সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের পুরসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। বিজেপি-এর সঙ্গে এনসিপিআই (NCPI)-এর সম্ভাব্য জোট নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই রাজ্য রাজনীতিতে আলোচনা চলছিল। সেই জল্পনার অবসান ঘটাতে দলের অবস্থান জানিয়ে দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বরাবর নিজের শক্তির উপর নির্ভর করে রাজনৈতিক লড়াই করেছে। আগামী পুরভোটেও দল একাই লড়াই করার পথে হাঁটবে বলে তাঁর মন্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে। একই সঙ্গে কংগ্রেসকে নিশানা করে তিনি জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (Syama Prasad Mukherjee) প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন বলে উল্লেখ। ফলে পুরভোটের আগে সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোট নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি বিজেপি ও কংগ্রেসের ঐতিহাসিক সংঘাতও আলোচনায় উঠে এসেছে। সম্প্রতি এনসিপিআই সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Sudip Banerjee) বাড়িতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছিল।
লক্ষ্মীপুজোর দিন কলকাতা উত্তরের সাংসদের বাড়িতে মুখ্যমন্ত্রীর যাওয়া ঘিরে তৈরি হয় নতুন জল্পনা। সেখানে মন্ত্রী অর্জুন সিংও (Arjun Singh) উপস্থিত ছিলেন বলে সূত্রের খবর। এই সৌজন্য সাক্ষাৎকে কেন্দ্র করেই বিজেপি ও এনসিপিআইয়ের মধ্যে কোনও রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে শমীক ভট্টাচার্যের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই সম্ভাবনার বিষয়ে বিজেপির অবস্থান নিয়ে নতুন ইঙ্গিত পাওয়া গেল। বিজেপির রাজ্য সভাপতির বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে দলকে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করতে হয়েছে। একসময় রাজ্যে বিজেপির ভোটের হার ছিল এক শতাংশেরও কম। সেই জায়গা থেকে সংগঠন বিস্তার করে দল আজ রাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে বলে তাঁর দাবি। তাই অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটের উপর নির্ভর না করে নিজেদের সংগঠন ও কর্মীদের শক্তিতেই নির্বাচনে লড়াই করার পক্ষপাতী বিজেপি। তাঁর মতে, যে রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরে একক শক্তিতে লড়াই করে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে, তাদের ক্ষেত্রে জোট নিয়ে অযথা আলোচনা করে লাভ নেই। শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে তৃণমূলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়ে আমরা দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়েছি। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে সরকার চলছে। নন-ইস্যুকে ইস্যু বানিয়ে লাভ নেই। বিজেপি বিজেপির মতো আছে। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।’
শমীক ভট্টাচার্য-এর এই বক্তব্যে দলের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি বিরোধীদের জোট-জল্পনাকে গুরুত্ব না দেওয়ার মনোভাবও প্রকাশ পেয়েছে। তবে রাজনৈতিক মহলের আলোচনায় শুধু পুরভোটে সম্ভাব্য জোটের প্রশ্নই নেই, বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শমীক ভট্টাচার্যের মতে, বিজেপির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু থেকেই সংঘর্ষ ও সংগঠন গড়ে তোলার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, ‘বিজেপিতে তো সারাজীবন একাই লড়ে এসেছে। আমরা যখন এই রাজনৈতিক দল করা শুরু করি, তখন থেকে ভোটের শতাংশ এক শতাংশের নীচে। বিজেপির ইতিহাস সংঘর্ষের ইতিহাস। কংগ্রেসীদের হাতে শ্যামাপ্রসাদের রক্ত লেগে রয়েছে। সেই হাত ধরতে গেলে একটু চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।’
আরও পড়ুন : Samik Bhattacharya, TMC to BJP | তৃণমূলের জন্য দরজা বন্ধ, ২০৭ আসনের জয়ের পর কড়া বার্তা শমীকের
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে কংগ্রেসকে আক্রমণ করার মাধ্যমে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দলের আদর্শগত অবস্থানও তুলে ধরেছেন। জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বিজেপির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের সাংগঠনিক ও আদর্শগত পরিচয় তুলে ধরে এসেছে। শমীকের বক্তব্যেও সেই ঐতিহাসিক প্রসঙ্গের ব্যবহার দেখা গিয়েছে। তাঁর ইঙ্গিত, যে রাজনৈতিক ইতিহাস ও আদর্শকে সামনে রেখে বিজেপি নিজেদের পরিচিতি তৈরি করেছে, তার সঙ্গে আপস করে কোনও জোট গড়ার আগে দলকে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে, লক্ষ্মীপুজোর দিন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি নিয়েও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে এনসিপিআইয়ের সঙ্গে বিজেপির সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর ওই সাক্ষাতের রাজনৈতিক তাৎপর্য খোঁজার চেষ্টা করেন অনেকে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় সাক্ষাৎকে সৌজন্যমূলক বলেই ব্যাখ্যা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই যাতায়াতের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক সমীকরণের সম্পর্ক নেই। ফলে একটি ব্যক্তিগত বা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে যে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক আলোচনার কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই বিষয়ে নিজের বক্তব্য জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এনসিপিআইয়ের সম্ভাব্য জোট নিয়ে কোনও আলোচনা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি আগের একটি কথোপকথনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, প্রায় তিন মাস আগে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের দলের কয়েকজনকে প্রার্থী করার বিষয়টি বিবেচনা করার কথা জানিয়েছিলেন বলে সুদীপের বক্তব্য। উত্তরে তিনি পরে আলোচনায় বসার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তার পর থেকে সেই বিষয়ে আর কোনও অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন সাংসদ। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য রাজনৈতিক জল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি পুরভোটে একক লড়াইয়ের অবস্থান তুলে ধরছেন, অন্যদিকে সুদীপের বক্তব্যে অতীতে প্রার্থী করা নিয়ে কথাবার্তার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। তবে অতীতে কোনও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকলেও তা থেকে বর্তমান সময়ে আনুষ্ঠানিক জোটের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। দুই দলের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনও সমঝোতা হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী পরিস্থিতির উপর।
পশ্চিমবঙ্গের পুরসভা নির্বাচন রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে। স্থানীয় স্তরে সংগঠনের শক্তি, প্রার্থী নির্বাচন, ওয়ার্ডভিত্তিক সমীকরণ ও ভোটারদের সমর্থন, এসবকিছুই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভূমিকা নেয়। সেই কারণে পুরভোটের আগে ছোট ও বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, বিজেপি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক শক্তির উপর ভরসা রেখেই এগোতে চাইছে। এনসিপিআইয়ের সঙ্গে বিজেপির জোট নিয়ে জল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নির্ধারণের জন্য দুই দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যে এককভাবে লড়াই করার পক্ষেই বিজেপির অবস্থান উঠে এসেছে। অন্যদিকে, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় অতীতের আলোচনা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার কোনও অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে লক্ষ্মীপুজোর সৌজন্য সাক্ষাৎকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া জল্পনা এবং পুরভোটের সম্ভাব্য সমীকরণ, দু’টি বিষয়কে আলাদা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, পুরভোটের নির্ঘণ্ট, প্রার্থী তালিকা এবং দলগুলির আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী কৌশল সামনে এলে এই রাজনৈতিক অবস্থান আরও পরিষ্কার হবে। তার আগে বিজেপি-এনসিপিআই জোট নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দাবি করার মতো তথ্য সামনে আসেনি। তবে শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্যে বিজেপির একক লড়াইয়ের বার্তা এবং কংগ্রেসকে ঘিরে তাঁর কড়া রাজনৈতিক আক্রমণ রাজ্যের নির্বাচনী আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিল।



