সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ওয়াশিংটন : আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড়সড় বিপর্যয়ের পর এবার প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে হোয়াইট হাউসের অন্দরের মতবিরোধ। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, দেশের অভ্যন্তরে মূল্যবৃদ্ধি ও সাধারণ আমেরিকানদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা, এই তিনটি বিষয়কেই নির্বাচনে দলের পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স (JD Vance)। তাঁর বক্তব্যে সরাসরি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) নাম না থাকলেও, ইরান নীতির সমালোচনার তির যে বর্তমান প্রশাসনের দিকেই, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পরেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনার কোনও ইঙ্গিত দেননি ট্রাম্প। তিনি প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে আবার অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই রিপাবলিকান শিবিরে পরাজয়ের কারণ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা সামনে আসছে। ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ নেতারা নির্বাচনী বিপর্যয়ের পিছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাবের কথা স্বীকার করলেও, সামরিক অভিযানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁদের অবস্থান এক নয়। প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা রুখতে সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ভান্সের সাম্প্রতিক মন্তব্যে উঠে এসেছে অন্য ছবি। তাঁর মতে, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ও দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধানে প্রশাসনের ব্যর্থতা ভোটারদের একাংশকে রিপাবলিকানদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সমাজমাধ্যমে প্রায় ৬০০ শব্দের একটি দীর্ঘ পোস্টে ভান্স নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। সেখানে তিনি যুদ্ধের বিষয়টিকে পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট নিজেও নির্বাচনের পরাজয়ের সঙ্গে যুদ্ধের সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধি ও ‘আমেরিকানদের অগ্রাধিকার’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ার বিষয়টিও ভোটারদের মনোভাব বদলে দিয়েছে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট পার্টির (Democratic Party) দিকে ভোটারদের ঝোঁকার পিছনে এই অসন্তোষ কাজ করেছে বলে মনে করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ভান্সের বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেড়েছে তাঁর প্রশাসনিক অবস্থানের কারণে। তিনি ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং রিপাবলিকান শিবিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ফলে তাঁর মন্তব্যকে নিছক নির্বাচনী ফলের পর্যালোচনা হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে তাঁর বক্তব্য দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রকাশ্যে তিনি এত দিন প্রেসিডেন্টের সামরিক নীতির বিরোধিতা করেননি। কিন্তু ঘরোয়া আলোচনায় এই অভিযান নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির (BBC) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে অনড়। বুধবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভান্সের পোস্ট নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ইরান নিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্টের অবস্থান সম্পর্কে তিনি অবগত। তবে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্তকে তিনি যথাযথ বলেই মনে করেন। ট্রাম্পের দাবি, ওই পদক্ষেপের ফলে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা ওদের পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা বন্ধ করে দিয়েছি। ওরা আর এই অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না।’ অর্থাৎ নির্বাচনে ক্ষতির কারণ হিসেবে যুদ্ধের প্রভাব মেনে নিলেও সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কোনও ইঙ্গিত দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের এই অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরেও ইরান নীতিতে বড়সড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা আপাতত কম। বরং তিনি সামরিক অভিযানের সাফল্যকেই সামনে রাখতে চাইছেন। তাঁর যুক্তি, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় ছিল। তবে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারের প্রশ্নে ভোটারদের অসন্তোষ যে নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে, সেই বিষয়টি ভান্সের বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
এই মতপার্থক্যের পাশাপাশি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এত দিন রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছিল, ট্রাম্পের পর রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে পারেন ভান্স। দলের ভিতরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও বর্তমান প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে এই সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু বুধবার ট্রাম্পের মন্তব্য সেই জল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি বলেন, ২০২৮ সালের নির্বাচনে ভান্স আদৌ লড়বেন কি না, তা তিনি জানেন না। তাঁর কথায়, ‘হয়তো উনি লড়বেন না। আমি জানি না কে লড়বেন।’
প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যকে ঘিরে রিপাবলিকান শিবিরে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নও সামনে এসেছে। ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে ভান্সকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে নির্বাচনের পর যুদ্ধনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে মতপার্থক্য সামনে আসায় দলের ভিতরে নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের নিজেদের অবস্থান নতুন করে সাজাতে হলে ভান্সের মতো নেতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত প্রেসিডেন্টের শাসনকাল সম্পর্কে ভোটারদের মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের খারাপ ফল হলে প্রশাসনের নীতি, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক কূটনীতি বা সামরিক কৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির উপরেও চাপ তৈরি করেছে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে বিদেশে সামরিক অভিযানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ভান্সের বক্তব্যে সেই অসন্তোষের প্রতিফলন রয়েছে।
এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে ইরান নীতির পক্ষে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও ভোটারদের আস্থা ফেরানো। ভান্সের মন্তব্য এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে তৈরি হওয়া টানাপোড়েনকে আরও সামনে এনেছে। আপাতত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান না নিলেও, তাঁদের বক্তব্যে নীতিগত ব্যবধানের ইঙ্গিত মিলছে। নির্বাচনের ধাক্কা সামলে রিপাবলিকান নেতৃত্ব কতটা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভবিষ্যতে কী অবস্থান নেয়, এখন সেদিকেই নজর মার্কিন রাজনীতির।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Donald Trump rape allegation | ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, রিপোর্টে তোলপাড় আমেরিকা




