সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ৫ অক্টোবর ২০২৬: প্রসূতি ও সদ্যোজাতের চিকিৎসা পরিষেবার উন্নতিতে রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন দুই প্রবীণ চিকিৎসক। শিশুরোগ চিকিৎসক অরুণ সিং (Arun Singh) ও আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের (R. G. Kar Medical College and Hospital) স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রাক্তন প্রধান অরূপকুমার মাজি (Arup Kumar Maji) স্বাস্থ্য ভবনের যুগ্ম উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হলেন। প্রসূতিমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, নবজাতকদের চিকিৎসার মান বাড়ানো ও রাজ্যের স্বাস্থ্যসূচকে উন্নতি ঘটানোই এই নিয়োগের অন্যতম লক্ষ্য বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে। প্রশাসনিক মহলের মতে, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা ব্যবস্থায় নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
আরও পড়ুন : SSC Group C and Group D Result | এসএসসির ফল প্রকাশ, শুরু ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি
রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় শিশুরোগ চিকিৎসক অরুণ সিংহের প্রত্যাবর্তন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও একসময় তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যেতে হয়েছিল। প্রায় চোদ্দো বছর আগে এসএসকেএম হাসপাতাল (SSKM Hospital) থেকে তাঁকে সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে (Sagore Dutta Medical College and Hospital) বদলি করা হয়েছিল। সেই সময় সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে সদ্যোজাতদের চিকিৎসার জন্য পৃথক বিভাগ না থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তৎকালীন শিশুরোগ সংক্রান্ত টাস্ক ফোর্সের প্রধান ত্রিদিব বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে এই বদলি হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। যদিও সেই সময়কার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অরুণ সিংহের চিকিৎসা অভিজ্ঞতা ও নবজাতক পরিচর্যায় তাঁর কাজ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনায় আসে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে যোধপুর এইমস (AIIMS Jodhpur) থেকে আবার পশ্চিমবঙ্গে ফেরেন প্রবীণ এই চিকিৎসক। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কয়েকটি এলাকায় সদ্যোজাতদের মৃত্যুহার বেশি থাকার বিষয়টি সামনে আসার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁর পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে নবজাতকের জন্মের পর প্রথম কয়েক মিনিটে কী ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত, তা নিয়ে তিনি স্বাস্থ্যকর্মীদের সামনে একটি পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাঁর পরামর্শ ছিল, জন্মের পরপরই নাড়ি কেটে না দিয়ে গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা (Placenta) বেরোনো পর্যন্ত অপেক্ষা করা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট এলাকায় তা প্রয়োগের পর ইতিবাচক ফল পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ের (Canning) অভিজ্ঞতা এই উদ্যোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অরুণ সিং-এর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই পদ্ধতি অনুসরণের পর সদ্যোজাতদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে (ICU) ভর্তি করার প্রয়োজন কমতে দেখা যায়। নবজাতকদের জন্ডিস ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতার ক্ষেত্রেও উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে তিনি জানিয়েছিলেন। জন্মের পরপরই শিশুর শারীরিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কীভাবে কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়। ক্যানিংয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতাকে রাজ্যের অন্য এলাকাতেও প্রয়োগ করার পরিকল্পনা করেছিলেন অরুণ সিং। রাষ্ট্রীয় বাল স্বাস্থ্য কার্যক্রমের (Rashtriya Bal Swasthya Karyakram) প্রাক্তন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার সময় নবজাতকের মৃত্যুহার কমানোর পরিকল্পনা রাজ্যজুড়ে তিনি ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই সময় তাঁর চাকরির মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হয়েছিল বলেও জানা যায়। কিন্তু তাঁর প্রস্তাব রাজ্যের সর্বত্র কার্যকর করার জন্য স্বাস্থ্য প্রশাসনের তরফে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। এর পরেই ছত্তীসগঢ় সরকারের আমন্ত্রণে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে সেখানে কাজ করতে চলে যান তিনি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও রাজ্যে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় চিকিৎসা মহলের একাংশে হতাশা তৈরি হয়েছিল।
আরও পড়ুন : Admission Closed in 205 B.Ed Colleges | ২০৫ বিএড কলেজে ভর্তি বন্ধ!
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর অরুণ সিংকে ফেরানোর উদ্যোগ নেয় নতুন স্বাস্থ্য প্রশাসন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Sharadwat Mukhopadhyay) গত ২৯ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য ভবনে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকেই শিশুরোগ চিকিৎসার পাশাপাশি স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি পরিষেবার ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞ চিকিৎসককে উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা সামনে আসে। সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই অরুণ সিং-এর সঙ্গে অরূপকুমার মাজিকেও যুগ্ম উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করা হয়েছে। অরূপ মাজির নিয়োগের মাধ্যমে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রেও রাজ্যের পরামর্শদাতা কাঠামোকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রসূতিমৃত্যু কমানো, গর্ভবতী মায়েদের ঝুঁকি চিহ্নিত করা, প্রসবকালীন জটিলতা সামাল দেওয়া এবং প্রসবের পর মায়ের শারীরিক অবস্থার উপর নজর রাখা, এই বিষয়গুলি সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জেলা হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজগুলিতে প্রসূতি পরিষেবার মান উন্নত করতে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ কাজে লাগতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে সময়মতো চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাব অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ায়। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন উপদেষ্টাদের ভূমিকা কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
নিয়োগের পর অরুণ সিং স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এই দায়িত্ব তাঁর কাছে সম্মানের। তিনি মনে করেন, বাংলার স্বাস্থ্য পরিষেবায় মা ও শিশুর চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত বা ক্ষুদ্র স্বার্থের বাইরে গিয়ে বৃহত্তর জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে তিনি কাজ করার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নবজাতকের পরিচর্যা ও শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দুই চিকিৎসকের নিয়োগ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় তাঁদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, অরুণ সিংহ এবং অরূপকুমার মাজি দু’জনেই চিকিৎসা জগতের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। গত মাসে মালদহ মেডিক্যাল কলেজে (Malda Medical College and Hospital) শিশুমৃত্যুর অস্বাভাবিক হারের খবর সামনে আসার পর স্বাস্থ্য দফতর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করেছিল। কিন্তু শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর না করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি বলে মনে করেন তিনি। মন্ত্রীর কথায়, স্বাস্থ্য দফতরের কাজের ক্ষেত্রে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশ প্রয়োজন। দু’জন চিকিৎসককেই রাজ্যে ফিরে দায়িত্ব নিতে রাজি করানো সম্ভব হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
অরুণ সিংকে ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, শুধু অতীতের কোনও সিদ্ধান্তের সংশোধন নয়, রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রয়োজনেই তাঁকে ফেরানো হয়েছে। আগের সরকারের আমলে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ তুলে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে তাঁর অভিজ্ঞতা রাজ্যের কাজে লাগানো জরুরি। তাঁর মতে, চিকিৎসা পরিষেবার মান উন্নত করতে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে দুই যুগ্ম উপদেষ্টার নিয়োগের পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তাঁদের পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। ক্যানিংয়ে নবজাতকের পরিচর্যা নিয়ে যে অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে, তা রাজ্যের অন্য হাসপাতালগুলিতে প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, চিকিৎসাকর্মীর সংখ্যা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও পরিকাঠামোর বিষয়গুলি খতিয়ে দেখতে হবে। একইভাবে প্রসূতি চিকিৎসার ক্ষেত্রে জেলা ও মহকুমা হাসপাতালগুলিতে পরিষেবা উন্নত করার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাজ্যের এই নতুন উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হয়, তা নির্ভর করবে হাসপাতাল পর্যায়ে তার প্রয়োগ এবং নিয়মিত নজরদারির উপর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sundarbans Development Budget 2026 | Suvendu Adhikari : সুন্দরবনের উন্নয়নে ১২০০ কোটি টাকার ঘোষণা, ৩২০২ প্রকল্পে বদলাবে দ্বীপাঞ্চলের ছবি? মুড়িগঙ্গা সেতু নিয়ে ২০২৯ সালের আশ্বাস




