সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লী : ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR বা Intensive Revision) ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, তা বুধবার নতুন মোড় নিল সুপ্রিম কোর্টে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) আদালতে সওয়াল করার পর শীর্ষ আদালত নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করল। আদালতের নির্দেশ, নামের সামান্য বানান ভুল, পদবির রকমফের বা অনুবাদজনিত ত্রুটির কারণে কোনও প্রকৃত ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে ভোটারদের শুনানির নোটিস ধরানোর ক্ষেত্রে আরও সংবেদনশীল ও সতর্ক হতে হবে কমিশনের আধিকারিকদের।
উল্লেখ্য যে, গত ২৬ নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই সংশোধনী প্রক্রিয়ার শেষ দিন ধার্য রয়েছে ৭ ফেব্রুয়ারি এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা ১৪ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ, হাতে সময় অত্যন্ত সীমিত। এই পরিস্থিতিতে এসআইআর নিয়ে রাজ্যে যে সমস্যাগুলি দেখা দিয়েছে, তা তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন মমতা। বুধবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Justice Surya Kant), বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Justice Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি বিপুল মনুভাই পাঞ্চোলি (Justice Vipul Manubhai Pancholi) -এর বেঞ্চে মামলার শুনানি হয়। মমতার সওয়াল শেষ হওয়ার পরই নির্বাচন কমিশনকে নোটিস দেয় শীর্ষ আদালত এবং এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ে দিকনির্দেশ ঠিক করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে বহু ভোটারকে শুনানিতে ডাকা হলেও, তার বড় অংশই নামের বানান বা পদবি পরিবর্তন সংক্রান্ত। এই ধরনের ক্ষেত্রে অতি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। আদালতের নির্দেশ, নামের ছোটখাটো ভুলে কোনও ভোটারের নাম বাদ দেওয়া চলবে না এবং সেই বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে।
আদালত রাজ্য সরকারকেও দায়িত্ব দিয়েছে। নির্দেশে বলা হয়েছে, বাংলা ভাষা বোঝেন এবং স্থানীয় উপভাষা সম্পর্কে অবগত এমন আধিকারিকদের একটি তালিকা রাজ্যকে আদালতে জমা দিতে হবে। এসআইআর-এর কাজে ওই আধিকারিকদের যুক্ত করা হলে নামের বানান সংক্রান্ত বিভ্রান্তি অনেকটাই কমবে বলে মনে করছে আদালত। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, ‘বাংলা ভাষায় দক্ষ অফিসাররা এই কাজে নিযুক্ত হলে মাইক্রো অবজ়ার্ভারের প্রয়োজন হবে না।’ এই পর্যবেক্ষণ রাজনৈতিক মহলেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। মমতার আইনজীবীর অভিযোগ ছিল, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলি থেকে প্রায় ৮৩০০ জন মাইক্রো অবজ়ার্ভার নিয়োগ করা হয়েছে এবং তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকদের (ইআরও) ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। এই প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী আদালতে জানান, রাজ্য সরকার পর্যাপ্ত সংখ্যক গ্রুপ-বি অফিসার দিতে না পারায় বাধ্য হয়েই অন্য রাজ্য থেকে মাইক্রো অবজ়ার্ভার আনতে হয়েছে। আদালত এই টানাপোড়েনের মধ্যেই নির্দেশ দিয়েছে, আগামী সোমবারের মধ্যে রাজ্য সরকারকে জানাতে হবে তারা বাংলা ভাষায় সাবলীল কত জন গ্রুপ-বি অফিসার দিতে পারবে।
ভোটারদের শুনানির নোটিস ধরানোর পদ্ধতি নিয়েও কড়া নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনাদের অফিসারদের একটু সংবেদনশীল হতে বলুন।’ একই সঙ্গে আদালত জানিয়ে দেয়, বুথ স্তরের আধিকারিকদের (বিএলও) স্বাক্ষর ছাড়া কোনও নথি বৈধ বলে গণ্য হবে না। এই নির্দেশকে ভোটার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। উল্লেখ্য, বুধবার মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান (Shyam Divan)। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, ১৬ ডিসেম্বর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮৮ লক্ষ ভোটারের শুনানি হয়েছে। দৈনিক গড়ে ১.৮ লক্ষ ভোটারের শুনানি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু এখনও প্রায় ৬৩ লক্ষ ভোটারের শুনানি বাকি, অথচ হাতে সময় মাত্র চার দিন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করতে গেলে প্রতিদিন গড়ে ১৫.৫ লক্ষ ভোটারের শুনানি করতে হবে, যা বাস্তবে অসম্ভব বলে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মমতার আইনজীবী। তিনি আরও বলেন, মাইক্রো অবজ়ার্ভারদের ভূমিকা ও নথি গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নানা অসঙ্গতি রয়েছে। এই প্রেক্ষিতে মমতার মূল আবেদন, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা অনুসারেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠিত হোক। তাঁর আইনজীবীর যুক্তি, এত অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক শুনানি শেষ করার চাপ থাকলে প্রকৃত ভোটারদের বাদ পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়, যা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক।
শুনানির সময় তথ্যগত অসঙ্গতির তালিকা প্রকাশ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় -এর আইনজীবী প্রস্তাব দেন, কোন কোন ভোটারের নাম অসঙ্গতির তালিকায় রয়েছে এবং কী কারণে রয়েছে, তা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে স্পষ্ট ভাবে জানাতে হবে। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, ‘ভোটারকে অবশ্যই জানতে হবে কেন তার নাম তালিকায় রয়েছে। প্রশ্ন হল, কোন পদ্ধতিতে জানানো হবে।’ কমিশনের তরফে জানানো হয়, ওয়েবসাইটে তালিকা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভাবে ভোটারদের নোটিস পাঠানো হচ্ছে, যেখানে কারণ উল্লেখ থাকছে। মমতার আরও অভিযোগ, প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষকে শুধুমাত্র নামের বানানজনিত কারণে শুনানিতে ডাকা হয়েছে। পদবির ইংরেজি বানানের সামান্য রকমফেরের উদাহরণও আদালতে তুলে ধরা হয়। এই প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘২০০২ সালের ভোটার তালিকা ছিল বাংলায়। অনুবাদের সময় এই সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক।’ তিনি স্পষ্ট করে দেন, রাজ্য সরকার যদি বাংলা ও স্থানীয় ভাষা বোঝেন এমন কর্মকর্তাদের একটি টিম দেয় এবং তারা যাচাই করে জানায়, তবে নির্বাচন কমিশনের কাজ সহজ হবে। তবে এই ধরনের ত্রুটির জন্য কোনও প্রকৃত ভোটারকে বাদ দেওয়া যাবে না, এই বিষয়ে আদালতের অবস্থান একেবারেই অনড়।তবে, আগামী সোমবার ফের এই মামলার শুনানি রয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। তার আগেই রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল। একদিকে এসআইআর প্রক্রিয়া, অন্যদিকে ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্ন, এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ যে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee on Election Commission | জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের ইঙ্গিত, দিল্লী থেকে নির্বাচন কমিশনকে তীব্র আক্রমণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়




