সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পশ্চিম মেদিনীপুর, ৫ অক্টোবর ২০২৬: মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের (Midnapore Medical College and Hospital) পরিকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা নিতে আগ্রহী জেএসডব্লিউ (JSW) গোষ্ঠী। হাসপাতালের সামগ্রিক উন্নয়ন, হৃদ্রোগের চিকিৎসার পরিসর বৃদ্ধি ও সদ্যোজাতদের জন্য বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে রাজ্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন শিল্পপতি সজ্জন জিন্দল (Sajjan Jindal)। বুধবার সন্ধ্যায় নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-এর সঙ্গে তাঁর বৈঠকে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর পাশাপাশি রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী মন্দির সংস্কার এবং নতুন শিল্প বিনিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম মেদিনীপুরের স্বাস্থ্য পরিষেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জানান, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের দায়িত্ব গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জেএসডব্লিউ গোষ্ঠী। এই প্রস্তাবের পিছনে কোনও প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক লাভের লক্ষ্য নেই বলেই তাঁর বক্তব্য। সংস্থাটি সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে হাসপাতালের উন্নয়নে যুক্ত হতে চায়। রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের পরিষেবা আরও উন্নত করার ক্ষেত্রে বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর এমন আগ্রহকে তাই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসা পরিকাঠামো উন্নত করার জন্য একাধিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হৃদ্রোগের চিকিৎসার পরিসর বাড়ানো ও সদ্যোজাত শিশুদের জন্য স্পেশাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট (Special Newborn Care Unit) বা এসএনসিইউ (SNCU) গড়ে তোলা। জন্মের পর শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য এই ধরনের ইউনিট অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকার বহু পরিবারকে সদ্যোজাতদের চিকিৎসার জন্য বড় শহরের হাসপাতালের উপর নির্ভর করতে হয়। মেদিনীপুরে উন্নতমানের পরিষেবা চালু করা গেলে সেই চাপ কিছুটা কমতে পারে।
হৃদ্রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও পরিকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো গেলে জেলার বহু মানুষের সুবিধা হবে। তবে প্রস্তাবিত প্রকল্পে কী ধরনের যন্ত্রপাতি, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে, কত শয্যার ব্যবস্থা থাকবে কিংবা কোন সময়ের মধ্যে কাজ শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে প্রস্তাবের বাস্তব রূপ কী হবে, তা জানতে স্বাস্থ্য দফতরের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য স্বাস্থ্যসচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের নির্ধারিত নিয়ম, শর্ত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেনেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ জেএসডব্লিউ গোষ্ঠীর আগ্রহ থাকলেও হাসপাতালের দায়িত্ব বা উন্নয়ন প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপরেখা এখনও স্থির হয়নি। স্বাস্থ্য দফতরের মূল্যায়ন, সরকারি অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের পরেই এই বিষয়ে অগ্রগতি সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য পরিষেবার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীন মন্দিরগুলির সংস্কার নিয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন সজ্জন জিন্দল। বৈঠকে রাজ্যের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপত্যের সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। জেএসডব্লিউ গোষ্ঠী কয়েকটি পুরনো মন্দিরের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে চায়। কোন কোন মন্দির এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারে, তার তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তালিকা চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলির বর্তমান অবস্থা, সংস্কারের প্রয়োজন এবং কাজের পরিধি নিয়ে পরবর্তী পরিকল্পনা তৈরি হতে পারে। প্রাচীন মন্দিরের সংস্কারের ক্ষেত্রে স্থাপত্যের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ও মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের অবহেলা, আবহাওয়ার প্রভাব কিংবা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেগুলির যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি বাংলার ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলীর পরিচয়ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ধরে রাখা সম্ভব। তবে কোন সংস্থা কী পদ্ধতিতে এই কাজ করবে, তা নির্ভর করবে সরকারের চূড়ান্ত পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট নিয়মের উপর।
বৈঠকের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনীতে বিদ্যুৎ প্রকল্পের অগ্রগতি। সেখানে জেএসডব্লিউ গোষ্ঠীর উদ্যোগে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের ভূমিপুজো করতে পারেন সজ্জন জিন্দল। সেই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে শালবনীর বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়ের কাজ আরও এগিয়ে যাবে। তবে অনুষ্ঠান ও নির্মাণকাজের নির্দিষ্ট সময়সূচি সম্পর্কে চূড়ান্ত ঘোষণা এখনও বাকি। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে শালবনীতে ১,৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পটির আনুমানিক বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কেন্দ্রটি চালু হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পশ্চিম মেদিনীপুর ও আশপাশের অঞ্চলে শিল্পের প্রসারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বড় শিল্প প্রকল্পকে ঘিরে পরিবহণ, নির্মাণ, সরবরাহ ও বিভিন্ন সহায়ক পরিষেবার ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়, স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন সজ্জন জিন্দল। শিল্পাঞ্চলে নতুন প্রকল্প গড়ে উঠলেও স্থানীয় বাসিন্দারা যাতে তার সুফল পান, তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ এবং ভবিষ্যতের শিল্প সম্প্রসারণের সঙ্গে স্থানীয় যুবকদের যুক্ত করতে পারলে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। সূত্রের খবর, বৈঠকে জিন্দল গোষ্ঠীর বিদ্যুৎ ও ইস্পাত শিল্পের পাশাপাশি সিমেন্ট এবং বন্দর ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কোন এলাকায় কী ধরনের নতুন প্রকল্প গড়ে উঠতে পারে, কত টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে কিংবা কবে কাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও নির্দিষ্ট ঘোষণা করা হয়নি। তাই এই আলোচনা আপাতত সম্ভাব্য বিনিয়োগের পর্যায়েই রয়েছে।
মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের উন্নয়ন, প্রাচীন মন্দিরের সংস্কার ও শালবনীর বিদ্যুৎ প্রকল্প, তিনটি পৃথক ক্ষেত্রকে ঘিরে জেএসডব্লিউ গোষ্ঠীর আগ্রহ রাজ্যের সঙ্গে শিল্পপতি সজ্জন জিন্দলের সম্পর্কের নতুন দিক তুলে ধরেছে। তবে এই উদ্যোগগুলির সাফল্য নির্ভর করবে প্রস্তাব কত দ্রুত বাস্তব পরিকল্পনায় রূপ নেয়, সরকারি অনুমোদন কীভাবে মেলে ও প্রকল্পগুলির কাজ কতটা এগোয় তার উপর। বিশেষ করে মেদিনীপুর মেডিক্যালের ক্ষেত্রে রোগীরা কবে থেকে উন্নত পরিষেবা পাবেন, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে হাসপাতালের চিকিৎসা পরিকাঠামো, সদ্যোজাতদের পরিচর্যা এবং হৃদ্রোগের চিকিৎসায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি শালবনীর বিদ্যুৎ প্রকল্প ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের সম্প্রসারণ বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম মেদিনীপুরের শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : KIFF 2026 Dates, Suvendu Adhikari | KIFF 2026-এর দিনক্ষণ ঘোষণা, ১৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, থাকছে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ভূমিকা




