সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ৫ অক্টোবর ২০২৬: পড়াশোনার মান ও পরিকাঠামো নিয়ে কড়া অবস্থান নিল রাজ্য সরকার। চলতি শিক্ষাবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের ২০৫টি বেসরকারি বিএড কলেজে নতুন পড়ুয়া ভর্তির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না (Admission Closed in 205 B.Ed Colleges)। একই সঙ্গে ফার্মাসি, পলিটেকনিক ও আইটিআই (ITI) প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করা হয়েছে। কোথাও সাময়িকভাবে ভর্তি বন্ধ, কোথাও আবার পরিকাঠামোর ঘাটতির কারণে অনুমোদন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, পড়ুয়াদের উপস্থিতি ও পঠনপাঠনের পদ্ধতি খতিয়ে দেখার পর এই সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় (Jagannath Chattopadhyay)।
বাবাসাহেব আম্বেডকর এডুকেশন বিশ্ববিদ্যালয় (Baba Saheb Ambedkar Education University) ইতিমধ্যেই ২০৫টি বেসরকারি বিএড কলেজে ভর্তি সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য, ওই প্রতিষ্ঠানগুলি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। তবে এখনই কলেজগুলির স্থায়ী অনুমোদন বাতিল করা হচ্ছে না। চলতি শিক্ষাবর্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষণ-পদ্ধতির উন্নতি ও পড়ুয়াসংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারলে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে নতুন করে ভর্তির সুযোগ মিলতে পারে। ফলে ২০২৬-২৮ শিক্ষাবর্ষে ওই ২০৫টি কলেজে পড়ুয়া ভর্তি করা যাবে না। বিএড কলেজগুলির বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক পর্যায়ের পরিদর্শন। রাজ্যের বেসরকারি বিএড প্রতিষ্ঠানগুলির প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করতে তিন দফায় পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
প্রথম পর্যায়ের পরিদর্শনের পর ২০২৬-২৮ শিক্ষাবর্ষে ১৫৬টি কলেজকে পড়ুয়া ভর্তির অনুমতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ৪৫১টি কলেজ নির্ধারিত পরিকাঠামো ও শিক্ষার মান সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সেই প্রতিষ্ঠানগুলিকে ২১ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়। পাশাপাশি ঘাটতি পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। এরপর সংশ্লিষ্ট কলেজগুলির কাছ থেকে পাওয়া জবাব খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই ৪৫১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯টি কলেজ পরবর্তী পরিদর্শনের জন্য আর আবেদন করেনি বা পরিদর্শনের পর্যায়ে ফিরে আসেনি। ফলে বাকি ৪৪২টি কলেজের নথি ও বক্তব্যের ভিত্তিতে দ্বিতীয় দফার পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রথম পর্যায়ে যে আধিকারিক বা পরিদর্শকরা নির্দিষ্ট কলেজে গিয়েছিলেন, দ্বিতীয় পর্যায়ে তাঁদের সেই একই প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়নি। কলেজগুলির বাস্তব পরিস্থিতি নতুন করে যাচাই করার জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
দ্বিতীয় দফার পরিদর্শনে ৪৪২টি কলেজের মধ্যে ২৩৭টি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। গত ৪ নভেম্বর ২০২৬-২৮ শিক্ষাবর্ষে ওই ২৩৭টি কলেজকে পড়ুয়া ভর্তির অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাকি ২০৫টি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে পারেনি। তাই তাদের চলতি শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য কলেজগুলিকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং শিক্ষার পরিবেশ ও পরিকাঠামো উন্নত করতে বাধ্য করা। বিএড কলেজের পাশাপাশি ফার্মাসি শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিও সরকারি নজরদারির আওতায় এসেছে। রাজ্যে মোট ১৩৪টি বি-ফার্ম (B.Pharm) ও ডি-ফার্ম (D.Pharm) কলেজ রয়েছে। তার মধ্যে ৩৮টি প্রতিষ্ঠানে চলতি শিক্ষাবর্ষে নতুন পড়ুয়া ভর্তি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফার্মাসি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, শিক্ষক এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ যথাযথ না থাকলে পড়ুয়ারা পেশাগত দক্ষতা অর্জনে সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষার পরিবেশ যাচাই করেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দফতর।
পলিটেকনিক কলেজগুলির ক্ষেত্রেও পরিদর্শনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজ্যে মোট ৭৪টি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানে চলতি শিক্ষাবর্ষে পড়ুয়া ভর্তি বন্ধ রাখা হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, শিক্ষক এবং ল্যাবরেটরির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত মান বজায় না থাকলে পড়ুয়াদের প্রশিক্ষণ ও ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সেই কারণেই পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানগুলির পরিকাঠামো যাচাইয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। আইটিআই প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে আরও কঠোর পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। রাজ্যে মোট ২৬৫টি আইটিআই কলেজ রয়েছে। তার মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো প্রয়োজনীয় মানের না হওয়ায় অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলি আর পড়ুয়া ভর্তি নিতে পারবে না। আইটিআই শিক্ষায় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। নির্দিষ্ট ট্রেড অনুযায়ী যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণকক্ষ, ল্যাবরেটরি ও প্রশিক্ষকের ব্যবস্থা না থাকলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় কাজের দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না। তাই এই প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত ঘাটতিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর দাবি, রাজ্যে শিক্ষার নামে বাণিজ্য ও ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার প্রবণতা আটকাতেই এই পরিদর্শন অভিযান চালানো হচ্ছে। বিএড, ফার্মাসি, পলিটেকনিক ও আইটিআই কলেজগুলির ক্ষেত্রে শুধু অনুমোদন থাকলেই চলবে না, বাস্তবে পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই উচ্চশিক্ষা দফতর এবং কারিগরি শিক্ষা দফতর যৌথভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছে। ৪ নভেম্বর পর্যন্ত পাওয়া পরিদর্শন রিপোর্টের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই একাধিক কলেজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীর বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) বিকাশ ভবনে গিয়ে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রুখতে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছিলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, উপযুক্ত পরিকাঠামো ও কার্যকর পঠনপাঠনের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সেই নির্দেশ অনুসারেই বিভিন্ন কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা, পড়ুয়াদের উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষ, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং শিক্ষণ-পদ্ধতি যাচাই করা হচ্ছে। মন্ত্রীর মতে, এই পদক্ষেপকে কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের ঘাটতি সংশোধন করে শিক্ষার মান বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু, এই সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট কলেজগুলিতে ভর্তি হতে ইচ্ছুক পড়ুয়াদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিএড, ফার্মাসি, পলিটেকনিক ও আইটিআইয়ের মতো পেশাভিত্তিক শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন ও পরিকাঠামো সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কোন কলেজে চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তি বন্ধ রয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠান অনুমতি পেয়েছে এবং কোথায় অনুমোদন বাতিল হয়েছে, তা যাচাই করে তবেই আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিই এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস। রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির উপর নজরদারি বাড়ল। তবে আগামী দিনে কলেজগুলি কত দ্রুত পরিকাঠামোগত ঘাটতি পূরণ করতে পারে, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করে ও পঠনপাঠনের মান উন্নত করে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যে প্রতিষ্ঠানগুলি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারবে, তাদের জন্য পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে ভর্তির পথ খুলতে পারে। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে আরও কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপের মুখে পড়তে হতে পারে।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Education Minister Deepak Barman on teacher recruitment : প্রতি বছর শিক্ষক নিয়োগের আশ্বাস দীপক বর্মনের, কী বলল রাজ্য সরকার?




