সাশ্রয় নিউজ ★ লন্ডন: অবশেষে ব্রিটেনে শুরু হল ইতিহাস বদলের কাজ। একুশ শতকে দাঁড়িয়ে রানি ভিক্টোরিয়ার যুগে প্রণীত গর্ভপাত সংক্রান্ত আইনকে (Britain’s Abortion Act) পিছনে ফেলে নারী অধিকারকে নতুন করে সংজ্ঞা দিতে পথে নামল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। গর্ভপাতকে আর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না, এই মর্মে মঙ্গলবার ব্রিটেনের হাউস অফ কমন্সে (House of Commons) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হল সংশোধনী প্রস্তাব। ৩৭০-১৩৭ ভোটে গৃহীত এই সংশোধনের ফলে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের (England and Wales) নারীরা একটি ঐতিহাসিক জয় পেলেন। দেশটির নারীরা তাঁদের শরীর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বিষয়ে আর আদালতের বিচারের মুখে পড়বেন না। প্রসঙ্গত, বহু দিন ধরেই দাবি উঠছিল যে, গর্ভপাত সংক্রান্ত ১৮৬১ সালের ‘Offences Against the Person Act’ বাতিল করে, আধুনিক সমাজ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিরিখে নতুন আইন প্রণয়ন হোক।

সূত্রের খবর, এই পরিবর্তনের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ছিলেন শ্রমিক দলের সাংসদ স্টেলা ক্রিসি (Stella Creasy)। তাঁর মতে, “আমরা আজ ইতিহাস গড়লাম। এতদিন নারীর গর্ভপাতের সিদ্ধান্তকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হত। সেটা ছিল লজ্জাজনক। আজ আমরা জানিয়ে দিলাম, নারীর শরীর, নারীর অধিকার।” স্টেলা আরও বলেন, “এটি কোনও চিকিৎসা বিষয় নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার।” উল্লেখযোগ্য যে, পুরনো আইনে ২৪ সপ্তাহের পর গর্ভপাত করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হত। যদিও বিশেষ ক্ষেত্রে, যেমন মায়ের প্রাণের ঝুঁকি বা গুরুতর অঙ্গবিকৃতি, তাতে ছাড় ছিল। কিন্তু সেই আইনেও গর্ভপাত করালে নারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলত। ২০১৯ সালে একটি ৪৪ বছরের মহিলার বিরুদ্ধে ৩২ সপ্তাহের গর্ভপাত করানোর জন্য ২ বছরের জেল হয়। সেই ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই সংশোধনীর ফলে এমন ঘটনা আর ঘটবে না। তবে এই সংশোধনীতে একটি শর্ত রয়ে গিয়েছে। তা হল, গর্ভপাত করানো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে, ২৪ সপ্তাহের পর আইন লঙ্ঘন হলে, শাস্তিমূলক পদক্ষেপ চালু থাকবে। ফলে সমালোচকদের মতে, আইন আংশিক মুক্তি দিলেও এখনও পুরোপুরি স্বাধীনতা দিচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রিটেনের এই পদক্ষেপ শুধুই আইন সংশোধন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আদর্শগত ব্যবধান তৈরির একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। কিছুদিন আগে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার খারিজ করে দিয়েছিল। ফলত, সেখানে প্রতিটি রাজ্য নিজস্ব আইন বানানোর অধিকার পায়। এর ফলে বহু জায়গায় গর্ভপাত নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। রিপাবলিকানদের কট্টরপন্থী অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) প্রশাসনের প্রাক্তন সহকারী জেডি ভান্স (JD Vance) ব্রিটেনের গর্ভপাত বাফার জোন আইন নিয়ে সরব হন সম্প্রতি। তিনি বলেন, “এভাবে গর্ভপাতকে উৎসাহ দেওয়া নারীর কল্যাণ নয়। এটা বরং সামাজিক অবক্ষয়।” তবে এই বক্তব্যকে কার্যত নস্যাৎ করে ব্রিটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মার (Keir Starmer) নেতৃত্বাধীন সরকার আইন সংশোধনের পথে হাঁটল। এর মাধ্যমে তাঁরা আমেরিকার হালে গা না ভাসিয়ে, স্বাধীন, মানবিক ও নারী অধিকারের পক্ষে শক্ত বার্তা দিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গর্ভপাত নিয়ে ব্রিটেনে আন্দোলনের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৬৭ সালের Abortion Act-এ কিছুটা শিথিলতা এলেও, ফৌজদারি দৃষ্টিকোণ থেকে তা অপরাধই ছিল। এবারের সংশোধনের ফলে প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো আইন বাতিল হয়ে গেল। এই নারী অধিকার সংস্থাগুলি সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘মাইলস্টোন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, নার্সিং ইউনিয়নসহ একাধিক সংগঠন এই আইনি সংস্কারের পক্ষে সওয়াল করেছিল। তাঁদের মতে, “নারীর স্বাস্থ্য ও পছন্দকে আইনের চোখে অপরাধ হিসেবে দেখা অত্যন্ত প্রতিকূল বার্তা দিত। এখন সময় এসেছে সমাজকে আরও মানবিক ও সহানুভূতিশীল করে তোলার।” তবে রাজনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কনজারভেটিভ দলের (Conservative Party) একাংশ মনে করছেন, ২৪ সপ্তাহের পর গর্ভপাতের ক্ষেত্রেও আইন শিথিল হলে তা নৈতিক প্রশ্ন তুলে দেবে। তবে সরকারি পক্ষের দাবি, বিজ্ঞান ও চিকিৎসা আজ অনেক দূর এগিয়েছে, এবং সময় এসেছে নারীকে নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে নারীর শরীর নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির রাশ টানতে ব্রিটেন যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা অবশ্যই নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। বহু আন্দোলনের পথ পেরিয়ে, বহু কণ্ঠস্বরের প্রতিবাদে, অবশেষে আইন বলছে, নারীর শরীর আর অপরাধের বিষয় নয়। তার উপর রয়েছে কেবল তার নিজেরই অধিকার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kim Kardashian | Donald Trump : কিম কার্দাশিয়ানের ‘অমানবিক’ মন্তব্য! ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র পাল্টা প্রশ্ন: ‘কে থাকবে, বলুন?’




