সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বরোদা ২৬ অক্টোবর ২০২৬ : দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আবার শতরানের দেখা পেলেন ভারতের অলরাউন্ডার দীপ্তি শর্মা (Deepti Sharma)। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে আইসিসি মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় এক দিনের ম্যাচে অপরাজিত ১০৬ রান করে নজর কাড়লেন ভারতীয় ক্রিকেটের এই নির্ভরযোগ্য তারকা। রবিবার বরোদার কোটাম্বি স্টেডিয়ামে তাঁর ব্যাট থেকে আসে কেরিয়ারের দ্বিতীয় ওডিআই শতরান। প্রায় সাড়ে ন’বছর পর পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছনোর আনন্দ যেমন ছিল দীপ্তির চোখেমুখে, তেমনই তাঁর ইনিংস ভারতকে এনে দিল সিরিজ জয়ের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। জিম্বাবোয়েকে ১২১ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে এগিয়ে গেল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল। দীপ্তির শেষ ওডিআই শতরান এসেছিল ২০১৭ সালের মে মাসে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সেই ম্যাচে দীপ্তি ১৮৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছিলেন। তার পর থেকে একাধিক ম্যাচে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর শতরানের দেখা পাননি এই ভারতীয় অলরাউন্ডার।
রবিবারের লম্বা ইনিংসের মাধ্যমে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হল দীপ্তির। দু’টি শতরানের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়াল ৯ বছর ৫ মাস, অর্থাৎ ৩৪৫০ দিন। এত দীর্ঘ সময় পর আবার শতরানের ঘরে পৌঁছে স্বাভাবিকভাবেই আবেগাপ্লুত দীপ্তি। ম্যাচের পরে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, শতরান করার জন্য তিনি বহুবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রত্যাশিত সাফল্য পেতে সময় লেগেছে। তবু নিজের পরিশ্রমের উপর বিশ্বাস হারাননি। তাঁর কথায়, ‘আমি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই জায়গায় পৌঁছতে অনেকটা সময় লেগে গেল। নিজের পরিশ্রমের উপর আমার বিশ্বাস ছিল। জানতাম, আজ হোক বা কাল, আবার শতরান করতে পারব।’ তাঁর এই বক্তব্যে উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, ধারাবাহিক চেষ্টা ও নিজের দক্ষতার উপর আস্থার কথা। কিন্তু, দীপ্তির ইনিংসের লক্ষ্য কেবল ব্যক্তিগত শতরান ছিল না। দলের রান বাড়ানো ও ব্যাটিংয়ের সময় গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে তোলাই ছিল তাঁর প্রধান ভাবনা। পরিস্থিতি অনুযায়ী কীভাবে ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সে দিকেই বেশি মন দিয়েছিলেন তিনি। শতরান যে বিশেষ প্রাপ্তি, তা স্বীকার করেও দীপ্তি জানিয়েছেন, দলের প্রয়োজন মেটানোই ছিল তাঁর কাছে অগ্রাধিকার। দীর্ঘ বিরতির পর শতরান পাওয়ায় খুশি হলেও সেই সাফল্যকে দলের জয়ের সঙ্গে যুক্ত করেই তিনি দেখতে চেয়েছেন।
বরোদার মাঠে এই সাফল্য পাওয়াও দীপ্তির কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। নিজের শহর ও পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত এই মাঠে এমন একটি ইনিংস খেলার সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ভারতীয় অলরাউন্ডার। দীর্ঘ সময় ধরে যে সাফল্যের অপেক্ষা করছিলেন, তা এল দলের সিরিজ জয়ের ম্যাচেই। ফলে ব্যক্তিগত প্রাপ্তির পাশাপাশি দলগত সাফল্যের আনন্দও তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীপ্তির শতরানের দিন ভারতীয় দলের হয়ে আরও একটি বড় ইনিংস খেলেছেন প্রাক্তন অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ১২৬ রান। দুই ক্রিকেটারের শতরানের সৌজন্যে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ভারত ৬ উইকেট হারিয়ে ৩২৮ রান তোলে। জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে এই বড় সংগ্রহ তৈরি করতে দীপ্তি ও হরমনপ্রীতের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে অভিজ্ঞ হরমনপ্রীতের বড় রান, অন্যদিকে বড় বিরতির পর দীপ্তির শতরান ভারতের ব্যাটিংকে শক্তিশালী জায়গায় পৌঁছে দেয়।
৩২৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জিম্বাবোয়ে অবশ্য সহজে হার মানেনি। সফরকারী দলের ব্যাটারেরা যথাসাধ্য লড়াই চালিয়ে যান। কিন্তু ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সের সামনে শেষ পর্যন্ত তাদের ইনিংস থেমে যায় ২০৭ রানে। ম্যাচের নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষ হওয়ার আগেই, অর্থাৎ শেষের দিকের ওভারে অলআউট হয়ে যায় জিম্বাবোয়ে। ফলে ১২১ রানের বড় ব্যবধানে জয় পায় ভারত। এই জয়ের সঙ্গে সিরিজও নিজেদের দখলে নেয় স্বাগতিক দল। জিম্বাবোয়ের পারফরম্যান্সের প্রশংসাও করেছেন দীপ্তি। তাঁর মতে, প্রতিপক্ষকে হাল্কাভাবে নেওয়ার কোনও কারণ ছিল না। প্রথম এক দিনের ম্যাচেও জিম্বাবোয়ের খেলোয়াড়েরা লড়াই করার চেষ্টা করেছিলেন। দলটির ব্যাটিং বিভাগে এমন খেলোয়াড় রয়েছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী যাঁরা রান তুলতে পারেন। তাই তাদের দুর্বল দল বলে ধরে নেওয়ার পক্ষপাতী নন দীপ্তি। তাঁর মতে, এই ম্যাচেও জিম্বাবোয়ে যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিল।
ভারতীয় অলরাউন্ডার আরও জানিয়েছেন, নিজেদের বোলিং বিভাগের ক্ষমতা সম্পর্কে দলের আস্থা ছিল। সেই বিশ্বাস নিয়েই জিম্বাবোয়ের রান তাড়া করার পথে বাধা তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ভারতীয় বোলারেরা সেই দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করেছেন বলে মনে করেন দীপ্তি। তাঁর মতে, শুধু বোলিং বিভাগ নয়, পুরো দলই নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে। ব্যাটিংয়ে বড় রান তোলা থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষকে অলআউট করা এসব ক্ষেত্রেই দলের সম্মিলিত পারফরম্যান্স জয়ের ভিত তৈরি করেছে। উল্লেখ্য যে, এই সিরিজের প্রথম ম্যাচ হয়েছিল ২৩ অক্টোবর বরোদায়। সেই ম্যাচে ভারত ৯ উইকেটে জিতেছিল। দ্বিতীয় ম্যাচে ২৫ অক্টোবর ১২১ রানের জয় পাওয়ায় সিরিজের নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত হয়েছে ভারতের হাতে। তিন ম্যাচের সিরিজের শেষ এক দিনের ম্যাচ ২৮ অক্টোবর, বরোদাতেই। সিরিজ জয় নিশ্চিত হওয়ার পর শেষ ম্যাচে ভারতীয় দল কীভাবে নিজেদের পারফরম্যান্স ধরে রাখে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের।
দীপ্তির শতরান ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। একজন অলরাউন্ডারের কাছ থেকে দল সাধারণত ব্যাটিং ও বোলিং, দুই বিভাগেই অবদান আশা করে। দীপ্তি দীর্ঘদিন ধরেই সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তবে ওডিআই শতরানের জন্য প্রায় সাড়ে ন’বছরের অপেক্ষা তাঁর কেরিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। ২০১৭ সালের ১৮৮ রানের ইনিংসের পর আবার তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছনো প্রমাণ করল, সুযোগ পেলে বড় ইনিংস গড়ার সামর্থ্য এখনও তাঁর রয়েছে। ব্যক্তিগত সাফল্য ও দলগত জয় এই দু’য়ের সমন্বয়ে বরোদার ম্যাচটি দীপ্তির কাছে স্মরণীয় হয়ে উঠল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া শতরান তাঁকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস দেবে, আর সিরিজ জয়ের ফলে ভারতীয় শিবিরেও থাকবে বাড়তি স্বস্তি। আগামী ম্যাচে এই ছন্দ বজায় রাখাই হবে দলের লক্ষ্য। আপাতত জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ওডিআইয়ে দীপ্তির অপরাজিত ১০৬ রান ও হরমনপ্রীতের ১২৬ রানের ইনিংসই আলোচনার কেন্দ্রে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : WPL 2027 start date, WPL 2027 auction date, WPL auction 28 October 2026 | হরমনপ্রীতদের WPL শুরু ১৪ জানুয়ারি, কোচিতে নিলাম! রিটেনশনের শেষ দিনও ঘোষণা বিসিসিআইয়ের



