প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লি : ভারতের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে বহুমুখী ও সুসংহত উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকসংস্কৃতি, শিল্পকলা ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানভাণ্ডার রক্ষা ও প্রসারে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। লোকসভায় লিখিত উত্তরে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী শ্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের ৩৬৮৬টি কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (Archaeological Survey of India বা ASI)-এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে এবং সবক’টি স্মৃতিস্তম্ভই ‘ভালো সংরক্ষণ অবস্থায়’ রয়েছে। এএসআই-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্মৃতিস্তম্ভগুলির সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ প্রতি বছর অনুমোদিত বার্ষিক সংরক্ষণ পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। প্রতিটি স্মৃতিস্তম্ভের প্রয়োজন, কাঠামোগত অবস্থা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিচার করেই সংরক্ষণমূলক কাজ গ্রহণ করা হয়, যাতে প্রাচীন ঐতিহ্যের মৌলিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ থাকে।
শুধু স্থাপত্য নয়, প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন ও সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ থেকে প্রাপ্ত নিদর্শন, শিল্পবস্তু ও প্রাচীন সামগ্রী সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এএসআই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ৫২টি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট মিউজিয়ামের মাধ্যমে এই নিদর্শনগুলি জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। কয়েন, মূর্তি, অলংকার, পাণ্ডুলিপি ও অন্যান্য প্রাচীন সামগ্রী নিয়মিতভাবে মিউজিয়াম অ্যাকসেশন রেজিস্টার এবং ডিজিটাল ডাটাবেসে নথিভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্য সুরক্ষিত থাকে। দৃশ্যমান ঐতিহ্যের পাশাপাশি অদৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্র। ২০০৭ সালে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ ও প্রত্নসম্পদ মিশন (National Mission on Monuments and Antiquities বা NMMA) গঠন করা হয়। এই মিশনের লক্ষ্য হল দেশজুড়ে নির্মিত ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক স্থান এবং প্রত্নসম্পদের একটি জাতীয় রেজিস্টার প্রস্তুত করা। ইতিমধ্যেই NMMA দেশের ১১,৪০৬টি নির্মিত ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক স্থান এবং ১২,৪৭,৬৬৮টি প্রত্নসম্পদের তথ্য নথিভুক্ত ও প্রকাশ করেছে, যা NMMA -এর ওয়েবসাইটে সর্বসাধারণের জন্য উপলব্ধ।
লোকশিল্প, লোকসংস্কৃতি ও উপজাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকার সাতটি আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (Zonal Cultural Centres ) গড়ে তুলেছে। পাটিয়ালা (Patiala), নাগপুর (Nagpur), উদয়পুর (Udaipur), প্রয়াগরাজ (Prayagraj), কলকাতা (Kolkata), ডিমাপুর (Dimapur) এবং তাঞ্জাভুর (Thanjavur)-এ অবস্থিত এই কেন্দ্রগুলি সারা বছর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কর্মসূচির আয়োজন করে। এসব অনুষ্ঠানে লোক ও উপজাতীয় শিল্পীদের জাতীয় স্তরে নিজেদের প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়। এই শিল্পীদের সম্মান, যাতায়াত ভাতা, স্থানীয় পরিবহণ, থাকা-খাওয়ার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করা হয়, যাতে তাঁদের জীবিকা নির্বাহের পথ সুগম হয়। কেন্দ্রের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন লোকসংস্কৃতি সংরক্ষিত হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে শিল্পীদের আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যাচ্ছে।
ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উদযাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হল ‘রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি মহোৎসব’ (Rashtriya Sanskriti Mahotsav বা RSM)। সংস্কৃতি মন্ত্রক, জেডসিসিগুলির মাধ্যমে এই মহোৎসব আয়োজন করে থাকে। ২০১৫ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ১৪টি জাতীয় স্তরের এবং ৪টি আঞ্চলিক স্তরের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে অংশ নিয়েছেন মোট ১২,৫৪৩ জন শিল্পী। এই মহোৎসবের মূল উদ্দেশ্য হল দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ঐক্যের বার্তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের ‘সফট পাওয়ার’কে তুলে ধরা।
ডিজিটাল সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রক। ‘জাতন’ (JATAN) নামে একটি বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও এএসআই মিউজিয়ামের সংগ্রহ ডিজিটাইজ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৮টি জাতীয় স্তরের মিউজিয়াম এবং ২টি এএসআই মিউজিয়ামের সংগ্রহ এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডিজিটাইজ করা হয়েছে। পুনে-স্থিত সি-ড্যাক (C-DAC, Pune)-এর প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় তৈরি ‘মিউজিয়ামস অফ ইন্ডিয়া’ (www.museumsofindia.gov.in, http://www.museumsofindia.gov.in পোর্টালে এই সংগ্রহগুলির ছবি ও বিবরণ দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু অতীত রক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই উদ্যোগগুলির মাধ্যমে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে, যা ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিশ্বদরবারে আরও শক্তিশালী করবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Samik Bhattacharya, Rajya Sabha debate on heritage | আদিনাথ মন্দির নিয়ে সংসদে তীব্র বিতর্ক: মালদার ঐতিহ্য রক্ষায় জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি বিজেপি সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যের




