সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ৫ অক্টোবর ২০২৬ : পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের ইতিহাসে সিঙ্গুর (Singur) একটি বহুল আলোচিত নাম। টাটা মোটরসের (Tata Motors) ন্যানো গাড়ির কারখানা ঘিরে যে রাজনৈতিক সংঘাত, জমি আন্দোলন এবং আইনি লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল, তার রেশ আজও রাজ্যের রাজনীতিতে রয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে সেই সিঙ্গুরেই আবার বড় শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এবার আলোচনার কেন্দ্রে দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা অশোক লেল্যান্ড (Ashok Leyland)। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari) জানিয়েছেন, সিঙ্গুরে শিল্পস্থাপনের বিষয়ে এই সংস্থার সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের কথাবার্তা চলছে। সংস্থার তরফে প্রাথমিক সম্মতিও পাওয়া গিয়েছে বলে তাঁর দাবি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে শিল্পের অপেক্ষায় থাকা সিঙ্গুরকে ঘিরে নতুন করে আশার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সিঙ্গুরে নতুন কোনও শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে রাজ্য সরকার উদ্যোগী। সেই লক্ষ্যেই অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, ‘সিঙ্গুরে আমরা কিছু একটা করব। অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ওদের তরফে কিছু জানানো হয়েছে।’ যদিও এই কথাবার্তা এখনও প্রাথমিক স্তরে রয়েছে, তবু শিল্পমহল এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রকৃতি সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। সিঙ্গুরে সংস্থাটি সম্পূর্ণ নতুন গাড়ি তৈরির কারখানা গড়বে, নাকি বাণিজ্যিক গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদন কিংবা অন্য কোনও ধরনের শিল্পকেন্দ্র তৈরি করবে, তা নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। একইভাবে কত একর জমি প্রয়োজন হতে পারে, কত টাকা বিনিয়োগ করা হবে এবং কত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, সেই হিসাবও এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এখনই সিঙ্গুরে অশোক লেল্যান্ডের কারখানা তৈরি হচ্ছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর অবকাশ নেই।
আরও পড়ুন : SSC Group C and Group D Result | এসএসসির ফল প্রকাশ, শুরু ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি
সিঙ্গুরের নামের সঙ্গে শিল্পের প্রসঙ্গ উঠলেই স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসে ন্যানো প্রকল্পের স্মৃতি। ২০০৬ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে টাটা মোটরসের ছোট গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপনের জন্য সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রায় ৯৯৭ একর জমি নিয়ে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা তৈরি হয়। সেই সময় রাজ্য সরকার প্রকল্পটিকে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছিল। টাটা গোষ্ঠীর মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আগমনকে কেন্দ্র করে রাজ্যের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি ওঠে। স্থানীয় কৃষকদের একাংশ তাঁদের জমি দিতে রাজি হননি। তাঁদের অভিযোগ ছিল, কৃষিজমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে যথাযথ সম্মতি এবং ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন উপেক্ষা করা হচ্ছে। জমি রক্ষার দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। রাজনৈতিক কর্মসূচি, অবস্থান ও লাগাতার প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে সিঙ্গুরের আন্দোলন ক্রমশ রাজ্য রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় পরিণত হয়।
২০০৮ সালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জমি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাত ও প্রশাসনিক চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ওই বছরের অক্টোবর মাসে টাটা মোটরস সিঙ্গুর থেকে ন্যানো প্রকল্প সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সংস্থার তৎকালীন নেতৃত্বের বক্তব্য ছিল, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সেখানে কারখানার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এরপর গুজরাতের সানন্দে (Sanand) ন্যানো গাড়ির নতুন কারখানা তৈরির উদ্যোগ নেয় টাটা গোষ্ঠী। সিঙ্গুরের জন্য নির্ধারিত প্রকল্প অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়ন নিয়ে জাতীয় স্তরেও আলোচনা শুরু হয়। এরপর জমি অধিগ্রহণের বৈধতা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলে। ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India) সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে। জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দেয় দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আদালতের এই সিদ্ধান্ত সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে। কিন্তু টাটা প্রকল্প চলে যাওয়ার পর ওই এলাকায় নতুন কোনও বড় শিল্পপ্রকল্প গড়ে ওঠেনি। ফলে জমির ব্যবহার, স্থানীয় অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্ন বারবার আলোচনায় ফিরে এসেছে।
এবার অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে কথাবার্তার প্রসঙ্গ সামনে আসায় সিঙ্গুরের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাণিজ্যিক গাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে অশোক লেল্যান্ড দেশের পরিচিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলির অন্যতম। বাস, ট্রাক এবং বিভিন্ন ধরনের পণ্য পরিবহণের গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে সংস্থাটির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই এই সংস্থার সঙ্গে রাজ্য সরকারের আলোচনা বাস্তব প্রকল্পে পরিণত হলে সিঙ্গুরে উৎপাদনভিত্তিক শিল্পের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। শিল্পপ্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু কারখানা নির্মাণই নয়, তার সঙ্গে যুক্ত একাধিক আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। যন্ত্রাংশ সরবরাহ, পরিবহণ, গুদামজাতকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পরিষেবা ক্ষেত্রে নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কোনও বড় গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থা এলাকায় বিনিয়োগ করলে তার সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পথও খুলতে পারে। তবে সিঙ্গুরের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনাগুলি বাস্তবায়িত হতে হলে প্রথমে প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপরেখা, জমির ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগের পরিমাণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
এদিন বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট (Bengal Global Business Summit) নিয়েও মন্তব্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, রাজ্যে আয়োজিত আটটি বিজিবিএসের পিছনে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। পাশাপাশি ওই সম্মেলনগুলির মাধ্যমে প্রায় ১৬ লক্ষ কোটি টাকার সমঝোতাপত্র বা মউ (MoU) স্বাক্ষরের দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বিনিয়োগের হিসাবের মধ্যে সরকারি অর্থে তৈরি বিভিন্ন পরিকাঠামোর ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, সরকারি উদ্যোগে স্কুল, হাসপাতাল কিংবা অন্যান্য পরিকাঠামো নির্মাণকে সরাসরি বেসরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, শিল্প বিনিয়োগের মূল্যায়ন করতে গেলে দেখতে হবে বেসরকারি সংস্থাগুলি কত টাকা লগ্নি করছে, কতটা জমির প্রয়োজন হচ্ছে এবং তার বিনিময়ে কত মানুষের স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। রাজ্যের শিল্পনীতির সাফল্য বিচার করার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
বিজিবিএসের বিনিয়োগের হিসাব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। শিল্প সম্মেলনে ঘোষিত বিনিয়োগের পরিমাণ এবং বাস্তবে কত টাকা প্রকল্পে খরচ হয়েছে, সেই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোনও প্রকল্পের জন্য সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হলেই যে সঙ্গে সঙ্গে কারখানা তৈরি হবে বা উৎপাদন শুরু হবে, এমন নয়। জমি, পরিবেশগত অনুমোদন, পরিকাঠামো, অর্থের সংস্থান এবং সংস্থার নিজস্ব বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের মতো একাধিক বিষয় প্রকল্পের বাস্তবায়নকে প্রভাবিত করে।
সিঙ্গুরের ক্ষেত্রেও তাই শুধু প্রাথমিক আলোচনার খবর দিয়ে শিল্পায়নের সাফল্য বিচার করা সম্ভব নয়। অশোক লেল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা কতটা এগোয়, সংস্থাটি শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগে সম্মত হয় কি না ও প্রকল্পের জন্য কী ধরনের জমি ও পরিকাঠামো প্রয়োজন হয়, তার উপর নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক, জমির মালিক এবং এলাকার বাসিন্দাদের স্বার্থ কীভাবে রক্ষা করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, সিঙ্গুরের মানুষের কাছে শিল্পের প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বহু মানুষের প্রত্যাশা, সেখানে এমন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হোক, যাতে স্থানীয় যুবকদের কাজের সন্ধানে অন্যত্র ছুটতে না হয়। আবার অতীতের জমি আন্দোলনের অভিজ্ঞতার কারণে নতুন শিল্পপ্রকল্পের ক্ষেত্রে জমি এবং মানুষের সম্মতির বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে। উন্নয়ন ও কৃষিজীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে কোনও প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
টাটা মোটরসের ন্যানো প্রকল্প সিঙ্গুর ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় পরে অশোক লেল্যান্ডকে ঘিরে নতুন আলোচনা তাই স্বাভাবিকভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার কোনও শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়নের পথে কতটা অগ্রগতি হয়, সেটাই দেখার। আপাতত মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। এবার প্রয়োজন সংস্থার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, বিনিয়োগের নির্দিষ্ট অঙ্ক এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব পরিকল্পনা। সিঙ্গুরে সত্যিই যদি নতুন গাড়ি শিল্পের চাকা ঘোরে, তবে তা এলাকার অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়ে উঠতে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Women cricket score Pratika Rawal 100 not out | প্রতীকার দুরন্ত শতরান, শ্রী চরণীর চার উইকেট! জিম্বাবোয়েকে ৯ উইকেটে উড়িয়ে এক দিনের সিরিজে দুর্দান্ত শুরু ভারতের




