Jai Balaji Group Investment in West Bengal | বাংলার শিল্পে বড় বাজি জয় বালাজীর, ৬০০০ কোটিতে খুলবে চাকরির দরজা

SHARE:

পশ্চিমবঙ্গে ৬০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা জয় বালাজী গ্রুপের, নতুন শিল্প সম্প্রসারণে ২০ হাজারেরও বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা।

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে বড়সড় বিনিয়োগের পথে হাঁটতে চলেছে জয় বালাজী গ্রুপ (Jai Balaji Group)। রাজ্যে প্রায় ৬০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সংস্থাটি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ হাজারেরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। শুধু প্রচলিত ইস্পাত উৎপাদন নয়, রেল, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ প্রযুক্তি, প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিং ও অ্যালুমিনিয়াম ও তামার সংকর ধাতু উৎপাদনের মতো একাধিক ক্ষেত্রে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে শিল্পগোষ্ঠীটির। ফলে এই বিনিয়োগ ঘিরে রাজ্যের শিল্পমহলে নতুন করে আশার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে বড় শিল্প বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার মধ্যে জয় বালাজীর এই ঘোষণা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। জয় বালাজী গ্রুপের (Jai Balaji Group) কাছে পশ্চিমবঙ্গ নতুন কোনও শিল্পক্ষেত্র না। রাজ্যে ইতিমধ্যেই সংস্থাটির একাধিক উৎপাদন কেন্দ্র চালু রয়েছে।

আরও পড়ুন : West Bengal CM Suvendu Adhikari and Mukesh Ambank meeting | অ্যান্টিলিয়া থেকে বাংলার শিল্পের সম্ভাবনা, আম্বানী-সাক্ষাৎ নিয়ে বড় দাবি শুভেন্দু অধিকারীর

এই গ্রুপের মোট ১০টি শিল্প পরিকাঠামোর মধ্যে আটটিই পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। অর্থাৎ, সংস্থার সামগ্রিক শিল্প কার্যক্রমে এ রাজ্যের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রয়েছে তাদের। সংস্থার ক্যাপটিভ পাওয়ার উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১০০ মেগাওয়াট। নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনার মাধ্যমে রাজ্যে এই শিল্প পরিকাঠামোকে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এবারের সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উন্নত মানের ও নির্দিষ্ট প্রয়োজনে ব্যবহৃত ইস্পাত উৎপাদনে। সাধারণ নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইস্পাতের বাইরে রেলওয়ে, প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ধরনের স্টিল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই ধরনের ইস্পাত তৈরিতে নির্দিষ্ট গুণমান, স্থায়িত্ব ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার উপর বাড়তি গুরুত্ব দিতে হয়। ফলে এই প্রকল্প কার্যকর হলে পশ্চিমবঙ্গের উৎপাদন শিল্পে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রেল ও প্রতিরক্ষা শিল্পে দেশীয় উৎপাদনের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। রেলের সম্প্রসারণ, নতুন পরিকাঠামো নির্মাণ, আধুনিক কোচ ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য উন্নত মানের ধাতুর প্রয়োজন হয়। একইভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনেও নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ইস্পাত ও অন্যান্য ধাতব উপকরণের চাহিদা রয়েছে। জয় বালাজী গ্রুপের নতুন পরিকল্পনা এই চাহিদার একটি অংশ পূরণে ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে দেশীয় শিল্প সংস্থাগুলি যদি প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উন্নত ধাতব উপকরণ দেশের মধ্যেই উৎপাদন করতে পারে, তাহলে বিদেশি সরবরাহের উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। এই বিনিয়োগের পরিধি অবশ্য কেবল ইস্পাত উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পরিকল্পনায় রয়েছে প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যালুমিনিয়াম ও কপার অ্যালয় উৎপাদন, কাস্টিং ও ফোরজিংয়ের মতো শিল্পক্ষেত্র। প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পের জন্য অত্যন্ত নিখুঁত মাপ ও নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়। অটোমোবাইল, রেল, প্রতিরক্ষা এবং যন্ত্র নির্মাণ শিল্পে এই ধরনের উৎপাদনের প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে কাস্টিং ও ফোরজিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধাতব যন্ত্রাংশ তৈরি করা সম্ভব। ফলে একাধিক উৎপাদন ক্ষেত্রকে একই বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় আনার চেষ্টা করছে সংস্থাটি।

আরও পড়ুন : Ranbir Kapoor Yash | Suvendu Adhikari : রাবণ দহনের মঞ্চে রাম-রাবণ একসঙ্গে! সল্টলেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে রণবীর-যশের ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি’

মহাকাশ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ধাতব উপকরণ উৎপাদনের বিষয়টিও এই পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতে মহাকাশ গবেষণা, উপগ্রহ নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি শিল্পের পরিধি বাড়ছে। সেই কারণে উন্নত মানের ধাতু ও নির্ভুল যন্ত্রাংশের চাহিদাও ভবিষ্যতে বাড়তে পারে। পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের উৎপাদন পরিকাঠামো গড়ে উঠলে রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রের সামনে নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সংস্থার সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ সংক্রান্ত ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও থাকবে। এই বিনিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান। সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পের মাধ্যমে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবহণ, নির্মাণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য সহযোগী পরিষেবার ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। শিল্পাঞ্চলের আশপাশে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার প্রসারের সম্ভাবনাও রয়েছে। নতুন কারখানা চালু হলে কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহণ সংস্থা, নিরাপত্তাকর্মী, প্রযুক্তিগত কর্মী এবং বিভিন্ন পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদা তৈরি হবে।

বিশেষ করে রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের কাছে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ আধুনিক ইস্পাত উৎপাদন, ধাতু প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো ক্ষেত্রে কাজ করতে হলে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন। স্থানীয় যুবকদের সেই ধরনের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা গেলে শিল্প সংস্থার পাশাপাশি কর্মপ্রার্থীরাও লাভবান হবেন। তবে কতগুলি পদে সরাসরি নিয়োগ হবে, কোন কোন এলাকায় প্রকল্প গড়ে উঠবে ও নিয়োগের সময়সীমা কী হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসা এখনও প্রয়োজন।

জয় বালাজী গ্রুপের বিনিয়োগের ঘোষণার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি পরিকল্পনাও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। রাজ্যের ২০৪৭ সালের জ্বালানি রূপরেখায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক ক্ষমতা অনেকটা বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৭ গিগাওয়াট ইনস্টল্ড ক্যাপাসিটি থেকে তা বাড়িয়ে ১৪৫ গিগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে প্রায় ৮৫ শতাংশ। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা যথেষ্ট বড়। বর্তমানে রাজ্যের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১.২৫ গিগাওয়াট। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় তা বাড়িয়ে ১২০ গিগাওয়াট করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের পরিকাঠামো শক্তিশালী করার জন্য ব্যাটারি স্টোরেজের ক্ষমতা ১ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২২ গিগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা যখন বেশি থাকবে, তখন সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে সরবরাহ বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari Matua Announcement | ঠাকুরনগরে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর, মতুয়া উন্নয়নে ৫০ কোটি ও পৃথক পুরসভার প্রতিশ্রুতি

এই জ্বালানি রূপান্তরের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। দ্য এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট বা টেরি (The Energy and Resources Institute-TERI)-এর অনুমান অনুযায়ী, রাজ্যের প্রস্তাবিত জ্বালানি পরিবর্তন বাস্তবায়িত করতে প্রায় ৫.৮ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাজ্যের সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪৬ গিগাওয়াটে পৌঁছনোর সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিবহণ, বণ্টন এবং সঞ্চয়ের পরিকাঠামো উন্নত করাও জরুরি হয়ে উঠবে।

শিল্প সম্প্রসারণ ও জ্বালানি পরিকাঠামোর উন্নয়ন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বড় শিল্প কারখানা চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন। আবার শিল্পের প্রসার ঘটলে রাজ্যে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। জয় বালাজী গ্রুপের নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার ব্যবস্থা থাকায় সংস্থার উৎপাদন কার্যক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি নিজস্ব পরিকাঠামো রয়েছে। ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রেও সংস্থাটি কতটা সম্প্রসারণ ঘটায়, তার উপর শিল্প ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি নির্ভর করতে পারে। তবে ৬০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা অতিক্রম করতে হবে। শিল্প প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত জমি, পরিবহণ ব্যবস্থা, জল সরবরাহ, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য পরিকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি পরিবেশ সংক্রান্ত অনুমোদন, সরকারি দপ্তরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র এবং প্রকল্পের আর্থিক কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে। তাই প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও শিল্প সংস্থার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করাও প্রয়োজন।

পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে বড় শিল্প বিনিয়োগের প্রভাব শুধু কারখানা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি বড় উৎপাদন কেন্দ্রকে ঘিরে ছোট শিল্প, পরিবহণ, গুদামজাতকরণ ও পরিষেবা ক্ষেত্রেরও প্রসার ঘটে। ফলে জয় বালাজী গ্রুপের পরিকল্পনা সফল হলে রাজ্যের শিল্প অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে ঘোষিত বিনিয়োগের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন, নির্ধারিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং উৎপাদন কেন্দ্রগুলির কাজ শুরু হওয়ার বিষয়গুলিই শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারণ করবে। আপাতত ৬০০০ কোটি টাকার এই পরিকল্পনা ঘিরে রাজ্যের শিল্পমহলের নজর জয় বালাজী গ্রুপের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Micro fertilizer export, one nation one licence fertilizer | সার শিল্পে বদলের ডাক, ‘এক দেশ এক লাইসেন্স’-এ কমবে জট? রপ্তানি ও GST নিয়েও বড় দাবি

 

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন