সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লী : গত কয়েক বছরে দেশের আর্থিক অপরাধ দমনে কতটা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, তার একটি স্পষ্ট ছবি উঠে এল সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায়। গত ছয় বছরে সারা দেশে মোট ৫,১৫৮টি অর্থ তছরুপ ও দুর্নীতিজনিত মামলা দায়ের করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED বা Enforcement Directorate)। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলিতে সাজাপ্রাপ্তির হার প্রায় ৯৪ শতাংশেরও বেশি। মঙ্গলবার রাজ্যসভায় একটি প্রশ্নের লিখিত জবাবে এই তথ্য জানিয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক (Ministry of Finance)। অর্থ তছরুপ, মানি লন্ডারিং ও আর্থিক দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগের তদন্তে ইডি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সরাসরি অর্থ মন্ত্রকের অধীনস্থ এবং মূলত প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট বা পিএমএলএ (PMLA) -এর আওতায় তদন্ত চালায়। ইডি সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্নের উত্তরে সংসদে বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে নির্মলা সীতারমণ (Nirmala Sitharaman)-এর নেতৃত্বাধীন অর্থ মন্ত্রক।
মঙ্গলবার রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী (Pankaj Chaudhary) জানান, ২০২০ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত ইডি মোট ৫,১৫৮টি অর্থ তছরুপ সংক্রান্ত মামলার তদন্ত করেছে। এই মামলাগুলিতে তথ্য সংগ্রহ, সম্পত্তি চিহ্নিতকরণ, অভিযুক্তদের জেরা এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে সংস্থাটি। ওই সময়কালে মোট ৪৩টি মামলায় আদালতের রায়ে ১০৪ জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, পিএমএলএ-এর অধীনে দায়ের হওয়া এবং নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলির মধ্যে সাজাপ্রাপ্তির হার ৯৪.৮২ শতাংশ। অর্থাৎ, যেসব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে, তার প্রায় সবকটিতেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, এই পরিসংখ্যান ইডি-র তদন্ত প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা ও আইনি দৃঢ়তার প্রতিফলন।
ওয়াকিবহাল মহলের মত, তবে সংসদে এই তথ্য পেশ হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছে অর্থ মন্ত্রক। কোন রাজ্যে কতটি মামলা হয়েছে বা রাজ্যভিত্তিক মামলার সংখ্যা কত, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। অর্থ প্রতিমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, রাজ্যভিত্তিক মামলা সংক্রান্ত তথ্য ইডি আলাদা করে সংরক্ষণ বা রক্ষণাবেক্ষণ করে না। সেই কারণেই সংসদে ওই ধরনের বিশদ পরিসংখ্যান তুলে ধরা সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ইডি-র মামলা দায়েরের সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য ওঠানামা দেখা গিয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবর্ষে সারা দেশে মোট ৯৯৬টি মামলা দায়ের করেছিল ইডি। পরের বছর অর্থাৎ ২০২১-২২ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১,১১৬টিতে। এরপর ২০২২-২৩ সালে কিছুটা কমে ৯৫৩টি মামলা দায়ের হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে মামলা দায়েরের সংখ্যা আরও কমে ৬৯৮টিতে দাঁড়ায়। তবে ২০২৪-২৫ সালে আবার তা বেড়ে ৭৭৫টি হয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে এখনও পর্যন্ত ৬২০টি মামলা দায়ের করেছে ইডি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই মামলাগুলির মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই বড় অঙ্কের আর্থিক তছরুপ, বেআইনি লেনদেন, ভুয়ো সংস্থা এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ইডি শুধু তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বেআইনি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং আদালতে শক্তিশালী মামলা পেশ করার দিকেও জোর দেয়। সরকারের দাবি, সাজাপ্রাপ্তির উচ্চ হার প্রমাণ করে যে তদন্ত প্রক্রিয়ায় তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহে ইডি যথেষ্ট পেশাদারিত্ব দেখাচ্ছে। তবে বিরোধী শিবিরের একাংশের মতে, মামলা দায়েরের সংখ্যা ও সাজাপ্রাপ্তির হার নিয়ে সরকারের দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাজ্যভিত্তিক তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে। তা সত্ত্বেও কেন্দ্রের তরফে বারবার দাবি করা হচ্ছে, ইডি সম্পূর্ণ আইনের শাসনের মধ্যেই কাজ করে এবং কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়াই আর্থিক অপরাধ দমনে পদক্ষেপ করে। বস্তুত, রাজ্যসভায় পেশ করা এই তথ্য নতুন করে ইডি-র ভূমিকা ও কার্যকারিতা নিয়ে জাতীয় স্তরে আলোচনা বাড়িয়েছে। একদিকে যেখানে সরকার এই পরিসংখ্যানকে সাফল্যের নজির হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে সেখানে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্কও থেমে নেই। আগামী দিনে ইডি-র কাজকর্ম ও মামলার নিষ্পত্তি কোন পথে এগোয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Lok Sabha adjourned, Narendra Modi speech cancelled | বিরোধী হট্টগোলে ভেস্তে গেল মোদীর সংসদ ভাষণ, প্রশ্নের মুখে অধিবেশনের কার্যকারিতা



