সম্পাদকীয়
কিছু লেখা যদি প্রেম ভালোবাসায় জমে থাকতো তাহলে হয়তো কোন অনুভূতি প্রকাশ হত রোমকুপে, মনের সুতোয় অথবা প্রাণের শহরে । কিন্তু কষ্ট আজ । বড্ড কষ্ট। কারণ মানুষ তার নিজস্বসত্তাকেই হারাতে বসেছে। ধীর গতি নিয়েছে। আরো আরো গতিময় করে তুলবে নতুন প্রাণের ভিতরে । সবুজ অভিনন্দন এগিয়ে আসবে হয়তো কিন্ত, মেধা থাকবে না। মেধা গিলে খাবে প্রতি নিয়ত। আর একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী পর্যন্ত উপলব্ধি থাকবে অথচ কর্মহীনতা প্রকাশ ঘটবে আর ঘটবেই। কারণ আবিষ্কার জানেনা যে সৃষ্টি করেছে সেই অদৃশ্য। তাহলে যে বাঁচিয় রেখেছে ! সেও অদৃশ্য। বেঁচে থাকার রহস্য খুঁজতে গিয়ে গভীরে ডুব দিলে তলিয়ে যেতে হয় । গভীরে যেতে হলে তো সাঁতার জানতে হবে না হলে তো পৌঁছুনোই হবে না। আর কোন স্রোতে ধাক্কায় পৌঁছে গেলেও শরীর না নড়ালে টিকতেও পারবে না। তাহলে এখানে বুঝেনিতে হবে। সাঁতার কাটার সময় সঙ্গে কেউ থাকবেনা।

একাই সাঁতরে যেতে হবে গভীর জলে গিয়ে শরীর দুলিয়ে প্রাণ রক্ষা করবার কৌশল জানতে হবে। তবে পৃথিবীতে জ্ঞান এলে প্রাণ রক্ষা করবার দ্বায়িত্ব নিজেরই। এই কথা ভুলে গেলে চলবে না। অর্থ প্রাণ রক্ষা করতে পারেনা। প্রাণ রক্ষা করতে পারে সংযোম। তাহলে প্রথমেই আমাদের সংযোম হতে হবে। কতটা হতে হবে ঠিক যতটা বেগতিক স্রোত বয়বে ততোটাই। মনে রাখতে হবে জীবনের প্রথম ও শেষ শ্বাসের নাম অলৌকিক । কারণ কেউ জানেই না পৃথিবীতে সে থাকবে না যাবে। প্রকৃতির বজ্র বৃষ্টি ঝড় ইত্যাদির মত। কিন্তু এটা ভুলে গেলেও চলবে না যে, এই অলৌকিক ক্ষমতাকেও কেউ বন্দি করে নিতে পারে তা! জীবনের রহস্য অতীব গভীর অনুভূতি সম্পূর্ণ। ভালোবাসায় প্রেমে যে শক্তি রয়েছে তাকি আজকের তথ্যপ্রয়ুক্তিতে থাকবে ? কখনোই না। কারণ ভালোবাসা প্রেম দ্বারাই তথ্যপ্রয়ুক্তির নির্মাণ হয়েছে। এই নির্মাণের মধ্যেই মেধা রেখেছে কিছুটা। এই মেধাই চুরি করবে ঘরে ঘরে। কবি থেকে লেখক, শিল্পী থেকে সাহিত্যিক, সংসার থেকে সমাজ, বিজ্ঞান থেকে দর্শন , ইতিহাস থেকে ভূগোল এগুলো সর্বোপরী বিষয়। এই বিষয় চুরি যেদিন থেকে চুরি হয়ে আসছে সেইদিন থেকেই ধ্বংস শুরু হয়ে গেছে। একদিন শেষ হয়ে যাবে। কথাটি অতি সত্যি। জার জন্ম আছে তার মৃত্যু আছে সে পাথর হোক বা প্রাণ। কখনোই ভুলে গেলে চলবে না যে , সৃষ্টি – জন্মের ইতিহাসে প্রথম কিন্ত প্রেম ভালোবাসার গল্প জুড়ে যায়। এই গল্প একটি প্রাণের মূল্য বোঝায়। কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। রিপুর স্বাদের মধ্যে ভালবাসা ও প্রেমের গভীর বোধ কাজ করে।🍁
🍂মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
সুদর্শন উদ্ধার : ব্রজনাথ, তোমার যে কত লীলা, কে তার নির্ণয় করতে পারে।

একবার শিবরাত্রির উৎসবের সময় গোপগণ গো-যানে চড়ে অম্বিকা বনে উপস্থিত হন৷ অম্বিকা উপবন সরস্বতী নদীর তীরে৷ তাঁরা সকলে সরস্বতী নদীতে স্নান করত ভক্তিসহকারে দেবাদিদেব মহাদেব ও জগন্মাতা শ্রীমতী অম্বিকা মাতার পূজা করলেন৷
তুমি বলাইদাদা ও শ্রীদাম সুদামাদি সখাগণ অম্বিকা বন দেখে খুব আনন্দ করতে লাগলে৷ গোপগণের অন্য কামনা ছিল না। তাঁরা হে দেব শঙ্কর, আমাদের প্রতি প্রসন্ন হও,এই প্রার্থনা করলেন এবং তাঁর প্রসন্নতা কামনায় সকল গোপই ব্রাহ্মণদিগকে গাভী,সুবর্ণ,বসন এবং সুমিষ্ট অন্নদান করতে লাগলেন। নন্দবাবা, সুনন্দাদি গোপসকল কেবল জলমাত্র পান করে থাকলেন এবং উপবাস ব্রত ধারণপূর্ব্বক সে রাত্রি সরস্বতী নদীর তীরেই যাপন করলেন। সেই বনে একটা অজগর সাপ ছিল। গোপগণের সহিত নন্দবাবা শুয়ে আছেন এমন সময় সে সাপটা এসে নন্দবাবার পায়ের দিক দিয়ে গিলতে আরম্ভ করলে।
নন্দ— ওরে ও কৃষ্ণ, ও কৃষ্ণ, এই মহাসর্প আমাকে গ্রাস করছে,আমার জীবন বিপন্ন,বাবা আমায় উদ্ধার কর।
এই কথা বলে তিনি ভয়ানক চীৎকার করে উঠলেন, তাঁর চীৎকারের শব্দে নিদ্রিত গোপগণ সকলে জেগে উঠলেন, নন্দবাবাকে সর্পগ্রস্ত দেখে মশাল দ্বারা সাপকে পোড়াতে লাগলেন। সে ভীষণ সাপ মশালের আগুনে পুড়তে লাগলো তবু নন্দবাবাকে ছাড়লো না ৷
ব্রজনাথ, তুমি দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গোপমণ্ডলীর মশাল দিয়ে সাপ পোড়ান দেখছিলে; সাপ যখন কিছুতেই ছাড়লো না,তখন তুমি এসে সাপের মাথায় এক লাথি মারলে ৷ আশ্চর্য্য ব্যাপার! তোমার চরণ স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গে সর্প দেহত্যাগ করে বিদ্যাধরবন্দিত এক জ্যোতির্ম্ময় পুরুষদেহ ধারণ করে তোমার চরণতলে লুটিয়ে পড়লেন ৷
তুমি— তুমি কে? উত্তম জ্যোতির্ম্ময় রূপধারণ করত শোভা পাচ্ছ৷ অদ্ভূত দর্শন! কেন অবশভাবে এমন নিন্দিত সর্পযোনি পেয়েছিলে?
জ্যোতির্ম্ময়পুরুষ— হে প্রভো,আমি সুদর্শন নামক গন্ধর্ব্ব, আমার রূপসম্পত্তি ও কমলার কৃপা আমার প্রতি যথেষ্ট ছিল ৷ তার জন্য আমার নিরতিশয় গর্ব্ব উপস্থিত হয়৷ আমি একদিন বিমানে চড়ে গর্ব্ব ভরে বেড়াতে বেড়াতে অঙ্গিরাবংশম্ভূত কতকগুলি তপোবলসম্পন্ন বিকৃতদর্শন মুনিগণকে উপহাস করেছিলাম। তাঁরা “তুই সর্প হ” বলে অভিশাপ দেন। সে শাপ নয়,শাপের আবরণে পরম কৃপাই তাঁরা করেছিলেন,তজ্জন্য আমি আপনার চরণ স্পর্শ পেলাম ও তার দ্বারা জন্ম-জন্মান্তর কৃত সমস্ত পাপরাশি বিধৌত হয়ে গেল। তারপর সুদর্শন তোমায় প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করে স্বর্গে চলে গেলেন। নন্দবাবার বিপদ চলে গেল।
শ্রীশ্রীব্রজনাথলীলামৃতলহরী | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী 🍁
(বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)
🍂ফিরেপড়া | কবিতা
শক্তি চট্টোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

‘তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো’
তোমার বুকের পাশে শুয়ে থাকবে বিপুল আক্রোশে
স্তনদুটি শঙ্খনাদ করে উঠবে ঘুমন্ত কামড়ালে,
নাভীগর্ভে আঙুলের রক্ত ও প্রপাত পড়বে ঝরে—
এ-বয়েসে সব কাজ করতে পারি প্রেমে ও সম্মোহে।
বিদায় নেয়ার আগে বলে যেও অধরে চুম্বন
বারবার ভিক্ষা করি, আমাকে জাগাও নিরুপমা—
আমাকে জাগাও আর গ্লানি দিও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে,
এ-বয়েসে ভিক্ষাবৃত্তি কেবল আমাকে শোভা পায়!
জানি না বলেই আসি, নিকটেতে স্বজন রয়েছে।
তারি মধ্যে রং খেলা এ-বয়েসে সমূহ মানায়,
তোমার চুম্বনরসে মদ্যপান করি,
মুহূর্তে শতাব্দী কেটে যায়।
যাবার সময় ব’লো ফিরে আসবে শুকতারা হ’লে
সন্ধ্যার বিপুল ছায়া ভাঙে এসে পশ্চিমী দরজায়;
যাবার সময় বলি, ক্লেদ মরে হিংসার দু’পাশে,
আমি ব্যগ্রতম হাতে তোমাকে সাজাই—
দাঁড়াও, আশিনখে ভিক্ষা দাও, নিস্তব্ধতা থেকে
তোমার সন্তান আমি দিয়ে যাবো, দ্বিরুক্তি করবো না।
পূর্ণেন্দু পত্রী -এর একটি কবিতা

বিষন্ন জাহাজ
আমরা যেখানে বসেছিলাম
তার পায়ের তলায় ছিল নদী
নদীতে ছিল নৌকা
আর দূরে একটা বিষন্ন জাহাজ।
আমি যখন তোমার
তুমি যখন আমার ঠোঁটে বুনে দিচ্ছিলে
যাবজ্জীবনের সুখ
ঠিক সেই সময়ে ডুকরে কেঁদে উঠল জাহাজটা
ভোঁ বাজিয়ে।
তারপর থেকে রোজ
আমাদের যাবজ্জীবন সুখের ভিতরে
একটু একটু করে ঢুকে পড়ছে সেই বিষন্ন জাহাজ
তার সেই ভয়ঙ্কর আর্তনাদ বাজিয়ে।
মণীন্দ্র গুপ্ত -এর একটি কবিতা

অশ্রু
পাখির মরণ যখন ঘনিয়ে আসে
তখন তার ডাকের মধ্যেও ব্যথা ফুটে ওঠে।
মাঠের কাকতাড়ুয়ারাও তা বোঝে, সারা রাত তাদের হাঁড়িমাথায়
শিশির পড়ে পড়ে ভোরবেলায় চোখ ভিজে উঠেছে।
হেমন্তের ঘন কুয়াশার মধ্য দিয়ে তারা দেখে– কৃষক
আসছে, গরু আসছে। ওদের চুনে আঁকা চোখ কি শেষ
পর্যন্ত আমার জ্যান্ত চোখের চেয়েও অনুভূতিপ্রবণ হল!
আমার কেউ আসেও না, যায়ও না।
রাত্রে গোরের থেকে যারা ওঠে তাদের কান্না কে শুনেছে!
যাবার আগে, আমার শেষ সান্ধ্যভোজের শক্ত
পাঁউরুটিটুকু অন্তত যাতে ভেজে,
আমি সেইটুকু চোখের জলের অপেক্ষায় আছি।
ভাস্কর চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

আঁধার বিষয়ে
যে বিকেলে জ্বর আসে সেই বিকেলের মতো
তুমি এসে দাঁড়িয়ে রয়েছো।
ঘড়ির ভেতর দিয়ে রক্তের রেখার মতো সময় চলেছে।
আমি কি অসুখ থেকে কোনোদিন উঠে দাঁড়াব না?
আজো রাত জাগাজাগি হয়। শরীর মিলিয়ে যায় নরম শরীরে।-আমি শুধু আমার পৃথিবী দেখে যাই…।
চারপাশে কেমন হাজারো আলো জ্বলে আছে,তবু এমন আঁধার আমি জীবনে দেখিনি।
নবারুণ ভট্টাচার্য -এর তিনটি কবিতা

আমাকে দেখা যাক বা না যাক
আমি যখন পথ থেকে গলিতে তাড়া খেতে খেতে দৌড়ই
আমার পায়ের তলায় হাইওয়ে, আলপথ সব ফুরিয়ে যায়
তখন আমার সামনে আশ্রয় হয়ে ওঠে কে
এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে
আমার ওপরে অনেক অত্যাচার করতে হবে
এত অত্যাচার করার ক্ষমতা, দুর্ভাগ্যবশত,
কোনো শোষক, নিপীড়ক বা রাষ্ট্রমেশিন এখনও জানে না
যখন জানবে
তখন আমার প্রশ্নের সংখ্যাও অনেক বেড়ে যাবে
আমি প্রশ্নগুলোকে ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগোতেই থাকব
আমাকে দেখা যাক বা না যাক
প্রশ্নগুলো ফেটে অনেক সপ্তর্ষিমণ্ডল আকাশে দেখা যাবে।

কালবেলা
যুবকেরা গেছে উৎসবে
যুবতীরা গেছে ভোজসভায়
অরণ্য গেছে বনানীর খোঁজে
গরীব জুটেছে শোকসভায়।
গয়নারা গেছে নীরব লকারে
বন্যপ্রাণীরা অভয়ারণ্যে
বিমান উড়েছে আকাশের খোঁজে
গরীবরা শুধু হচ্ছে হন্যে।
পুরুষেরা গেছে নিভৃত মিনারে
গর্ভবতীরা প্রসূতিসদনে
কুমিরেরা গেছে নদীর কিনারে
গরীব জমছে নানা কোণে কোণে।
বিপ্লব গেছে নেতাদের খোঁজে
যুবকেরা গেছে উৎসবে
যুবতীরা গেছে বিশিষ্ট ভোজে
গরীবের হায় কী হবে?
ভাবনার কথা
একটা রুটির মধ্যে কতটা খিদে থাকে
একটা জেল কতগুলো ইচ্ছেকে আটকে
রাখতে পারে
একটা হাসপাতালের বিছানায়
কতটা কষ্ট একলা শুয়ে থাকে
একটা বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যে
কতটা সমুদ্র আছে
একটা পাখি মরে গেলে কতটা
আকাশ ফুরিয়ে যায়
একটা মেয়ের ঠোঁটে কতগুলো চুমু
লুকোতে পারে
একটা চোখে ছানি পড়লে কতগুলো আলো
নিভে আসে
একটা মেয়ে আমাকে
কতদিন অচ্ছুৎ করে রাখবে
একটা কবিতা লিখে কতটা হট্টগোল বাধানো যায়
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
৩২.
প্রথম স্পর্শের আগে যে আলো জন্মায়
শীত আরও নেমেছে। ভোরের কুয়াশা এখন একটু ঘন, রোদ উঠতে দেরি হয়, আর উঠলেও তার তাপ যেন কাঁচের ভেতর দিয়ে আসে স্পর্শহীন, দূরবর্তী। এই সময়টায় পৃথিবীটাও একটু ধীর হয়ে যায়। বেল্লার ভেতরেও যেন সেই ধীরতা নেমে এসেছে, তবে তা নিস্তেজ নয়, বরং এক অদ্ভুত প্রস্তুতির মতো। সে এখন নিয়মিত লিখছে। খাতার পাতা ভরে উঠছে ভাঙা বাক্য, অসম্পূর্ণ কবিতা, প্রশ্ন, স্বীকারোক্তি, আর মাঝে মাঝে কিছু অদ্ভুত শান্ত লাইন। আগে যে শব্দগুলো তাকে ভয় দেখাত, এখন সেগুলোই তার কাছে আশ্রয় হয়ে উঠছে। তবু সবকিছু সম্পূর্ণ হয়নি। ভিতরে এখনও ফাঁক আছে, একটা নির্জন জায়গা, যেখানে সে নিজেই পুরোপুরি ঢুকতে পারেনি। সেই ফাঁকটাই একদিন অন্যভাবে আলো পেল। সেদিন স্কুলে লাইব্রেরি পিরিয়ড। সাধারণত এই সময়টা বেল্লা চুপচাপ একটা কোণে বসে বইয়ের পাতা উল্টানো
—পড়ার চেয়ে বেশি, লুকোনোর জন্য। লাইব্রেরির ভেতরে একধরনের নীরবতা থাকে, যা আরামদায়ক, আবার কখনো কখনো আরও বেশি একা করে দেয়। সে সেদিনও একটা বই হাতে নিয়ে জানালার পাশে বসেছিল। বাইরে শিরিষ গাছের পাতা নড়ছিল, রোদ কাঁচে লেগে নরম হয়ে আসছিল। হঠাৎ পাশের টেবিলে কেউ বসার শব্দ।
বেল্লা চোখ তুলল না। কিন্তু একটু পরেই একটা কণ্ঠ, “এই বইটা তুমি পড়েছ?” সে তাকাল।
কথাটা তার ভিতরে ঢুকে গেল। সে বুঝল, সৌন্দর্য অন্যের চোখে তৈরি হয় না, কিন্তু অন্যের চোখ তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে দেয়। সেদিন বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে দেখল। অনেকক্ষণ। প্রথমবার। তার মনে হল, সে খারাপ নয়। সে অসম্পূর্ণ, কিন্তু অসম্পূর্ণতাও একধরনের সৌন্দর্য।
ছেলেটা দাঁড়িয়ে। লম্বা, একটু রোগা, চোখে অদ্ভুত স্বচ্ছতা। চুল এলোমেলো, কিন্তু তাতে অগোছালো লাগছে না, বরং স্বাভাবিক। হাতে একটা বই। বেল্লা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
—“না।”
—“পড়লে ভাল লাগবে।”
কথাটা বলেই ছেলেটা বসে পড়ল। কোনো বাড়তি ভদ্রতা নেই, আবার রুক্ষতাও নয়। যেন সে জানে, এই ধরনের কথোপকথনে অতিরিক্ত শব্দের প্রয়োজন নেই। বেল্লা আবার বইয়ের দিকে তাকাল, কিন্তু পড়ছিল না। তার মন অন্যদিকে চলে গেছে। কিছুক্ষণ পর ছেলেটা নিজেই বলল, “আমি ঋত্বিক।”
বেল্লা একটু দেরি করে বলল, “বেল্লা।”
নামটা বলার পর তার মনে হল, এই প্রথম সে নিজের নামটা এমনভাবে উচ্চারণ করল, যেন সেটা তার নিজেরই। ঋত্বিক বেশি কথা বলে না। কিন্তু তার নীরবতায় অস্বস্তি নেই। বরং একটা জায়গা আছে, যেখানে অন্য কেউ এসে বসতে পারে। সেদিন লাইব্রেরির সেই ছোট্ট পরিচয়ের পর, তারা আলাদা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই আলাদা হওয়াটা সম্পূর্ণ হয়নি। কিছু একটা থেকে গেল, একটা অসমাপ্ততা, যা আবার দেখা হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। পরের দিন টিফিনে মিতা বলল, “তোর সঙ্গে কে কথা বলছিল রে কাল?”
বেল্লা অবাক, “কে?”
—“ওই ছেলেটা… নতুন এসেছে নাকি?”
বেল্লা হেসে ফেলল অল্প।
—“জানি না।”
সে জানে না সত্যিই। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করছে। কয়েকদিন পর আবার দেখা। করিডোরে। ঋত্বিক নিজে থেকে বলল, “তুমি কবিতা লেখো?”
বেল্লা থমকে গেল,
“কেন?”
“তোমার খাতায় দেখেছিলাম… কিছু লাইন।”
তার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। তার লেখা, যা এতদিন গোপন, কেউ দেখেছে! “ওগুলো কিছু না…”
ঋত্বিক মাথা নাড়ল, “সবকিছুই কিছু।”
এই কথাটা বেল্লার ভিতরে গিয়ে রইল। এরপর থেকে তাদের দেখা হতে থাকে, ইচ্ছে করে না, তবু হয়ে যায়।
লাইব্রেরিতে, করিডোরে, সিঁড়ির ধাপে। কথা খুব বেশি নয়। কিন্তু প্রতিটি কথার মধ্যে একটা মনোযোগ থাকে।
ঋত্বিক কখনও তার শরীরের দিকে তাকায় না। এই না-তাকানোটা বেল্লার কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি। সে প্রথমবার অনুভব করে কেউ তাকে দেখছে, কিন্তু মাপছে না।
একদিন বিকেলে স্কুলের পর তারা মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সূর্য নামছে, আলো নরম। ঋত্বিক বলল, “তুমি সবসময় এত চুপ কেন?”
বেল্লা একটু ভেবে বলল, “বলতে পারি না।”
—“কাকে?”
—“নিজেকেই।”
ঋত্বিক হাসল না। মাথা নেড়ে বলল, “তাহলে লিখো।”
বেল্লা তাকাল,
—“লিখি।”
—“তাহলে বলছ তো।”
এই সহজ কথাটা যেন তার ভিতরের একটা গিঁট আলগা করে দিল। সেদিন বাড়ি ফিরে সে লিখল, “আজ কেউ আমাকে প্রশ্ন করেনি, আজ কেউ আমাকে মাপেনি, আজ কেউ শুধু শুনেছে, আমার নীরবতা।”
তার মনে হচ্ছিল, এই লেখা অন্যরকম।এখানে ভয় কম, উষ্ণতা বেশি। দিনগুলো বদলাতে শুরু করল। বেল্লা এখন স্কুলে যেতে ভয় পায় না আগের মতো। সে জানে, কোথাও একটা জায়গা আছে, যেখানে সে স্বাভাবিক হতে পারে।
ঋত্বিকের সঙ্গে তার কথা বাড়ে না, কিন্তু গভীর হয়। একদিন ঋত্বিক বলল, “তুমি হাসলে ভালো লাগে।”
বেল্লা অবাক, “আমি হাসি?”
—“হাসো, কিন্তু নিজেই টের পাও না।”
এই কথাটা শুনে সে প্রথমবার নিজের হাসিটাকে খেয়াল করল। ধীরে ধীরে তার ভিতরের ভয়গুলো জায়গা ছাড়তে শুরু করল। পুরোপুরি নয়, কিন্তু একটু একটু করে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে এখন বেশি সময়।
নিজেকে দেখে, আগের মতো ঘৃণা নয়, কৌতূহল নিয়ে।
তার মনে হয়, এই শরীরটাই তো তাকে এখানে এনেছে, এই অনুভূতির কাছে, এই আলোর কাছে।
একদিন মিতা জিজ্ঞেস করল, —“তোর কী হয়েছে বল তো?”
—“কিছু না।”
—“মিথ্যে বলিস না। তুই বদলে গিয়েছিস।”
বেল্লা চুপ করে রইল। সে জানে, এই বদলটা ভাষায় ধরা যায় না। ঋত্বিকের সঙ্গে একদিন লাইব্রেরির পেছনের উঠোনে বসে ছিল তারা। চারপাশে কেউ নেই। শিরিষপাতা পড়ছে। ঋত্বিক বলল, “তুমি নিজেকে খুব কষ্ট দাও, তাই না?”
বেল্লা চমকে উঠল, “কেন বলছ?”
—“চোখে দেখা যায়।”
এই কথাটা শুনে তার বুক ভরে উঠল। কারণ এই প্রথম কেউ তার ভিতরের কষ্টটাকে চিনল। সে ধীরে বলল,
—“আমি ঠিক নই।”
ঋত্বিক বলল, “ঠিক না হওয়াটাই ঠিক।” এই উত্তরটা এত সহজ, তবু এত গভীর, সে কিছু বলতে পারল না।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে লিখল,
“আমি প্রথমবার নিজেকে মাপা বন্ধ করেছি, কারণ কেউ আমাকে মাপেনি। আমি প্রথমবার নিজেকে ছুঁয়েছি, কারণ কেউ আমাকে আঘাত করেনি।” প্রেম ঠিক কখন শুরু হয়, তা বোঝা যায় না।
কোনো ঘোষণা নেই, কোনো মুহূর্ত নেই। কিন্তু একদিন বেল্লা বুঝল, সে অপেক্ষা করছে। ঋত্বিকের জন্য।
স্কুলে গিয়ে চোখ খুঁজে তাকে। দেখা হলে অদ্ভুত শান্তি। এই অনুভূতি তার নতুন। ভয়ের সঙ্গে মিশে থাকা আনন্দ।
একদিন ঋত্বিক বলল, “চলো, একটু হাঁটি।”
তারা স্কুলের বাইরে রাস্তা ধরে হাঁটল। কথা কম, নীরবতা বেশি।
হঠাৎ ঋত্বিক বলল, “তুমি জানো, তুমি খুব সুন্দর?”
বেল্লা থেমে গেল। এই শব্দটা সে আগে শুনেছে,
কিন্তু এইভাবে নয়। সে বলল,
—“না…”
ঋত্বিক শান্তভাবে বলল, “তুমি জানো না, তাই।” এই কথাটা তার ভিতরে ঢুকে গেল। সে বুঝল, সৌন্দর্য অন্যের চোখে তৈরি হয় না, কিন্তু অন্যের চোখ তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে দেয়। সেদিন বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে দেখল। অনেকক্ষণ। প্রথমবার। তার মনে হল, সে খারাপ নয়। সে অসম্পূর্ণ, কিন্তু অসম্পূর্ণতাও একধরনের সৌন্দর্য।
রাতে খাতায় লিখল, “আজ আমি নিজেকে একটু ভালবেসেছি, কারণ কেউ আমাকে ভালোবেসেছে। আজ আমি নিজেকে ভয় পাইনি, কারণ কেউ আমাকে ভয় দেখায়নি। প্রেম তার ভিতরে ঢুকে গিয়েছে, নিঃশব্দে, ধীরে, কিন্তু গভীরভাবে। এটা কোনও উত্তেজনা নয়, কোনো নাটকীয়তা নয়। এটা একধরনের নরম আলো, যা তার ভিতরের অন্ধকারকে পুরো মুছে দেয় না, কিন্তু তাকে দৃশ্যমান করে। বেল্লা এখন জানে, তার যন্ত্রণা শেষ হয়নি। কিন্তু সে আর একা নয়।
তার পাশে আছে একজন, যে তাকে মাপে না, শুধু দেখে। আর এই দেখা, এই স্বীকৃতি, এই অনুভূতিই তার জীবনের প্রথম পূর্ণতা। 🍁 (ক্রমশঃ)
🍂কবিতা
বিকাশ সরকার -এর একটি কবিতা

আবাদ
দুপুরের রোদে তেতে তুমি একাকী কোথায় যাও
বাতাসে কি জলের স্পর্শ? সোঁদা গন্ধ পাচ্ছো আজ বনে?
এই যে এক আলপথ ধরে, তুমি তো আবাদি জমিন
চারাগাছ বলো কবে উঠেছিল খুব সঙ্গোপনে
যাও, আমি তো এক খড়ের গাদায় পোড়া মাটির মানুষ
জলাজঙ্গলে থাকি, আমার শরীরে কত পাঁক
তোমারও তো কষ্ট ছিল জানি, ফুলে ওঠা ঠোঁট
এখন, এতদিন পর, সেসব শোকের কথা তবে থাক
আবাদে আনন্দ ছিল, রোমাঞ্চ ছিল কত দীর্ঘ আলিঙ্গনে
এখন তেতে ওঠা রোদের ভিতর শুধু বাজে দীর্ঘশ্বাস
আমি একা বসে থাকি রোপিত চারার মতো কাত হয়ে
ফলন হলো না, জমিজুড়ে জেগে ওঠে আদিগন্ত ঘাস
প্রতিমা রায় বিশ্বাস -এর একটি কবিতা

নিরক্ষর
খেজুর গাছের মুখে
একটা থার্মোমিটার।
শীতের তাপমাত্রায়
ঠিলেতে জমা হয় পারদ,
লাল জল কিংবা গুড়…
অন্ধ খেজুর গাছের মুখে
আমার খুব ইচ্ছা করে
দুটো চোখ এঁকে দিতে।
দীপান্বিতা রায় সরকার -এর তিনটি কবিতা

দূরে থাকা
দূরে থাকা তো ছেড়ে থাকা নয়,
জুড়ে থাকা মন আকাশে।
রোজ রোজ রঙ হচ্ছে গাঢ়
বুকে রাখা ক্যানভাসে।
ঘিরে রাখাও তো ছুঁয়ে থাকা নয়,
দ্বীপ তো একাকী ভাসে।
জলজ অভিধানে নেই ডাক নাম
সহজাত সন্ন্যাসে।
ঘুরে থাকা মানে চোখাচোখি নয়,
চোরা স্রোত মাঘ মাসে।
ধূপের মতন পোড়া পোড়া বুক,
সুবাসিত বনবাসে।
উড়ে যাওয়া মানে পরিযায়ী নয়,
ফিরে ফিরে কেউ আসে।
চোখের আড়াল হয়েও,
হৃদয়ের পাশে পাশে…

সব প্রেম তোর
নির্যাসে বিষটুকু চুষে রাখি
বাকি টুকু তোর,
কালো কালো ছায়াপথ চারপাশে
তোর ফুটফুটে ভোর।
পোড়া রাজপথ, উষ্ণ প্রখর
ছায়া ছায়া পথ তোর,
সহচর সংগ্রামে অগুনতি ক্ষত রেখেও
বুকেজমেছে আদর…
আজ সব প্রেম তোর।
যেটুকু গান, ছোঁয়নি অকাল…
যেটুকু সুবাসিত হোম,
যেটুকু ছুঁয়ে পূর্ণতা বুঝি,
যে উত্তাপে গলে যায় মোম।
সেটুকু দিয়েই সাজিয়ে তুলেছি,
সেই জৌলুশ তোর।
সেঁজুতির শিখাতে তমশা কাটিয়ে
দু’চোখে লেগেছে ঘোর,
আজ সব প্রেম তোর।

ডুব
সাঁতরে ওঠার স্পৃহা ছিল বরাবরই
জলকে তবে কীসের ছলে ভোলা?
বিন্দু লহর দক্ষ ছিল তটে
ঢেউয়ের সাথে অসীম বোঝাপড়া।
ডুবতে গেলেই জল বুঝেছে যে’বা
দ্বৈরথে তার সঙ্গ অভিসারে,
ইচ্ছে ছিল ভাসতে ভাসতে খোঁজা…
ডুবতে চাওয়ার নতুন কোনও মানে।
সোমাশ্রী সাহা -এর একটি কবিতা

অধিকার
এখন আর গন্ধ আসে না নাকে
এককোণে ঝরে পড়ে আছে
জুঁই ফুল…
ফুল তো অনন্তকাল ঝরবে এভাবেই
এক্ষুনি কে ওই কাক
ছোঁ দিয়ে নিয়ে গেল
পড়ে থাকা ফুলের গন্ধ ও কাঁটা
কাকেরা এভাবেই অভ্যস্ত
গণ্ডি ভেঙে দিতে
কিছু কিছু জিনিস তো ছিনিয়েই নিতে হয়
তোমার তা মনে হয় না?
সানি সরকার -এর একটি কবিতা

পর্দা অথবা সৌধ
এইবার মৌন সৌধ থেকে নেমে এসো
আসতেই হবে আজ হোক কাল হোক। এসো
ধরা যাক আর তো মুহূর্তকাল মাত্র, যজ্ঞের অগ্নি থেকে
বেরিয়ে আসবেন একজন জলের ঈশ্বর-ঈশ্বরী
আমরা মাদল বাজাতে বাজাতে সরিয়ে ফেলব
অভিমান ও গ্রীষ্মের তেড়েফুঁড়ে ওঠা কর্কটরেখা…
আমারা দেখব মোড়ক থেকে ঝাঁকঝাঁক
সাদা পায়রাদের মুক্ত করবেন ঈশ্বর-ঈশ্বরী
অতঃপর পরিক্রমণ—-
হাসতে হাসতে কাঁদতে কাঁদতে
পর্দার ওপারে চলে যাবেন ক’য়েক দল ছায়া-মানুষ
এবং আমরা আমাদের উত্তর প্রজন্মের কাছে
খুলে দেব অন্ধকার দিনের ঐতিহাসিক চালচিত্র
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস | ২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা
মমতা রায় চৌধুরী
১৯.
সুনয়নাদি
অসহ্য গরমে অলরেডি স্কুলের টাইম চেঞ্জ হয়েছে সরকারি নির্দেশিকা মেনে মর্নিং স্কুল শুরু হয়েছে। আর মর্নিং স্কুল শুরু হওয়াতে কে কাজে আসছে কিনা আসছে সেটা তিথির পক্ষে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। তিথি ভোর চারটে উঠে ওদের ভরসা না করে যতদূর সম্ভব বাড়িতে যারা থাকে তাদের খাবারের ব্যবস্থাটা অন্তত নাস্তাটা করে রেখে যায়। নইলে বয়স্ক শাশুড়ি মা ওদিকে পুচু,বুবুন পবিত্র সবার অসুবিধা হবে তবে একদিক থেকে ভালো হয়েছে। সারাটা দিন থাকতে পারে, আর পবিত্রর বেলার দিকে অফিস। অসুবিধা হয় না শুধু কাজের লোক কাজে না আসলে অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। আর এই সুযোগটা আজকাল সোমাদি গ্রহণ করেছে।
তিথি বুঝল ওর একটা কাজের দরকার। পবিত্র বলছিল যে, ও একটা বাড়িতে কাজ করে তাহলে ওকি সেখানে কাজ করছে না!
—তুমি আসতে পারবে?
—হ্যাঁ, পারব।
—ও বৌদি তোমাদের বাড়িতে আমাকে একটা কাজ দেওয়া যায় না?
যেমন আজই সোমাদি না বলে কয়ে কামাই। আর সুইটি তো ভীষণ প্রফেশনাল ও এমনি শুনিয়ে রেখেছে কাজের লোক দেখতে। এই মুহূর্তে কাজের লোক খুঁজতে যাওয়াও কঠিন ব্যাপার। স্কুল থেকে এসে যেন তিথি চোখে সরষে ফুল দেখছে। কোনটা আগে করবে কোনটা পরে পরে করবে মাথাই কাজ করছে না তার মধ্যে তো মনের ভেতরে ভীষণভাবে আগ্নেয়গিরির পাহাড় জ্বলছে তিথি ভেবেই নিয়েছে এবার আসলে সোমাদিকে আচ্ছা ঝাড় ঝাড়বে। কাজ করতে করতে হঠাৎ কলিং বেলের আওয়াজ হরি হরায়ে নম কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ। শাশুড়ি মা বারান্দা থেকে বললেন,
—ও বৌমা বৌমা।
—হ্যাঁ, কি বলুন।
—কে আসলো?
—জানি না।
—দরজা খোলনি।
—না, এই যাচ্ছি।
—ও আচ্ছা।
দরজা খুলে ভুত দেখার মত দেখলো তিথি।
তিথি ঠিক দেখছে তো?
একি চেহারা হয়েছে সুনয়নার!
চুলগুলো উস্কো-খুসকো আরও রোগা হয়েছে চোখগুলো অনেক কোঠরে পৌঁছে গিয়েছে। অথচ চোখের দিকে তাকালেই মনে হয় যেন ওই গোপন কুঠিরে অনেক রহস্য জমাট বেঁধে আছে। কুয়াশার জন্য অন্ধকার কিন্তু উজ্জ্বল আলো প্রবেশ করলেই সেই কুয়াশার অন্ধকার নিমিষে কেটে যাবে।
—কীব্যাপার সুনয়না তুমি? অপ্রত্যাশিত আশাতে উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল তিথি।
এই আসলাম একটু তোমার কাছে।
—তা বেশ এসো।
একটুতেই যেন হাঁপাচ্ছে শরীরে যেন জোর নেই।
—বসো।
কোনও রকমে এসে বসল।
তিথি রান্নাঘরের থেকে চা এনে দিল। বলল,
—চা খাও।
—না বৌদি চা খাব না।
—কেন?
মাথা নিচু করে আছে
তিথির মনে হল যেন ও-লজ্জা পাচ্ছে একটু ইতস্তত করছে কিন্তু খাবার ইচ্ছেটা আছে।
তিথি দুটো রুটি আর আলু চচ্চড়ি এনে দিল, সঙ্গে একটা মিষ্টি।
—নাও এগুলো খাও।
—এ বাবা একি করছ বৌদি?
—কী করলাম?
—এত খাবার দিলে আমি খাব না গো খেয়ে এসেছি।
—ভাল করেছ খেয়েছ। কখন খেয়েছ তার ঠিক ঠিকানা নেই।এই তো এইটুকুন খাবার। খেয়ে নাও তো তোমার শরীর এখন খাবার দরকার।
ওর চোখ দুটো জলে ভিজে গেল। তিথি বুঝল একটু সহানুভূতি, সমবেদনা চায় হয়ত পরিবার থেকে সেটাই পাচ্ছে না এই মুহূর্তে ওর বাচ্চাটাকে হারিয়েছে তারপর যদি আবার আগের মতো ওর উপর মেন্টালি টর্চার হয় ভেতরে ভেতরে যেন অনেক ভেঙ্গে পড়েছে। তিথি বাসনগুলো মাজতে বসল। সুনয়না দেখতে পেয়ে ছুটে গিয়ে তিথির কাছ থেকে কেড়ে নিল তারপর নিজেই মাজতে লাগল এবং বলল,
—বৌদি আমি রয়েছি তুমি মাজবে কেন?
—না না সে কি কথা তুমি তো আজকে আমার বাড়ির অতিথি।
—না বৌদি এভাবে ব’লো না। সব সুখ,সব ভালবাসা সহ্য হয় না আমাদের। বুবুন কোথায় বৌদি?
স্কুল থেকে আজকে ফেরেনি, দেরি হচ্ছে কেন কে জানে?
—ও!
—না না আমারই ভুল হয়েছে। ওর বাবা চোখে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে ওখান থেকে।
—ও বাবা পুচু কত সুন্দর হয়েছে।
তোমাকে থেকে তো লেজ নাড়ছে গো। আমাকে চিনতে পেরেছে বৌদি। ওরা বেইমান নয় গো
আয় পুচু তোকে একটু আদর করি।
—ও মা চিনতে পেরেছ?
—হ্যাঁ হ্যাঁ চিনতে পেরেছে।
তোমরা ভালই আছ বৌদি, এদের নিখাদ ভালবাসা আর বিশ্বাস চোখে মুখে।
—তুমি একটু বসো, আমি বাকি কাজগুলো গুছিয়ে নিই।
—আমি হাতে হাতে করে দেব।
তিথি বলল,
—তা হয়।
আজকে সোমা কাজে আসেনি
না গো?
—ও প্রায়শই এরকম করছ।
—আমি এই সময়ে এসে তোমার হাতে হাতে কিছু করে দেব।
তিথি বুঝল ওর একটা কাজের দরকার। পবিত্র বলছিল যে, ও একটা বাড়িতে কাজ করে তাহলে ওকি সেখানে কাজ করছে না!
—তুমি আসতে পারবে?
—হ্যাঁ, পারব।
—ও বৌদি তোমাদের বাড়িতে আমাকে একটা কাজ দেওয়া যায় না?
—ও বৌমা কে আসলো গো?
—ওই দেখো আওয়াজ গিয়েছে কানে!
—সুনয়না এসেছে।
—কে এসেছে সুইটি। না না না, সুইটিও আজকে আসলো না।
—-না মা এবার সত্যিই সুইটিকে ছাড়িয়ে দেয়ার দরকার ও নিজেও যখন বলছে লোক দেখে নিতে এভাবে চলা যায় না।
—তাহলে কে এসেছে?
—সুনয়না এসেছে।
রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে উত্তর দিল তিথি।
—সু এসেছে?
—হ্যাঁ।
—আমার কাছে একটু পাঠিও। 🍁(ক্রমশঃ)
🍂কিশোর গল্প
আমিও তাই চাই। ফুলমতী নদীর জলে তখন সূর্যের আলো পড়ছে। ধীরু ধীরে ধীরে সাঁতার কাটছে। ঋতু চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হল, জীবনের সবকিছুই যেন এই নদীর মতো কখনও শান্ত, কখনও পরিবর্তনশীল, কিন্তু নিজের পথ ধরে এগিয়ে চলা। অর্ক বলল চল আজ একটু দৌড় প্রতিযোগিতা করি। ঋতু হেসে বলল, ধীরুর সামনে দৌড়ালে ও-হাসবে।
ফুলমতীর তীরে বন্ধুত্ব

বংশীধর মুখোপাধ্যায়
সবুজে ঘেরা একটি শান্ত গ্রামের নাম ছিল শিউলিপুর। গ্রামটি যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত ছবি। গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর নাম ফুলমতী। এই নদী কখনও শান্ত, কখনও টুপটাপ ঢেউ তুলে গল্প করে চলে। নদীর ধারে কাশফুল দুলত, আকাশে ভেসে বেড়াত সাদা বক আর নীলচে মাছরাঙা। সকালের আলোয় নদী ঝলমল করত, আর বিকেলে তার জল যেন সোনালি হয়ে উঠত। এই গ্রামেই থাকত দু’জন কিশোর-কিশোরী। ঋতু আর অর্ক। ঋতু ছিল কৌতূহলী, সবকিছু জানতে চাইত। অর্ক একটু চুপচাপ, কিন্তু খুব ভাবুক। দু’জনেই একই স্কুলে পড়ত, আর প্রতিদিন স্কুল শেষে তারা ফুলমতী নদীর ধারে এসে বসত।
একদিন বিকেলে, ওরা নদীর পাড়ে বসে ছিল। হঠাৎ ঋতুর চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য। একটা কচ্ছপ ধীরে ধীরে নদীর দিক থেকে উঠে আসছে। ঋতু বলল, কচ্ছপটা দেখছ অর্ক।
অর্ক মাথা নেড়ে বলল হ্যাঁ দেখছি, কচ্ছপটা খুব ধীরে এগোচ্ছিল। তার খোলসটা মাটির মতো রঙের, চোখ দুটো ছোট কিন্তু তীক্ষ্ণ। ঋতু বলল, এটা কি এখানে থাকে।
মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে, আর ধীরু বেরতে পারছে না। ঋতু বলল, তাড়াতাড়ি ওকে বাঁচাতে হবে। অর্ক বলল, সাবধানে করো। তারা খুব যত্ন করে মাটি সরাল। ধীরুকে ধীরে তুলে নিয়ে নদীর একটু নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেল। ধীরু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর ধীরে ধীরে জলের দিকে এগোল। ঋতু বলল, ও বুঝি আমাদের ধন্যবাদ দিচ্ছে।
অর্ক হেসে বলল, হয়ত।
অর্ক বলল হয়ত, নদী থেকেই এসেছে। তারা একটু কাছে গেল। কচ্ছপটা ভয় পেল না, বরং থেমে যেন তাদের দেখছিল। ঋতুর মনে হল, কচ্ছপটা যেন কিছু বলতে চাইছে। পরের দিনও তারা একই জায়গায় এল। আশ্চর্য, কচ্ছপটা আবারও সেখানে। এবার অর্ক একটু হাসল। অর্ক বলল, মনে হচ্ছে ও আমাদের চিনে ফেলেছে
ঋতু বলল তাহলে নাম দিই না, অনেক ভেবে তারা কচ্ছপটার নাম রাখল, ধীরু। ধীরু প্রতিদিনই আসতে লাগল। কখনও নদীর ধারে বসে থাকত, কখনও জলের মধ্যে ঢুকে যেত। ঋতু আর অর্ক ওকে দেখে অনেক কিছু শিখতে লাগল। ধীরু কখনও তাড়াহুড়া করত না। সবকিছু ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে করত। একদিন ঋতু বলল আমি সবসময় এত তাড়াহুড়া করি কেন জানি না।
অর্ক বলল, ধীরুকে দেখলে তো মনে হয় ধীরে চলাই ভাল। ঋতু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, সত্যি, ও তো কখনও ভুল করে না! সেদিন থেকে তারা ধীরুর মতো হতে চেষ্টা করল। পড়াশোনায় মন দেওয়া, কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত থেমে না যাওয়া, এইসব অভ্যাস গড়ে উঠতে লাগল। কিন্তু একদিন বড় বিপদ ঘটল। গ্রামে খবর এল, ফুলমতী নদীর পাশে একটি নতুন রাস্তা তৈরি হবে। সেই জন্য অনেক জায়গা পরিষ্কার করা হবে। নদীর ধারের ঝোপঝাড়, গাছপালা কেটে ফেলা হবে। ঋতু দৌড়ে অর্কের কাছে গেল। ঋতু বলল, ধীরুর কী হবে?
অর্ক বলল, জানি না কিন্তু কিছু একটা করতে হবে। তারা দু’জনেই চিন্তায় পড়ে গেল। পরের দিন তারা ধীরুকে দেখতে পেল না। ঋতুর চোখে জল চলে এল। ঋতু বলল, ও কি চলে গিয়েছে!
অর্ক বলল, হয়ত ভয় পেয়ে লুকিয়েছে কোথাও। কী জানি…

ওরা প্রাণপণে খুঁজতে লাগল নদীর ধারে, ঝোপের ভেতর, বালির ওপর। অনেক খোঁজার পর তারা দেখল, ধীরু একটা গর্তের কাছে আটকে আছে। মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে, আর ধীরু বেরতে পারছে না। ঋতু বলল, তাড়াতাড়ি ওকে বাঁচাতে হবে। অর্ক বলল, সাবধানে করো। তারা খুব যত্ন করে মাটি সরাল। ধীরুকে ধীরে তুলে নিয়ে নদীর একটু নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গেল। ধীরু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর ধীরে ধীরে জলের দিকে এগোল। ঋতু বলল, ও বুঝি আমাদের ধন্যবাদ দিচ্ছে।
অর্ক হেসে বলল, হয়ত।
সেদিন তারা একটা বড় সিদ্ধান্ত নিল। তারা গ্রামের বড়দের সঙ্গে কথা বলবে। পরদিন স্কুলে গিয়ে তারা শিক্ষকের কাছে সব বলল। শিক্ষক তাদের কথা শুনে গ্রাম সভায় বিষয়টি তুললেন। অনেক আলোচনা হল। শেষে ঠিক হল, রাস্তা হবে ঠিকই, কিন্তু নদীর ধারের একটি অংশ অক্ষত রাখা হবে, যাতে প্রাণীরা থাকতে পারে। ঋতু আর অর্ক খুব খুশি হল। কয়েকদিন পর তারা আবার ধীরুকে দেখল। এবার সে আগের মতোই শান্তভাবে বসে আছে। ঋতু বলল আমরা পেরেছি অর্ক
অর্ক বলল হ্যাঁ, কিন্তু ধীরুই আমাদের শিখিয়েছে। ঋতু মাথা নেড়ে বলল, ঠিকই। সূর্য তখন ডুবছে। ফুলমতী নদীর জল সোনালি হয়ে উঠেছে। পাখিরা ঘরে ফিরছে। আর ধীরু ধীরে ধীরে জলের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। ঋতু মনে মনে ভাবল, জীবনে তাড়াহুড়া নয়, ধৈর্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। ছোট হলেও একটি প্রাণী অনেক বড় শিক্ষা দিতে পারে। অর্ক বলল, কাল আবার আসব তো
ঋতু হেসে বলল, অবশ্যই।
সেই দিন থেকে ফুলমতী নদীর ধার খেলার পাশাপাশি শেখারও জায়গা হয়ে উঠল তাদের কাছে। ধীরু ছিল তাদের শিক্ষক, ও কথা না বলেও অনেক কিছু বলে দিত।
শিউলিপুর গ্রামের মানুষও বুঝতে শিখল, প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেই উন্নতি করা যায়। নদী, পাখি, গাছ আর ছোট ছোট প্রাণীদের সঙ্গে মিলেই গড়ে ওঠে একটি সত্যিকারের সুন্দর পৃথিবী। আর ঋতু আর অর্ক বড় হতে হতে কখনও ভুলে গেল না সেই কচ্ছপের কথা, যে ধীরে চলেও তাদের জীবনের পথ দেখিয়েছিল।
ফুলমতী নদীর ধারে আবার সবকিছু যেন আগের মতো শান্ত হয়ে ফিরেছিল। কিন্তু ঋতু আর অর্কের মনে নতুন দায়িত্ববোধ জন্ম নিয়েছে। ওরা এখন শুধু নদীর ধারে বসে গল্প করে না, চারপাশটা খেয়ালও রাখে। ধীরু যেন তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। একদিন সকালে অর্ক দৌড়ে ঋতুর বাড়িতে এল।
অর্ক বলল, আজ খুব ভোরে নদীর দিকে গিয়েছিলাম।
ঋতু বলল, এত সকালে কেন?
অর্ক বলল, আবার কিছু লোক নদীর ধারে এসেছে।
ঋতুর মনে হঠাৎ দুশ্চিন্তা জাগল।
ঋতু বলল, তারা কী করছে
অর্ক বলল গাছগুলো মাপছে আর কিছু দাগ দিচ্ছে।
দু’জনেই তাড়াতাড়ি নদীর দিকে ছুটল। গিয়ে দেখল, কয়েকজন লোক গাছের গায়ে লাল রঙ দিয়ে চিহ্ন দিচ্ছে।
ঋতু বলল, আবার কি গাছ কাটবে।
অর্ক বলল, মনে হচ্ছে তাই।
তারা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল। হঠাৎ তাদের চোখে পড়ল ধীরু। সে আগের মতোই ধীরে ধীরে এগোচ্ছে, কিন্তু তার চলার পথে এবার বাধা বেশি। মাটিতে নতুন করে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। ঋতু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তার মনে হল, শুধু একবার বাঁচানো যথেষ্ট নয়। বারবার রক্ষা করতে হবে।
ঋতু বলল, আমরা কী আবার কিছু করতে পারি না?
অর্ক বলল, চেষ্টা তো করতেই হবে।
তারা গ্রামের স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের ডেকে নিল। ক’য়েকজন মিলে ঠিক করল, তারা নদীর ধারের গুরুত্ব সবাইকে বোঝাবে।
সেদিন বিকেলে তারা গ্রামের মাঠে ছোট একটা সভা করল। ঋতু প্রথমে একটু ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু তারপর সাহস করে দাঁড়াল।
ঋতু বলল, আমাদের ফুলমতী নদী না, এটা আমাদের জীবনের বড় অংশ।
অর্ক বলল এখানে পাখি থাকে, মাছ থাকে, ধীরু ও অনেক অনেক প্রাণী থাকে।
তাদের কথা শুনে অনেকেই ভাবতে শুরু করল। একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এসে বললেন, ছোটরা কিন্তু ঠিকই বলছে। পরদিন গ্রামের কয়েকজন মিলে ওই কাজ লোকদের সঙ্গে কথা বললেন। জানা গেল, নতুন একটি প্রকল্পের জন্য জায়গা মাপা হচ্ছে। তবে পুরোটা এখনও ঠিক হয়নি। ঋতু আর অর্ক বুঝল, এখনই সময় কথা বলার।
অর্ক বলল, যদি আমরা সবাই মিলে অনুরোধ করি?
ঋতু বলল, তাহলে হয়ত তারা অন্যভাবে ভাববে।
গ্রামের মানুষজন একসঙ্গে আবেদন করলেন, যাতে নদীর ধারের গাছপালা আর প্রাণীদের ক্ষতি না হয়। কয়েকদিন পর খবর এল, প্রকল্পের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ঋতু খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠল। বলল, দেখলে আমরা পারলাম, আমরা পারলাম।
অর্ক হেসে বলল, ধীরে ধীরে, ঠিক ধীরুর মতো। সেই দিন বিকেলে ঋতু ও অর্ক আবার নদীর ধারে গেল। আকাশে পাখিরা উড়ছে, বাতাসে কাশফুল দুলছে। আর ধীরু, সে আবারও সেই চেনা জায়গায়।
ঋতু বলল, ধীরু আমাদের সব শিখিয়েছে।
অর্ক বলল, হ্যাঁ, কথা না বলেও অনেক অনেক কিছু শিখিয়েছে।
ধীরু এবার একটু জলের ভেতর ঢুকে আবার উঠে এল, যেন তাদের সঙ্গে খেলছে।
ঋতুর মনে হল, এই ছোট্ট প্রাণীটা যেন তাদের বন্ধু, শিক্ষক, আর পথ দেখানোর সঙ্গী।
দিন কেটে যেতে লাগল। ঋতু আর অর্ক বড় হতে থাকল, কিন্তু তাদের অভ্যাস বদলাল না। তারা প্রতিদিনই কিছু না কিছু ভালো কাজ করার চেষ্টা করত। একদিন অর্ক বলল আমরা বড় হয়ে কী হব ভেবেছ?
ঋতু বলল, আমি চাই এমন কিছু করতে যাতে প্রকৃতি রক্ষা পায়
অর্ক বলল, আমিও তাই চাই। ফুলমতী নদীর জলে তখন সূর্যের আলো পড়ছে। ধীরু ধীরে ধীরে সাঁতার কাটছে। ঋতু চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হল, জীবনের সবকিছুই যেন এই নদীর মতো কখনও শান্ত, কখনও পরিবর্তনশীল, কিন্তু নিজের পথ ধরে এগিয়ে চলা। অর্ক বলল চল আজ একটু দৌড় প্রতিযোগিতা করি
ঋতু হেসে বলল, ধীরুর সামনে দৌড়ালে ও-হাসবে। দু’জনেই হেসে উঠল। সেদিন তারা দৌড়াল ঠিকই, কিন্তু শেষে এসে থামল ধীরুর পাশে। যেন বুঝে গেছে, জীবনে শুধু দ্রুত চলা নয়, কখন থামতে হয়, সেটাও জানা জরুরি। শিউলিপুর গ্রাম, ফুলমতী নদী, আর ধীরু কচ্ছপ, এই তিনটিই তাদের জীবনের অংশ হয়ে রইল। আর সেই বন্ধন তাদের শেখাল, ছোট ছোট কাজই একদিন বড় পরিবর্তন আনতে পারে। 🍁

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরে পড়া’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।





