সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : সরকারি (Government) ও সরকারপোষিত স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকায় উদ্বিগ্ন শিক্ষা প্রশাসন। একসময় যে স্কুলগুলি ছিল সাধারণ পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার প্রধান ভরসা, সেখানেই এখন ভর্তি নিয়ে অনীহা দেখা যাচ্ছে বহু অভিভাবকের মধ্যে। বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রতি ঝোঁক বৃদ্ধি, সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে নানা প্রশ্ন ও পঠনপাঠনের মান সম্পর্কে অভিভাবকদের সংশয়ের মতো একাধিক কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এবার সরকারি স্কুলের প্রতি সেই হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে নতুন কর্মসূচীর পরিকল্পনা করেছে কলকাতার শিক্ষা প্রশাসন। শুধু প্রচারই না, স্কুলের ভিতরের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা থেকে শুরু করে শিক্ষক, পড়ুয়া ও অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা সহ একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হবে। শিক্ষা প্রশাসনের পরিকল্পনায় রয়েছে অভিনব প্রচার পদ্ধতিও। সরকারি স্কুলের সুযোগ-সুবিধা, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প ও পড়ুয়াদের জন্য বরাদ্দ আর্থিক সহায়তার বিষয়গুলি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তৈরি করা হতে পারে বিশেষ ট্যাবলো। কলকাতার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সেই ট্যাবলো নিয়ে প্রচার চালানোর ভাবনা বলে উল্লেখ। মাইকের মাধ্যমে স্থানীয় এলাকায় প্রচার করে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রশাসনের লক্ষ্য, সরকারি স্কুল সম্পর্কে অভিভাবকদের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে সন্তানদের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর বিষয়ে তাঁদের আগ্রহ বাড়ানো। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কলকাতা পুরসভার (Kolkata Municipal Corporation) নির্বাচিত কাউন্সিলরদেরও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরসভা নির্বাচনের পর নতুন বোর্ড গঠিত হলে সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রচারের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হতে পারে। প্রতিটি ওয়ার্ডে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় প্রচার চালানো হবে। কোন এলাকায় সরকারি স্কুলের প্রতি অনীহা বেশি, কোথায় পড়ুয়া ভর্তির হার কমছে, সেই বিষয়গুলিও আলোচনায় উঠে আসতে পারে। ট্যাবলোয় সরকারি স্কুলের শিক্ষার সুযোগ, বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা ও পড়ুয়াদের জন্য থাকা আর্থিক সহায়তার বিষয়গুলি তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি মাইক প্রচারের মাধ্যমে এলাকার মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছনোর চেষ্টা চলবে। শুধু প্রচার চালিয়ে সরকারি স্কুলের পড়ুয়া সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব নয়, তা মানছেন শিক্ষা প্রশাসনের কর্তারা। অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করতে হলে স্কুলের ভিতরের অবস্থারও উন্নতি প্রয়োজন। কোনও স্কুলে শ্রেণিকক্ষের অবস্থা খারাপ, কোথাও শৌচাগারের রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যা, আবার কোথাও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে কি না, সেগুলি সরাসরি খতিয়ে দেখতে চায় প্রশাসন। সেই কারণেই কলকাতার প্রায় ৫০০টি উচ্চমাধ্যমিক স্তরের সরকারি স্কুলে ধারাবাহিক পরিদর্শনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই কাজের জন্য নির্দিষ্ট আধিকারিকদের মধ্যে স্কুলগুলি ভাগ করে দেওয়া হবে। প্রত্যেক আধিকারিককে কয়েকটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন একটি স্কুলে গিয়ে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় কাটাবেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিক। শুধুমাত্র স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসাই নয়, প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজকর্ম, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, পড়াশোনার পরিবেশ ও পড়ুয়াদের বাস্তব সমস্যাগুলি তাঁরা সরাসরি বোঝার চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ কাগজে-কলমে স্কুলের অবস্থা কেমন, তার পাশাপাশি বাস্তবে সেখানে কী পরিস্থিতি রয়েছে, সেটিও পর্যালোচনার আওতায় আসবে। পরিদর্শনের শুরুতেই স্কুলের বিভিন্ন নথিপত্র পরীক্ষা করা হবে। পড়ুয়াদের উপস্থিতি, স্কুলের প্রশাসনিক কাজকর্ম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হতে পারে। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গেও কথা বলবেন আধিকারিকরা। স্কুলে নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে কি না, শিক্ষকেরা সময়মতো আসছেন কি না, পড়াশোনার ক্ষেত্রে কী ধরনের অসুবিধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, স্কুলের পরিবেশ নিয়ে তাদের কোনও অভিযোগ রয়েছে কি না, সেই সমস্ত বিষয় জানার চেষ্টা করা হবে। পড়ুয়াদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
স্কুলের পরিকাঠামো পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোনও শ্রেণিকক্ষের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে কি না, ভবনের কোথাও ক্ষতির চিহ্ন রয়েছে কি না, স্কুলবাড়ি পড়ুয়াদের জন্য নিরাপদ কি না, সেগুলি খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে শৌচাগারের সংখ্যা, সেগুলির ব্যবহারযোগ্য অবস্থা ও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা হচ্ছে কি না, তা-ও পরিদর্শনের তালিকায় থাকবে। কারণ, শিক্ষার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ স্কুলবাড়ির গুরুত্ব রয়েছে। পরিকাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট স্কুলের জন্য পৃথকভাবে উন্নয়নের সুপারিশ করা হতে পারে। শুধু স্কুল ভবন বা শ্রেণিকক্ষই না, সরকারি আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে চান প্রশাসনিক আধিকারিকরা। স্কুলগুলি নির্দিষ্ট সরকারি অনুদান পাচ্ছে কি না, সেই অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে কি না, তার হিসাব পরীক্ষা করা হবে। এর মধ্যে বর্তমান কম্পোজিট গ্রান্ট (Composite Grant)। স্কুলের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ আর দৈনন্দিন কাজকর্মে এই ধরনের অনুদানের ভূমিকা আছে। কোনও স্কুল প্রয়োজনীয় অর্থ পাচ্ছে না, নাকি অর্থ বরাদ্দ হলেও তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, সেই বিষয়গুলি চিহ্নিত করার চেষ্টা চলবে। প্রতিটি পরিদর্শনের শেষে সংশ্লিষ্ট স্কুলের পরিস্থিতি নিয়ে পৃথক রিপোর্ট তৈরি করা হবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে পারে শিক্ষা প্রশাসন।
শিক্ষকদের বক্তব্য শোনার জন্যও বিশেষ সময় বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি স্কুলে পরিদর্শনের সময় প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা। সেখানে শিক্ষকরা তাঁদের দৈনন্দিন কাজের সমস্যা, পঠনপাঠনের প্রতিবন্ধকতা এবং স্কুল পরিচালনার ক্ষেত্রে যে অসুবিধার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। কোনও বিষয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন কি না, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে কী ধরনের পরিকাঠামো দরকার, ছাত্রছাত্রীদের স্কুলমুখী করতে কী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, সেসব বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। প্রশাসনের উদ্দেশ্য, উপর থেকে নির্দেশ চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে স্কুলের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। একইভাবে, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উপরেও জোর দেওয়া হচ্ছে। স্কুল পরিদর্শনের পর আধিকারিকরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পার্শ্ববর্তী এলাকায় গিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলবেন। তাঁদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে ভর্তি না করানোর পিছনে কী কারণ রয়েছে, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তাঁদের ধারণা কী, কোন কোন সুযোগ-সুবিধার অভাব তাঁরা অনুভব করছেন, তা জানার চেষ্টা করা হবে। অনেক অভিভাবক কেন বেসরকারি স্কুলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, সরকারি স্কুলের শিক্ষার মান নিয়ে তাঁদের কোনও সংশয় রয়েছে কি না, সেই বিষয়গুলিও আলোচনার অংশ হতে পারে। পাশাপাশি সরকারি স্কুলে সন্তানদের ভর্তি করালে কী কী সুবিধা পাওয়া যায়, তা তাঁদের সামনে তুলে ধরা হবে।
এই উদ্যোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নিয়মিত পর্যালোচনা। প্রথম দফায় ছয় মাস ধরে স্কুল পরিদর্শন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা এবং উন্নয়নের প্রয়োজনীয় দিকগুলি চিহ্নিত করার কাজ চলবে। এরপর পরবর্তী ছয় মাসে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা ফের সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলিতে যাবেন। প্রথম দফায় যে সমস্ত পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলি কার্যকর হয়েছে কি না, পরিকাঠামোগত সমস্যার সমাধান কতটা হয়েছে এবং পড়াশোনার পরিবেশে কোনও পরিবর্তন এসেছে কি না, তা যাচাই করা হবে। অর্থাৎ একবার পরিদর্শন করেই দায়িত্ব শেষ করার পরিকল্পনা নেই প্রশাসনের। এক বছরের ব্যবধানে স্কুলগুলির অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, সরকারি স্কুলের পড়ুয়া সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে রাজ্যের শিক্ষা মহলে আগেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পড়ুয়াশূন্য স্কুলের ভবিষ্যৎ নিয়েও রাজ্য প্রশাসনকে ভাবনাচিন্তা করতে হয়েছে। ফলে স্কুলগুলিকে সচল রাখা ও নতুন করে পড়ুয়া আকর্ষণ করার প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু স্কুলের সংখ্যা বজায় রাখাই নয়, সাধারণ পরিবারের সন্তানদের জন্য সরকারি শিক্ষার সুযোগ ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। কলকাতার প্রায় ৫০০টি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলকে কেন্দ্র করে এই নতুন উদ্যোগ সেই বৃহত্তর সমস্যার মোকাবিলারই একটি প্রচেষ্টা। এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হচ্ছে তার উপর। ট্যাবলো নিয়ে প্রচার করে অভিভাবকদের স্কুলমুখী করা যেতে পারে, কিন্তু ভর্তি বাড়াতে হলে শিক্ষার মান, নিয়মিত ক্লাস, পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং উন্নত পরিকাঠামো নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে স্কুলের সমস্যার কথা জানার পর দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা না হলে পরিদর্শনের সুফল পাওয়া কঠিন। প্রশাসনের কাছে তাই একদিকে জনসংযোগ বাড়ানো, অন্যদিকে স্কুলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকে উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে। পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে আগামী শিক্ষাবর্ষে সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলিতে নতুন করে পড়ুয়া ভর্তির প্রবণতা বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন দেখার, প্রচার এবং ধারাবাহিক নজরদারির এই জোড়া উদ্যোগ কলকাতার সরকারি স্কুলগুলির ছবিতে কতটা বদল আনতে পারে।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Raiganj AIIMS announcement, Suvendu Adhikari healthcare announcement | উত্তরবঙ্গে দু’টি বড় হাসপাতালের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর! রায়গঞ্জে AIIMS ও জলপাইগুড়িতে ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র




