সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ভোপাল: ভোপালের রাজপথে বিজেপির রাজনৈতিক কর্মসূচীতে বোরখা পরা মুসলিম মহিলাদের অংশগ্রহণ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে (Muslim Women in Bhopal BJP Rally)। ‘লোকতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ স্লোগানে আয়োজিত পদযাত্রায় তাঁদের হাতে দেখা যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একাধিক পোস্টার। তিন তালাক আইনকে স্বাগত জানিয়ে অনেকেই সরকারের পাশে থাকার কথা জানান। বিজেপির দাবি, মুসলিম মহিলাদের একাংশের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। বিশেষত তিন তালাক প্রথা বন্ধে আইন প্রণয়নের বিষয়টি তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রদেশের (Madhya Pradesh) রাজধানী ভোপালে (Bhopal) আয়োজিত এই পদযাত্রায় বিজেপির কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের একাধিক শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা (J. P. Nadda) ও মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব (Mohan Yadav)। দলীয় কর্মী, সমর্থক ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিতে শহরের রাস্তায় বড় জমায়েত তৈরি হয়। সেই ভিড়ের মধ্যে বোরখা পরা মুসলিম মহিলাদের অংশগ্রহণ আলাদা করে নজর কাড়ে। তাঁদের হাতে থাকা পোস্টারে প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে মুসলিম মহিলাদের অধিকার রক্ষার প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। উল্লেখ্য, কোনও পোস্টারে তিন তালাক থেকে মুক্তির কথা লেখা ছিল, আবার কোথাও মুসলিম মহিলাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করা হয়। মিছিলে অংশ নেওয়া কয়েকজন মহিলার বক্তব্য, তাঁদের জীবনে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্তের প্রভাব রয়েছে। সেই কারণেই তাঁরা নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করতে পদযাত্রায় যোগ দিয়েছেন।
মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের একজনের কথায়, প্রধানমন্ত্রী মোদীর আমলে তাঁরা একাধিক সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। সরকারের প্রতি সমর্থন জানাতেই তাঁদের এই উপস্থিতি। উল্লেখ্য, তিন তালাক প্রথা বন্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের আইন প্রণয়ন এই রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে মুসলিম মহিলাদের বিবাহের অধিকার সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন কার্যকর হওয়ার পর তাৎক্ষণিক তিন তালাককে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আনা হয়। এর আগে মুসলিম পুরুষের মুখে তাৎক্ষণিক তিন তালাক উচ্চারিত হলে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার যে প্রচলিত ধারণা ছিল, নতুন আইনে তার আইনি স্বীকৃতি বন্ধ করা হয়। সরকারের বক্তব্য ছিল, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মুসলিম বিবাহিত মহিলাদের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইনটি কার্যকর হওয়ার পর মুসলিম সমাজের একাংশের মধ্যে যেমন সমর্থন দেখা গিয়েছে, তেমনই বিভিন্ন সময়ে এর প্রয়োগ ও আইনি কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য বরাবরই তিন তালাক বিরোধী আইনকে নারী অধিকার রক্ষায় তাদের সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরে। ভোপালের পদযাত্রায় মুসলিম মহিলাদের হাতে সেই আইনকে সমর্থন জানানো পোস্টার দেখা যাওয়ায় দলীয় নেতৃত্ব বিষয়টিকে রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। পদযাত্রাটি আটল পথ থেকে শুরু হয়ে রোশনপুরা স্কয়ার পর্যন্ত যায়। বিজেপির তরফে দাবি, ভোপাল ও নর্মদাপুরম বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় এক লক্ষ মানুষ এই কর্মসূচীতে যোগ দিয়েছিলেন। যদিও পুলিশের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দলের দাবির তুলনায় কম। ফলে জমায়েতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন দাবি সামনে এসেছে। মিছিলে শুধু বিজেপির প্রচলিত ভোটব্যাঙ্কের মানুষই ছিলেন না, তৃতীয় লিঙ্গের সম্প্রদায়ের সদস্যদেরও উপস্থিতি দেখা যায়।
বিজেপির এই কর্মসূচীর রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ তুলে পদযাত্রার আয়োজন করেছিল গেরুয়া শিবির। দলের বক্তব্য, বিরোধীদের রাজনীতির বিপরীতে তারা উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দিচ্ছে। মুসলিম মহিলাদের অংশগ্রহণকে সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হিসেবেই তুলে ধরছেন বিজেপি নেতারা। তবে এই উপস্থিতির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমতও আছে। সমালোচকদের একাংশের বক্তব্য, নির্বাচনী রাজনীতিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণকে দলগুলি নিজেদের প্রচারের অনুকূলে ব্যবহার করে থাকে। ফলে একটি পদযাত্রায় কোনও সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের উপস্থিতি দিয়ে গোটা সমাজের রাজনৈতিক অবস্থান বিচার করা যায় না। মুসলিম মহিলাদের মধ্যেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তিন তালাক আইন নিয়ে সমর্থন ও বিরোধিতা, দুই ধরনের অবস্থানই বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, মিছিলে অংশ নেওয়া মহিলাদের একাংশের দাবি, তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্তেই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কিংবা কোনও সরকারের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করার অধিকার তাঁদেরও রয়েছে। এত দিন মুসলিম মহিলাদের রাজনৈতিক মতামত নিয়ে যে আলোচনা মূলত দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, এখন সেই মহিলাদের একাংশ নিজেরাই প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছেন। ভোপালের রাস্তায় তাঁদের উপস্থিতি সেই প্রবণতারই একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রদেশে বিজেপির সংগঠন শক্তিশালী হলেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সমর্থন ধরে রাখা দলের কাছে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের কাছে কেন্দ্রীয় প্রকল্প, সামাজিক সুরক্ষা এবং ব্যক্তিগত আইনের সংস্কারের বিষয়গুলি তুলে ধরতে চায় শাসক দল। তিন তালাক আইনকে সামনে রেখে মুসলিম মহিলাদের কাছে পৌঁছনোর প্রচেষ্টাও সেই রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। ভোপালের পদযাত্রায় বোরখা পরা মহিলাদের উপস্থিতি মধ্যপ্রদেশের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক দলগুলির অবশ্য দাবি ও বিরোধীদের পাল্টা বক্তব্যের বাইরে এই ঘটনার একটি সামাজিক দিকও আছে। কোনও সম্প্রদায়ের মহিলারা নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশ নিলে তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কয়েকজনের অংশগ্রহণকে গোটা সম্প্রদায়ের অভিন্ন অবস্থান হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ভোপালের পদযাত্রা ঘিরে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে মুসলিম মহিলাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, তিন তালাক আইন ও নারী অধিকার নিয়ে চলতে থাকা বিতর্ক।
বিজেপি নেতৃত্ব এই ঘটনাকে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সরকারের প্রতি মুসলিম মহিলাদের আস্থার নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরছে। বিরোধীরা অবশ্য এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রচারের উপাদান দেখতে পারেন। কিন্তু ভোপালের রাজপথে বোরখা পরা মহিলাদের হাতে পোস্টার নিয়ে মিছিলে হাঁটার দৃশ্য মধ্যপ্রদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।




