সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : সংসদের নিম্নকক্ষে বুধবারের দিনটি শেষ পর্যন্ত অচলাবস্থারই ছবি তুলে ধরল। লোকসভার অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সুযোগই পেলেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। বিরোধীদের টানা বিক্ষোভ, প্ল্যাকার্ড ও স্লোগানের চাপে একের পর এক বার মুলতুবি করতে হল অধিবেশন। বিকেলে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদ প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা নির্ধারিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করতে বাধ্য হল সংসদ কর্তৃপক্ষ। দিনভর উত্তেজনার আবহে সংসদের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। প্রসঙ্গত, বুধবার সকাল থেকেই লোকসভায় পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হতেই বিরোধী সাংসদেরা একাধিক ইস্যুতে সরব হন। কখনও চিনের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, কখনও ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সমঝোতা, আবার কখনও গান্ধী পরিবারকে অপমান করার অভিযোগ, নানা প্রসঙ্গকে সামনে রেখে বিক্ষোভ চলতে থাকে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলিতে সরকার সংসদকে অন্ধকারে রেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এই দাবিকে কেন্দ্র করেই সভাকক্ষের মাঝখানে নেমে আসেন বিরোধী সাংসদেরা।
লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা (Om Birla) একাধিক বার সদস্যদের শান্ত থাকার আবেদন জানান। তিনি বলেন, ‘প্রশ্নোত্তর পর্ব সংসদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সকল সদস্যের উচিত নিয়ম মেনে প্রশ্ন করতে দেওয়া এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্মান করা।’ কিন্তু স্পিকারের অনুরোধেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। শেষ পর্যন্ত সকালেই অধিবেশন বেলা ১২টা পর্যন্ত মুলতুবি ঘোষণা করা হয়। দুপুরে ফের লোকসভার কার্যক্রম শুরু হলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) -এর নেতৃত্বে কংগ্রেস সাংসদেরা হাতে প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। ২০২০ সালে চিনের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার দাবি তোলা হয়। পাশাপাশি আমেরিকার সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক সমঝোতা নিয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়। বিরোধীদের এই দাবির মুখে সভাকক্ষ ফের উত্তাল হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় দুপুর ২টো পর্যন্ত অধিবেশন মুলতুবি করে দেওয়া হয়।
দুপুরের পর অধিবেশন শুরু হলে লোকসভার কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তেলুগু দেশম পার্টির (Telugu Desam Party) সাংসদ কৃষ্ণপ্রসাদ টেনেটি (Krishnaprasad Tenneti)। তিনি বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবেকে (Nishikant Dubey) বক্তব্য রাখার অনুমতি দেন। নিশিকান্ত তাঁর বক্তৃতায় গান্ধী পরিবারকে কটাক্ষ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। একাধিক বইয়ের নাম উল্লেখ করে তিনি গান্ধী পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা তথ্য তুলে ধরতে শুরু করেন। এর জেরে লোকসভায় ফের প্রবল হট্টগোল শুরু হয়।বিরোধী সাংসদেরা অভিযোগ করেন, সংসদের ভিতরে এই ধরনের মন্তব্য সম্পূর্ণ অনুচিত এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের শামিল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কৃষ্ণপ্রসাদ টেনেটি স্পষ্ট করে জানান, এই ধরনের মন্তব্যে তিনি অনুমতি দিতে পারবেন না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, স্পিকারের নির্দেশ অনুযায়ী সংসদে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অবমাননাকর মন্তব্য নিষিদ্ধ। তথাপি, উত্তেজনা প্রশমিত না হওয়ায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতুবি ঘোষণা করা হয়।
এই সময়েই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়, বিকেল ৫টার পর অধিবেশন শুরু হলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বক্তব্য রাখতে পারেন। সরকারি শিবিরে প্রস্তুতি ছিল, বিরোধীরাও তৈরি ছিলেন বলে সংসদ সূত্রের খবর। কিন্তু বিকেল ৫টার পর অধিবেশন শুরু হতেই আবার বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। তখন লোকসভার কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সাংসদ সন্ধ্যা রাই (Sandhya Rai)। তিনি প্রথমে পিপি চৌধুরীকে (P. P. Chaudhary) বক্তব্য রাখার অনুমতি দিলেও বিরোধীদের স্লোগান ও হট্টগোলে সভা প্রায় অচল হয়ে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্পিকার পক্ষ থেকে জানানো হয়, বুধবারের মতো লোকসভার অধিবেশন সম্পূর্ণ মুলতুবি করা হচ্ছে। এর ফলে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাতিল হয়ে যায়। সংসদের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল নয়, তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য না হওয়ায় রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
অধিবেশন মুলতুবির ঘোষণার পর বিরোধী শিবিরে কটাক্ষের সুর শোনা যায়। কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী (Priyanka Gandhi) সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ভয় পেয়ে গিয়েছেন।’ তাঁর দাবি, সরকার সংসদে বিতর্ক এড়াতে চাইছে বলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যদিও বিজেপি নেতৃত্বের তরফে পাল্টা অভিযোগ, বিরোধীরা পরিকল্পিত ভাবে সংসদের কাজকর্ম ব্যাহত করছে। রাজনৈতিক সমালোচকদের মতে, লোকসভায় এই অচলাবস্থা আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে সরকার নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে বিরোধীরা সংসদকে চাপ তৈরির মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে সাধারণ মানুষের নজরে সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লোকসভায় কবে বক্তব্য রাখবেন, তা এখনও নির্দিষ্ট নয়। তবে বুধবারের ঘটনার পর সংসদের পরিবেশ যে আরও উত্তপ্ত হতে পারে, সেই আশঙ্কা রাজনৈতিক মহলে প্রবল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Offbeat Honeymoon Destination, Budget Honeymoon from Kolkata | ভিড় এড়িয়ে ভালোবাসার ছুটি: কম বাজেটে নিরিবিলি হানিমুনের সেরা অফবিট গন্তব্য খুঁজে নিন এখানেই


