সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা পর্ষদগুলির কর্মীদের বেতন সংক্রান্ত বিষয়ে বড় পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। সপ্তম বেতন কমিশনের (West Bengal 7th Pay Commission) আওতা বাড়িয়ে রাজ্যের ২৫টি সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত অশিক্ষক কর্মী এবং তিনটি শিক্ষা পর্ষদের কর্মীদের বেতন ও চাকরির শর্ত পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ দফতরের জারি করা নতুন বিজ্ঞপ্তির ফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Calcutta), যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University), বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় (University of Burdwan), উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় (University of North Bengal)-সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হল। একই সঙ্গে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের নিয়মিত কর্মীরাও এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন।
এত দিন সপ্তম বেতন কমিশনের মূল দায়িত্ব ছিল রাজ্য সরকারি কর্মীদের বেতন, ভাতা এবং চাকরির সঙ্গে যুক্ত আর্থিক সুবিধাগুলি পর্যালোচনা করা। নতুন নির্দেশের ফলে কমিশনের কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হল। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অশিক্ষক কর্মীদের পাশাপাশি তিনটি শিক্ষা পর্ষদের নিয়মিত কর্মীদের বর্তমান বেতন কাঠামো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় সুপারিশ তৈরি করতে হবে কমিশনকে। অর্থাৎ, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরের কর্মীদের পাশাপাশি এবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের বেতন সংক্রান্ত বিষয়ও কমিশনের বিবেচনায় আসছে। অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তিতে এই সম্প্রসারিত দায়িত্বের কথা জানানো হয়েছে।
রাজ্যের সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অর্থ দফতরের ২২ জুলাই ও ২৯ জুলাইয়ের দুটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে। কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল রাজ্য সরকারি কর্মীদের প্রচলিত বেতন ও ভাতা কাঠামো পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের জন্য সুপারিশ পেশ করা। এবার নতুন নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষা পর্ষদগুলির নিয়মিত কর্মীদের বিষয়ও সেই পর্যালোচনার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কমিশনকে দ্রুত প্রয়োজনীয় সুপারিশ জমা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, রাজ্য সরকারের তালিকায় থাকা ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আছে কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। পাশাপাশি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় (University of Kalyani), উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (Rabindra Bharati University) -এর কর্মীরাও এই সিদ্ধান্তের আওতায় আসছেন। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় (Vidyasagar University) ও গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ও (University of Gour Banga) রয়েছে তালিকায়। ফলে কলকাতা থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়মিত অশিক্ষক কর্মীদের বেতন কাঠামো এবার একই কমিশনের পর্যালোচনার সুযোগ পাচ্ছে।
এছাড়াও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় (Presidency University), নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (Netaji Subhas Open University), মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (Maulana Abul Kalam Azad University of Technology) ও পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় (West Bengal State University) এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয় (Sidho-Kanho-Birsha University), কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় (Kazi Nazrul University) এবং কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Cooch Behar Panchanan Barma University) নিয়মিত অশিক্ষক কর্মীদের বিষয়ও পর্যালোচনা করবে কমিশন। তালিকায় রয়েছে ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় (Diamond Harbour Women’s University), বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয় (Bankura University), রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় (Raiganj University), সংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় (Sanskrit College and University) ও আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (Aliah University)-এর মতো প্রতিষ্ঠানও।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কাজ, হিসাবরক্ষণ, গ্রন্থাগার পরিচালনা এবং অন্যান্য দফতরের দায়িত্ব সামলান অশিক্ষক কর্মীরা। তাঁদের বেতন ও চাকরির শর্ত পর্যালোচনার সিদ্ধান্তকে তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির কর্মীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও রাজ্যের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পর্ষদের কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলি হল পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (West Bengal Board of Secondary Education), পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ (West Bengal Council of Higher Secondary Education) ও পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ (West Bengal Board of Madrasah Education)। এই সংস্থাগুলির নিয়মিত কর্মীদের বেতন কাঠামো ও চাকরির শর্তও খতিয়ে দেখবে সপ্তম বেতন কমিশন।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আয়োজন, পরীক্ষার ফল প্রকাশ, প্রশাসনিক কাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের কর্মীদের বেতন সংক্রান্ত বিষয় কমিশনের আওতায় আসায় সংশ্লিষ্ট মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে বিজ্ঞপ্তিতে কোন পদে কত বেতন বাড়তে পারে, কিংবা কোন কর্মী কতটা আর্থিক সুবিধা পাবেন, সে বিষয়ে কোনও হিসাব দেওয়া হয়নি। আপাতত তাঁদের বর্তমান বেতন কাঠামো এবং চাকরির শর্ত পর্যালোচনার দায়িত্বই কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর স্বাভাবিকভাবেই কর্মীদের মধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশে মূল বেতনের পরিবর্তন কতটা হতে পারে, মহার্ঘ ভাতা বা অন্যান্য ভাতার ক্ষেত্রে কোনও সংশোধন হবে কি না, নতুন কাঠামো কবে থেকে চালু হবে? এখন সেই দিকেই নজর। পাশাপাশি অতীতের কোনও সময় থেকে বকেয়া আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু অর্থ দফতরের নির্দেশিকায় এই বিষয়গুলির কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
কমিশনের পর্যালোচনা ও সুপারিশের পরেই সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বেতন সংক্রান্ত পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক হতে পারে। ফলে কমিশনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে সরাসরি বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রথমে বর্তমান বেতন কাঠামো, ভাতা এবং চাকরির শর্ত পর্যালোচনা করে কমিশনকে সুপারিশ জমা দিতে হবে। তার পর রাজ্য সরকার সেই সুপারিশের ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর সরকারি কর্মীদের বেতন কাঠামো ও মহার্ঘ ভাতা নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজ্য সরকারি কর্মীদের বেতন পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের কথা জানানো হয়। সেই ঘোষণার পর অর্থ দফতরের মাধ্যমে কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া এগোয়। এবার বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা পর্ষদগুলির কর্মীদেরও কমিশনের আওতায় আনার সিদ্ধান্তে সেই উদ্যোগের পরিধি আরও বাড়ল।
রাজ্যের ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তিনটি শিক্ষা পর্ষদের নিয়মিত কর্মীদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত কতটা আর্থিক পরিবর্তন আনবে, তা অবশ্য এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ, বেতন বৃদ্ধির হার, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের দিনক্ষণ কিংবা বকেয়া পাওনা মেটানোর বিষয়ে এখনও কোনও ঘোষণা হয়নি। আপাতত কমিশনের সুপারিশের অপেক্ষায় থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের। সেই রিপোর্ট জমা পড়ার পর রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে তাঁদের বেতন ও ভাতার ভবিষ্যৎ।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Annapurna Scheme, 7th Pay Commission WB | অন্নপূর্ণা যোজনা অনুমোদন, সপ্তম বেতন কমিশন গঠন, ডিএ নিয়ে সিদ্ধান্ত হল না মন্ত্রিসভার বৈঠকে




