সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ৪ অক্টোবর ২০২৬: পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের প্রশাসনিক পরিকাঠামো ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিল পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার। একদিকে নিউটাউনে পাঁচ একর জমির উপর অত্যাধুনিক পঞ্চায়েত ভবন তৈরির পরিকল্পনা, অন্যদিকে দফতরের দীর্ঘদিনের কর্মী সঙ্কট মেটাতে ৭১৯০টি স্থায়ী পদে নিয়োগের ঘোষণা। বুধবার বিধাননগরে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক থেকে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়ানো এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরকে দেশের অন্যতম কার্যকর প্রশাসনিক মডেল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

নিউটাউনে নতুন পঞ্চায়েত ভবন তৈরির ঘোষণা বুধবারের বৈঠকের অন্যতম বড় আকর্ষণ। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত কলকাতা হাই কোর্ট ও বিধানসভা ভবনের কাছাকাছি এলাকায় পাঁচ একর জমি বরাদ্দ করা হবে এই নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র নির্মাণের জন্য। তাঁর বক্তব্য, পঞ্চায়েত দফতরের কাজের পরিধি এবং দায়িত্বের গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ ভবনের প্রয়োজন রয়েছে। নতুন ভবন তৈরি হলে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন সংক্রান্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা, বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও আধিকারিকদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পঞ্চায়েত ভবনে এসে আমি পঞ্চায়েত দফতরকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে একটা উপহার দিয়ে গেলাম। আমরা নতুন পঞ্চায়েত ভবন বানানোর জন্য নিউটাউনে পাঁচ একর জমি দেব।’ তাঁর এই ঘোষণাকে দফতরের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এত দিন বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের জন্য একাধিক দফতরের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে হত। নতুন ভবন তৈরি হলে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের কাজ আরও সুসংহতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়, কর্মী সঙ্কট দূর করতেও বড়সড় সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, পঞ্চায়েত দফতরের বিভিন্ন স্তরে মোট ৭১৯০টি স্থায়ী পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ব্লক স্তরে কর্মী ও ইঞ্জিনিয়ারের অভাব দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ এলাকায় রাস্তা, পানীয় জল, নিকাশি, আবাসন ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় কর্মীর সংখ্যা কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে বলে প্রশাসনের অভ্যন্তরে আলোচনা অব্যাহত। এই ঘাটতি পূরণ করতেই নতুন নিয়োগের পরিকল্পনা। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্য মন্ত্রিসভা প্রায় ৭২০০টি স্থায়ী পদে নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (Public Service Commission) মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষা, যোগ্যতা যাচাই ও নির্ধারিত নিয়ম মেনেই নিয়োগের পথে হাঁটতে চাইছে সরকার। নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা দূর করতে দীপাবলির ছুটির পর বিশেষ বিধানসভা অধিবেশন ডাকার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে নিয়োগ সংক্রান্ত বিল পেশ করা হতে পারে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা, ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে স্থায়ী পদগুলিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা।
স্থায়ী নিয়োগের পাশাপাশি এক বছরের জন্য আরও এক হাজার চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাও আছে রাজ্য সরকারের। ফলে পঞ্চায়েত দফতরের বিভিন্ন স্তরে কাজের চাপ সামলাতে অতিরিক্ত কর্মী পাওয়া যাবে বলে আশা করছে প্রশাসন। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে ব্লক এবং জেলা স্তর পর্যন্ত উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের সংখ্যা বাড়লে প্রকল্পের বাস্তবায়নেও গতি আসতে পারে। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং সংক্রান্ত কাজ, প্রকল্পের পরিদর্শন ও বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন নিয়োগের গুরুত্ব রয়েছে। এদিনের বৈঠকে গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিয়েও বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেন শুভেন্দু অধিকারী। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজ্যে ২২ কোটি শ্রমদিবস তৈরি করার পরিকল্পনা রাজ্য সরকারের। এই কর্মসূচীর জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, রাজ্য সরকারের হাতে সময় সীমিত হলেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য প্রশাসনকে দ্রুত কাজ করতে হবে। নতুন সরকারের হাতে পূর্ণ এক বছরের বাজেট না থাকায় সময়ের সীমাবদ্ধতাও আছে। তা সত্ত্বেও গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পে কোনও ঘাটতি রাখতে চায় না সরকার।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই রাজ্যে ৬৫ লক্ষ ৬২ হাজার কর্মদিবস তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাত লক্ষ কর্মদিবস তৈরি হচ্ছে। এই গতি বজায় রাখতে পারলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার দিকে দ্রুত এগোনো সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন। গ্রামীণ এলাকায় যাঁরা দৈনিক মজুরির উপর নির্ভরশীল, তাঁদের কাছে এই ধরনের কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিকাজের বাইরে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা ও গ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার ক্ষেত্রেও শ্রমদিবস তৈরির পরিকল্পনা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। এই কর্মসূচীর আওতায় প্রায় ১২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার কাজের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এর মধ্যে প্রায় ৮৫০০ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়ার কথা। বাকি অর্থের বড় অংশ রাজ্য সরকার বহন করবে। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের তরফে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা রাজ্যে এসেছে বলে দাবি করেছেন তিনি। ফলে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা এখন প্রশাসনের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে আধার ও কেওয়াইসি (KYC) যাচাইয়ের বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, আধার সংযুক্তিকরণ এবং তথ্য যাচাইয়ের সময় প্রায় ৩১ লক্ষ ভুয়ো জব কার্ড বাতিল করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করে প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় অনুমোদনের পর নতুন করে প্রায় ১০ লক্ষ জব কার্ড দেওয়া হয়েছে। জনকল্যাণ শিবির, সেবা সেতু এবং সংকল্প অভিযানের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন উপভোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার কাজ হয়েছে বলে তিনি জানান। আবাসন প্রকল্প নিয়েও বড় লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ আবাস যোজনায় (Pradhan Mantri Gramin Awaas Yojana) বাড়ি তৈরির কাজ দ্রুত শেষ করতে চায় রাজ্য সরকার। প্রাথমিক সমীক্ষায় প্রায় ৫৪ লক্ষ পরিবারের নাম উঠে এলেও পরবর্তী পর্যায়ের যাচাইয়ের পর সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৪৭ লক্ষ হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, আগামী দুটি অর্থবর্ষের মধ্যে চিহ্নিত সমস্ত উপভোক্তার বাড়ি তৈরির কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের জন্য স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করা ও আবাসন প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা প্রশাসনের অন্যতম অগ্রাধিকার।
পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের কাজের পরিধি যে কতটা বিস্তৃত, তা তুলে ধরতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়নমূলক প্রকল্পের পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতার উপরেও জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নতুন সরকার মাত্র আট মাসের ভোট অন অ্যাকাউন্টের ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে। পূর্ণ অর্থবর্ষের সুযোগ না থাকলেও হাতে থাকা সীমিত সময়ের মধ্যে উন্নয়নের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ২২ কোটি শ্রমদিবস তৈরির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হবে। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরকে রাজ্যের কর্মক্ষম দফতরগুলির মধ্যে প্রথম সারিতে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উল্লেখ্য, বুধবারের পর্যালোচনা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh), কৃষিমন্ত্রী দুধকুমার মণ্ডল (Dudh Kumar Mandal), পঞ্চায়েত প্রতিমন্ত্রী শান্তনু প্রামাণিক (Shantanu Pramanik) ও সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিকেরা। বৈঠকে বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি, কর্মী সঙ্কট, আর্থিক বরাদ্দ এবং আগামী দিনের প্রশাসনিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়, চলমান প্রকল্পগুলির কাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা।
কিন্তু, পাঁচ একর জমিতে নতুন পঞ্চায়েত ভবন নির্মাণ কিংবা সাত হাজারের বেশি স্থায়ী পদে নিয়োগের ঘোষণা বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়, তা এখন দেখার বিষয়। বিশেষ করে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিধানসভায় বিল পেশ, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে পরীক্ষার আয়োজন, প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ২২ কোটি শ্রমদিবসের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রকল্পের বাস্তবায়নেও ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন। নিউটাউনের নতুন পঞ্চায়েত ভবন, ৭১৯০টি স্থায়ী পদে নিয়োগ, অতিরিক্ত এক হাজার চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের বৃহৎ লক্ষ্যমাত্রা, এক দিনের বৈঠকেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা সামনে এনেছে রাজ্য সরকার। ঘোষণাগুলি কার্যকর হলে পঞ্চায়েত দফতরের প্রশাসনিক কাঠামো এবং গ্রামীণ পরিষেবা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। এখন নজর, কবে শুরু হয় নতুন ভবনের নির্মাণকাজ এবং কবে প্রকাশিত হয় বহু প্রতীক্ষিত নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : CAA Certificate, Suvendu Adhikari CAA Announcement | ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সিএএ শংসাপত্র! মতুয়া সমাজকে বড় আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর




