সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★. নতুন দিল্লি : বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শিল্পে কর্মসংস্থানের ছবিতে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি সংস্থাগুলি নিজেদের কর্মী কাঠামোতেও বদল আনছে। কোথাও সরাসরি কর্মী ছাঁটাই, কোথাও আবার স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে কর্মীদের। এবার সেই পথেই হাঁটতে চলেছে মার্ক জুকারবার্গের (Mark Zuckerberg) সংস্থা মেটা (Meta)। তবে ফ্রান্সে কর্মীদের সরাসরি চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার পরিবর্তে স্বেচ্ছাবসরের একটি বিশেষ প্রকল্প আনার পরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি। চাকরি ছাড়তে সম্মত হলে কর্মীদের জন্য থাকছে মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ, বেতনের একটি বড় অংশ পাওয়ার সুযোগ এবং পেশাগত পুনর্বাসনের সহায়তা। প্রযুক্তি শিল্পে এআই নির্ভর ব্যবসার প্রসারের মধ্যে মেটার এই উদ্যোগ নতুন করে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লা লেত্র’ (La Lettre)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সে কর্মরত মেটার কর্মীদের জন্য এই স্বেচ্ছাবসর প্রকল্প চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ওই দেশে সংস্থাটির মোট কর্মীসংখ্যা প্রায় ৩০০। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা কার্যকর হলে তাঁদের মধ্যে প্রায় ১০০ জন কর্মী এর আওতায় আসতে পারেন। অর্থাৎ ফ্রান্সে মেটার মোট কর্মীসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে ঘিরেই এই উদ্যোগ। তবে কোন বিভাগ থেকে কতজন কর্মী এই প্রকল্পের সুযোগ পাবেন, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। এই প্রকল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল চাকরি ছাড়ার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেটার প্রস্তাবে কর্মীদের চাকরির প্রতিটি বছরের জন্য ২.১৫ মাসের বেতনের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ কোনও কর্মী যত বেশি বছর ধরে সংস্থায় কাজ করেছেন, তাঁর ক্ষতিপূরণের অঙ্কও সেই অনুপাতে বাড়তে পারে। পাশাপাশি থাকছে ১০ মাসের বিশেষ ছুটির সুযোগ। ওই সময় কর্মীরা তাঁদের মোট বেতনের ৮০ শতাংশ পাবেন বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে চাইছে না মেটা। চাকরি ছাড়ার পর কর্মীরা যাতে নতুন পেশায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, সেই বিষয়েও সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে। পেশাগত প্রশিক্ষণ নেওয়া, অন্য কোনও সংস্থায় কাজের সুযোগ খোঁজা কিংবা নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু কর্মীসংখ্যা কমানো নয়, চাকরি ছাড়তে ইচ্ছুক কর্মীদের পরবর্তী কর্মজীবনের পথ তৈরি করতেও সাহায্য করা। প্রস্তাবিত প্রকল্পে অংশ নিতে আগ্রহী কর্মীদের ৫ নভেম্বরের মধ্যে আবেদন করার কথা বলা হয়েছিল। তবে বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে কোনও কর্মীর চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তের মতো নয়। ফ্রান্সের শ্রম আইন অনুযায়ী, এই ধরনের যৌথ কর্মী হ্রাসের প্রক্রিয়ায় শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন। সেই আইনি কাঠামো মেনেই মেটা উদ্যোগটি বাস্তবায়িত করতে চাইছে। ফলে কর্মী ও সংস্থার মধ্যে আলোচনার পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠনগুলির ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ফ্রান্সে মেটার এই পদক্ষেপ প্রযুক্তি শিল্পে চলতে থাকা বৃহত্তর কর্মী পুনর্বিন্যাসেরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থা কর্মীসংখ্যা কমানো অথবা স্বেচ্ছাবসরের মাধ্যমে সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তনের পথে এগিয়েছে। গুগল (Google) ইতিমধ্যেই পাঁচটি দেশে কর্মীদের স্বেচ্ছাবসরের প্রস্তাব দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, মাইক্রোসফট (Microsoft) আমেরিকা, কানাডা, ভারত ও ব্রিটেনের কর্মীদের জন্য স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রায় ৬০ হাজার কর্মীকে ঘিরে এই উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। উল্লেখ্য, প্রযুক্তি সংস্থাগুলির এই পরিবর্তনের পিছনে অন্যতম বড় কারণ এআই (AI) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। আগে যে ধরনের কাজের জন্য বড় কর্মী বাহিনীর প্রয়োজন হত, তার কিছু অংশ এখন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির সাহায্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে এআই নির্ভর নতুন পরিষেবা, উন্নত কম্পিউটিং ব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তির পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সংস্থাগুলিকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে পুরনো কাজের ধরন ও কর্মী কাঠামো বদলে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর বিভাগে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
মেটার ক্ষেত্রেও সেই প্রবণতা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটি সাম্প্রতিক সময়ে এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও পরিকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮,০০০ পদ তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল মেটা। এরপর মে মাসে প্রায় ৭,০০০ কর্মীকে এআই সংক্রান্ত কাজে পুনর্বিন্যাস করার সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি। অর্থাৎ একদিকে কিছু পদ বিলুপ্ত করার পরিকল্পনা, অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মীদের অন্য দায়িত্বে নিয়োগ করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। আবার, মেটার ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের অঙ্কও যথেষ্ট বড়। ২০২৬ সালে পরিকাঠামো ও ডেটা সেন্টার (Data Center) নির্মাণের জন্য সংস্থাটির সম্ভাব্য মূলধনী ব্যয় ১৩৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে থাকতে পারে। ভারতীয় মুদ্রায় এই অঙ্ক কয়েক লক্ষ কোটি টাকার সমান। এআই পরিষেবা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা, উন্নত সার্ভার এবং তথ্য সংরক্ষণের পরিকাঠামো তৈরি করতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে বলে সূত্রে উল্লেখ।
এআই প্রযুক্তির প্রসারের ফলে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির ব্যবসায়িক অগ্রাধিকারেও পরিবর্তন আসছে। একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিষেবা, বিজ্ঞাপন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ছিল মেটার ব্যবসার প্রধান ক্ষেত্র। ফেসবুক (Facebook), ইনস্টাগ্রাম (Instagram) ও হোয়াটসঅ্যাপের (WhatsApp) মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বিশাল ব্যবহারকারী গোষ্ঠী তৈরি করেছে সংস্থাটি। কিন্তু এখন এআই মডেল, উন্নত কম্পিউটিং ব্যবস্থা ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবার প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান তারা আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। এই পরিবর্তনের ফলে কর্মীদের দক্ষতার চাহিদাতেও বদল আসছে। প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এখন এআই, তথ্য বিশ্লেষণ, ক্লাউড পরিকাঠামো এবং উন্নত সফটওয়্যার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। পুরনো দায়িত্বে থাকা কর্মীদের একাংশকে নতুন বিভাগে স্থানান্তর করা হচ্ছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পদ তুলে দিয়ে স্বেচ্ছাবসরের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে কর্মীদের কাছে নতুন প্রযুক্তি শেখা এবং নিজেদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাড়ছে।
কিন্তু, স্বেচ্ছাবসরের প্রস্তাবকে কর্মীদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য মনে হবে, তা নির্ভর করবে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতির উপর। দীর্ঘদিন ধরে একটি সংস্থায় কাজ করা কর্মীদের কাছে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে প্রযুক্তি শিল্পে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার গুরুত্বও বেড়েছে। তাই মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ থাকলেও প্রত্যেক কর্মী এই প্রকল্পে অংশ নিতে আগ্রহী হবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
ফ্রান্সের শ্রম আইন এই প্রক্রিয়ায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংস্থা নিজের ইচ্ছামতো একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মীদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করতে পারে না। ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা ও নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ফলে মেটার প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কর্মীদের স্বার্থ, সংস্থার পরিকল্পনা এবং শ্রম আইনের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা প্রয়োজন হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আগামী দিনে এআই প্রযুক্তির বিস্তার কি আরও বেশি কর্মসংস্থান সংকোচনের কারণ হয়ে উঠবে? নাকি পুরনো কাজের পরিবর্তে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে? মেটার মতো বড় সংস্থার সিদ্ধান্ত এই বিতর্ককে আরও জোরালো করছে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে ব্যবসার ধরন বদলানো স্বাভাবিক হলেও তার প্রভাব সরাসরি পড়ছে কর্মীদের জীবনে। ফ্রান্সে স্বেচ্ছাবসরের এই প্রস্তাব তাই শুধু একটি সংস্থার অভ্যন্তরীণ কর্মী পুনর্বিন্যাসের ঘটনা নয়, তা বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পে চলতে থাকা বড় পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Aadhaar Card Update Rules: আধারে ঠিকানা-মোবাইল কতবার বদলানো যায়? UIDAI-র নিয়ম জানলে এড়াবেন ঝামেলা




