Mamata Banerjee Supreme Court, SIR case politics | এসআইআর মামলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুপ্রিম কোর্ট সওয়াল, ভোটযুদ্ধে নতুন জোয়ার তৃণমূলে

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : এসআইআর মামলা ঘিরে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে যে রাজনৈতিক দৃশ্যপট তৈরি হল, তা শুধু আইনি লড়াইয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রইল না। সেই সওয়ালই পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করল, এমনটাই মনে করছে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress বা TMC)। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) নিজে দাঁড়িয়ে যেভাবে নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীর যুক্তির পাল্টা যুক্তি তুলে ধরলেন, তাকে কেন্দ্র করে শাসক শিবিরে উৎসবের আবহ। দলের অন্দরে এই মুহূর্তে একটাই কথা ‘খেলা’ শুধু হয়নি, খেলার মোড়ই ঘুরে গিয়েছে।

অতীতে একাধিক নির্বাচনে তৃণমূলের রাজনৈতিক স্লোগান ‘খেলা হবে’ রাজ্যের রাজনৈতিক কথাবার্তায় পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছিল। সাম্প্রতিক কালে সেই স্লোগানকে আরও তীক্ষ্ণ করে মমতা বলেছিলেন, ‘এ বার শুধু খেলা হবে না, ফাটাফাটি খেলা হবে।’ এসআইআর মামলায় সুপ্রিম কোর্টে তাঁর উপস্থিতি এবং সওয়ালকে তৃণমূল নেতৃত্ব সেই ‘ফাটাফাটি’ রাজনীতিরই বাস্তব রূপ বলে ব্যাখ্যা করছেন। তাঁদের দাবি, এসআইআরের ময়দানে কার্যত একাই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছেন মমতা। এই সওয়ালের পর থেকেই ভোটমুখী তৃণমূলের অন্দরে যেন টগবগে আবহ। সাংসদ, মন্ত্রী, বিধায়ক সকলের কথাবার্তায় আত্মবিশ্বাসের ঝাঁজ। শাসকদলের প্রথম সারির নেতাদের মতে, ভোটের আগে সংগঠনের মধ্যে যে জড়তা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে এই ঘটনা। এসআইআর শুরু হওয়ার পর বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) ও বিজেপির লাগাতার হুঁশিয়ারিতে দলের নিচুতলার অনেক কর্মী কিছুটা গুটিয়ে গিয়েছিলেন বলে স্বীকার করছেন তৃণমূলেরই একাংশ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) সাংগঠনিক তৎপরতায় সেই স্থবিরতা কিছুটা কাটলেও পুরোপুরি আত্মবিশ্বাস ফিরেছিল বলা যায় না। কিন্তু বুধবার দুপুরের পর থেকে সেই দ্বিধা কার্যত উবে গিয়েছে, এমনটাই দাবি শাসক শিবিরের।

আরও পড়ুন : CM Mamata Banerjee Post, West Bengal Communal Unity | মদনমোহন মন্দিরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘সর্বধর্মে শান্তির বাংলা গড়াই আমাদের সংকল্প’

তৃণমূল নেতৃত্ব মমতার এই সুপ্রিম-সওয়ালকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে ব্যাখ্যা করছেন। তাঁদের মতে, একটি সওয়ালের মধ্য দিয়েই তিনি একাধিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করে দিয়েছেন। প্রথমত, বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির মুখ হিসেবে যে তিনিই প্রধান এবং নির্ভরযোগ্য নেতৃত্ব, সেই বার্তাই জাতীয় স্তরে পরিষ্কার হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-বিরোধী অতিরিক্ত ভোটব্যাঙ্ক মমতার দিকেই ঝুঁকবে বলে দলের ধারণা। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সিপিএম (CPIM) ও কংগ্রেসের উপর। মতাদর্শগতভাবে বিজেপি-বিরোধী হলেও বাম শিবিরের একাংশের মধ্যে নতুন করে দ্বিধা তৈরি হবে, এমনই মনে করছেন তৃণমূলের কৌশলবিদরা। এই ব্যাখ্যার বাস্তব উদাহরণ মিলেছে সওয়ালের পরপরই। সুপ্রিম কোর্টে মমতার যাওয়াকে কেন্দ্র করে বুধবার সকালে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী (Sujan Chakraborty) কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘এ সব নাটক।’ কিন্তু সওয়াল শেষ হতেই ভিন্ন সুর শোনা যায় সিপিআইএমএল (লিবারেশন) -এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের (Dipankar Bhattacharya) গলায়। তিনি মমতার পদক্ষেপকে ‘ইতিবাচক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘নাটক বলতে যাব কেন? অনেকে অনেক কিছুকেই নাটক বলেন।’ এই মন্তব্য তৃণমূলের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ স্লোগানের নেপথ্যে লিবারেশনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে যদিও নৈহাটি উপনির্বাচনে সিপিএমের সমর্থনে লিবারেশন প্রার্থী দিয়েছিল। তবু মমতার সওয়াল সেই সাম্প্রতিক ঐক্যেও ফাটল ধরিয়েছে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। তৃতীয় দিকটি সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে ঘিরে। তৃণমূলের অন্দরের একাংশ মানছে, কিছু ইস্যুতে সংখ্যালঘুদের মধ্যে দল ও সরকার নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সংশোধিত ওয়াকফ আইন বা হুমায়ুন কবীরের (Humayun Kabir) নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ, একাধিক ঘটনায় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় অসন্তোষের আঁচ মিলেছে। শাসকদলের মতে, এসআইআর মামলায় মমতার সওয়াল সেই ক্ষোভ প্রশমনে বড় ভূমিকা নেবে। বিজেপি-বিরোধিতার প্রশ্নে মমতা ও তৃণমূলের উপর সংখ্যালঘু সমাজের যে আস্থা দীর্ঘ দেড় দশক ধরে তৈরি হয়েছে, তা নতুন করে মজবুত হবে বলেই তাঁদের বিশ্বাস।

চতুর্থত, জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের অবস্থান। যে ১২টি রাজ্যে এসআইআর চলছে, তার মধ্যে কেরল ও তামিলনাড়ুর মতো অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যও রয়েছে। কিন্তু সেসব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা এসআইআর বিরোধিতায় মমতার মতো সরাসরি দিল্লিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেননি। বিহারে কংগ্রেস ও আরজেডি মিছিল করলেও আইনি লড়াইকে এই উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তৃণমূল দেখাতে চেয়েছে, তারা শুধু রাস্তায় আন্দোলন বা বুথ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, প্রয়োজন হলে দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও তাদের নেত্রী সরাসরি লড়াই করেন। পঞ্চমত, দলের অভ্যন্তরীণ সংগঠন। সাংগঠনিক রদবদল ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে বহু জায়গায় কার্যকরী নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। তৃণমূলের মতে, মমতার এই সওয়াল সেই নিস্ক্রিয় অংশকেও ফের রাস্তায় নামতে অনুপ্রাণিত করবে। উল্লেখ্য, দলের অন্দরে এই রাজনৈতিক অভিঘাত নিয়ে নানা মন্তব্য শোনা যাচ্ছে। প্রথম সারির এক নেতার কথায়, ‘দেড় বছর আগে আরজি কর পর্বে আমরা ঘরে ঢুকে গিয়েছিলাম। কিন্তু এসআইআর-এ দিদির সওয়াল সব হিসেব উল্টে দিল।’ রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় (Sukhendu Sekhar Ray), যিনি একসময় ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনিও সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, ‘এমন নেত্রী কখনও দেখিনি।’ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) তো আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে নজির গড়লেন মমতাদি।’ অন্যদিকে, আগামী সোমবার ফের এসআইআর মামলার শুনানি রয়েছে। মমতা আবার দিল্লি যাবেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। কেউ বলছেন, তিনি আবারও সুপ্রিম কোর্টে হাজির থাকবেন। আবার অন্য অংশের মতে, জাতীয় স্তরে যে বার্তা দেওয়ার ছিল, তিন দিনের দিল্লি সফরেই তা দেওয়া হয়ে গিয়েছে। তবে এই প্রশ্নে সকলেই একমত, মমতা দিল্লি যান বা না যান, এসআইআর মামলার সৌজন্যে দিল্লির রাজনীতি আপাতত তাঁর চারপাশেই ঘুরছে।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Chingrighata Metro Work Stalled | চিংড়িঘাটার জটেই থমকে মেট্রো, হাই কোর্টের নির্দেশ না-মানার অভিযোগে মমতা সরকারের দিকে তোপ রেলমন্ত্রীর

Sasraya News
Author: Sasraya News