সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন ঘিরে বহুদিনের বিতর্ক, রাজনৈতিক স্মৃতি এবং জমি সংক্রান্ত আশঙ্কার মাঝেই নতুন দিশা দেখানোর চেষ্টা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। এক জনসভা থেকে তিনি শিল্প গড়ার রূপরেখা তুলে ধরে জানান, অতীতের মতো সংঘাতের পথে নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে এবং মানুষের সম্মতি নিয়েই রাজ্যে শিল্পায়ন এগোবে। তাঁর বক্তব্য, ‘নন্দীগ্রামের মতো পরিস্থিতি আর কখনও তৈরি হবে না। শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতেই শিল্প গড়ে তোলা হবে।’ এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তৎপরতা বেড়েছে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ইতিহাসে নন্দীগ্রাম (Nandigram) ও সিঙ্গুর (Singur) এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে সেই সময়ের সংঘাত রাজ্যের রাজনীতিকে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকারের শিল্পনীতি নিয়ে এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী দিনে শিল্প স্থাপনে জমি কোনও বাধা হবে না। ইতিমধ্যেই একাধিক শিল্প প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে, অনেক সংস্থার সঙ্গে কথাবার্তাও এগিয়েছে।’ তাঁর দাবি, রাজ্য সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে, যেখানে বিনিয়োগকারীরা আস্থা নিয়ে এগিয়ে আসবেন এবং শিল্প গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সবরকম সহায়তা পাবেন। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে উঠে আসে আত্মনির্ভর পশ্চিমবঙ্গের কথাও। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই বাংলা নিজস্ব শক্তিতে এগিয়ে যাক। শিল্প ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা হবে।’ তাঁর মতে, নতুন শিল্প প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে, যা সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী টাটা গোষ্ঠী (Tata Group) -এর নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘টাটাকে আবার বাংলায় ফিরিয়ে আনা হবে।’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই সিঙ্গুর প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। কয়েক বছর আগে টাটা মোটরস (Tata Motors)-এর ছোট গাড়ি প্রকল্প সিঙ্গুরে শুরু হলেও জমি সংক্রান্ত বিতর্কের জেরে তা বন্ধ হয়ে যায় এবং সংস্থাটি অন্য রাজ্যে চলে যায়। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানোর আশ্বাস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সিঙ্গুরের মতো পরিস্থিতি আর তৈরি হতে দেওয়া হবে না।’ বাম আমলের শিল্পনীতি নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘শুধু জমি অধিগ্রহণ করলেই শিল্প হয় না। আগের সরকার বহু জায়গায় জমি নিয়েছিল, কিন্তু সেখানে বাস্তবে কাজ এগোয়নি।’ তিনি অভিযোগ করেন, সেই সময় বহু মূল্যবান জমি বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকেছে, যা রাজ্যের উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘নন্দীগ্রামের মতো গুলি চালিয়ে শিল্প আনার চেষ্টা হয়নি, হবেও না। মানুষের সঙ্গে কথা বলে, তাদের আস্থা অর্জন করেই এগোনো হবে।’ এই মন্তব্যে তিনি শিল্পায়নের ক্ষেত্রে জনমতের গুরুত্ব তুলে ধরেন। প্রশাসনের লক্ষ্য হবে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ দূর করা, এমনই ইঙ্গিত দেন তিনি। রাজ্যে শিল্প স্থাপনের জন্য জমির ব্যবহার নিয়েও কড়া অবস্থান নিয়েছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘যে সব সংস্থা শিল্পের নামে জমি নিয়ে ফেলে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জমি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, তা অপচয় হতে দেওয়া যাবে না।’ এই ঘোষণা বিনিয়োগ ও জমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বর্তমানে রাজ্যে শিল্প বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে সরকার। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ। শিল্পায়নের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায় নতুন শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙ্গা হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পায়নকে কেন্দ্র করে এই নতুন অবস্থান রাজ্যের আগামী অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা নিতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন নীতি তৈরি করার যে কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার। পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় শুরু করার লক্ষ্যে সরকারের এই উদ্যোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রে। জমি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এই তিনটি স্তম্ভকে সামনে রেখেই এগোতে চাইছে প্রশাসন। আগামী দিনে এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা সময়ই জানাবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi 12 years PM | বাংলা জয়ের পর দিল্লিতে ‘বেমিসাল বারা সাল’: মোদীর হাতে ঝালমুড়ি তুলে দিলেন শুভেন্দু, প্রধানমন্ত্রিত্বের ১২ বছর ঘিরে এনডিএর বড় বার্তা



