থায়িত্ব এবং মানবিক স্পর্শ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে মানুষটির উপরেই। তবু অস্বীকার করার উপায় নেই, এই নতুন ধারাই আগামী দিনে প্রেম, সম্পর্ক এবং সামাজিক কাঠামোর উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে চলেছে।
ছবি : প্রতিনিধিত্বমূলক ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Priyanka Chopra brunch recipe | দেরিতে ঘুম ভাঙলে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার পছন্দ ‘ব্রাঞ্চ’! ঘরোয়া ওমলেট আর বাটার টোস্টে কী ভাবে রাখেন ফিটনেস ও স্বাদের ভারসাম্য




