সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বেজিং: প্রেমের সম্পর্ক দীর্ঘ বারো বছরের। একসঙ্গে পথ চলার স্বপ্ন দেখেছিলেন দু’জনে। পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে নতুন জীবনের সূচনা করার প্রস্তুতিও প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার আগেই তাঁদের জীবনে নেমে আসে কঠিন বিপর্যয়। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর মৃত্যু হয় প্রেমিকা ইয়াং লিউয়ের। প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন চিনের যুবক শু শিনান (Xu Shinan)। তবু প্রেমিকা ইয়াং লিউ -এর (Yang Lio) একটি অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করতে শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত নেন, যা আবেগে ছুঁয়ে যায় বহু মানুষকে। প্রেমিকার মৃত্যুর কয়েক দিন পর তাঁর শেষকৃত্যের আয়োজনেই বিয়ের অনুষ্ঠান করেন শিনান। সাদা বিয়ের পোশাকে সাজানো হয়েছিল ইয়াংকে। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতিতে মৃত প্রেমিকার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বিয়ের অঙ্গীকার পাঠ করেন। চিনের ডালিয়ান (Dalian) শহরের এই ঘটনা ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

ঘটনাটি শুধু কোনও আকস্মিক আবেগের প্রকাশ ছিল না। শু শিনান ও ইয়াং লিউয়ের সম্পর্কের শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। তাঁরা দু’জনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ছিলেন। পড়াশোনার সূত্রে পরিচয়, তার পর বন্ধুত্ব ও ধীরে ধীরে প্রেম। দীর্ঘ সময় একে অপরের পাশে থেকে দু’জনে ভবিষ্যৎ জীবন গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ২০১৩ সালের আগস্টে আইনিভাবে বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন করেন দু’জনে। কিন্তু সামাজিকভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান করে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই অসুস্থ হয়ে পড়েন ইয়াং। ফলে তাঁদের আনন্দের প্রস্তুতি থমকে যায়। ২০১৪ সালের মার্চ মাসে ইয়াংয়ের স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৮ বছর। চিকিৎসার জন্য অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশনের মতো একাধিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার সময় শিনান নিয়মিত পাশে থেকেছেন। অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেও ইয়াং নিজের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন বলে তাঁর সঙ্গীর বক্তব্য থেকে জানা যায়। চিনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ওয়েইবোতেও (Weibo) নিজের চিকিৎসা ও অসুস্থতার অভিজ্ঞতাও তিনি তুলে ধরতেন।
চিকিৎসার এক পর্যায়ে ইয়াংয়ের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছিল। সেই সময় দু’জনে আবার বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা ভাবতে শুরু করেন। নতুন করে সংসার পাতার স্বপ্নও তাঁরা দেখতে থাকেন। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০১৮ সালে ক্যানসার ফের ফিরে আসে আর ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে বলে একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার আশায় শিনান ও ইয়াং দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসার খোঁজ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোগের সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হতে পারেননি ইয়াং। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর কোমায় চলে যান ইয়াং। তার পর প্রায় এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১৪ অক্টোবর তার দেহাবসান হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৪ বছর।

শেষ সময়ে ইয়াং আর শিনানকে চিনতে পারছিলেন না বলে সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন শিনান। প্রিয় মানুষের সঙ্গে শেষবারের মতো তিনি কথা বলার সুযোগও পাননি। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য মুহূর্ত ও ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা এক মুহূর্তে যেন থেমে যায়। কিন্তু, ইয়াংয়ের মৃত্যুর পরও তাঁর পাশে ছিলেন শিনান। বিভিন্ন সংবাদ সূত্রে খবর, চিনের একটি প্রচলিত রীতি মেনে মৃত্যুর পর টানা সাত দিন তিনি প্রেমিকার দেহের কাছেই ছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই তিনি ইয়াংয়ের অপূর্ণ বিয়ের স্বপ্ন পূরণের সিদ্ধান্ত নেন। জানা যায়, মৃত্যুর আগে ইয়াং অনলাইনে বিয়ের পোশাক দেখছিলেন। তাঁর কেনাকাটার তালিকায় বিয়ের পোশাকের সন্ধান পেয়ে শিনান আরও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। প্রেমিকার জন্য সুন্দর একটি বিয়ের পোশাক কেনার ইচ্ছা তাঁরও ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই পোশাক পরিয়েই ইয়াংকে তিনি বিয়ের সাজে সাজানোর ব্যবস্থা করেন।
২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর ডালিয়ানের একটি শেষকৃত্য কেন্দ্রে আয়োজন করা হয় বিয়ে ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে অনুষ্ঠানের তারিখ ২০ অক্টোবর বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়াংকে সাদা বিয়ের পোশাক পরানো হয়েছিল। তাঁকে ঘিরে রাখা হয়েছিল গোলাপি গোলাপ দিয়ে। একটি প্রতিবেদনে ফুলের সংখ্যা ১৬৯ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উপস্থিত ছিলেন দুই পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনেরা। তাঁদের সামনেই ইয়াংয়ের উদ্দেশ্যে বিয়ের অঙ্গীকার পাঠ করেন শিনান। জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত হওয়ার কথা ছিল যে অনুষ্ঠান, সেটিই পরিণত হয়েছিল গভীর শোকের এক আয়োজনে। অনুষ্ঠানে শিনানের বক্তব্যও উপস্থিত মানুষকে আবেগাপ্লুত করেছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, দেরিতে হলেও ইয়াংয়ের বিয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে তাঁর ইচ্ছার একটি অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রেমিকার ইচ্ছা পূরণ করাই তখন তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর বক্তব্যের মর্ম ছিল, ‘তোমার ইচ্ছা পূরণ করতে পারি, তোমাকে বিয়ের পোশাক পরাতে পারি, এটাই এখন আমার করার মতো কাজ।’ বিয়ের অঙ্গীকার পাঠের সময় নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত কান্না আটকাতে পারেননি শিনান।
এই বিয়ে অবশ্য প্রচলিত অর্থে কোনও নতুন দাম্পত্য জীবনের সূচনা করেনি। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের সম্পর্কের একটি বেদনাময় পরিণতি হয়ে উঠেছিল অনুষ্ঠানটি। ইয়াংয়ের মৃত্যুর পর তাঁর অপূর্ণ ইচ্ছাকে মর্যাদা দেওয়ার জন্যই শিনান এমন আয়োজন করেছিলেন বলে উল্লেখ। দুই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর ইয়াংয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। আনন্দের সাজ, ফুল ও বিয়ের অঙ্গীকারের পাশেই ছিল চিরবিদায়ের আয়োজন। একই অনুষ্ঠানে জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এবং সবচেয়ে কঠিন বিচ্ছেদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল শিনানকে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর চিনের বাইরেও বহু মানুষের নজর কেড়েছিল। বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যমে তাঁদের সম্পর্কের কাহিনি প্রকাশিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শিনানের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কেউ তাঁর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার প্রশংসা করেন, কেউ আবার এমন পরিস্থিতির গভীর মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন। তবে এই ঘটনার কেন্দ্রে ছিল এক নারীর দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই, তাঁর জীবনের একটি অপূর্ণ স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন পূরণে প্রেমিকের শেষ চেষ্টা। উল্লেখ্য, স্তন ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত হয়ে ইয়াংয়ের জীবন থেমে গেলেও শিনানের কাছে তাঁদের বারো বছরের সম্পর্কের স্মৃতি মুছে যায়নি। যে বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য তাঁরা একসময় প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তা আর জীবিত অবস্থায় সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তাই মৃত্যুর পর প্রেমিকার শেষ ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে শিনান যে আয়োজন করেছিলেন, তা হয়ে ওঠে এক ব্যতিক্রমী ও মর্মস্পর্শী ঘটনা। ডালিয়ানের সেই বিয়ের আসরে ছিল না নতুন সংসারের উচ্ছ্বাস; ছিল দীর্ঘদিনের ভালবাসা, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা আর অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের একটি শেষ প্রয়াস।
তেমনি শু শিনান ও ইয়াং লিউ-এর বর্তমান সময়ের বড় উদাহরণ। এই কারণেই যে, সম্পর্কগুলি অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে আর মোহের জালে জীর্ণ তখন শু শিনানের মানসিকতা প্রেমিকার দেহাবসানের পরেও তাঁদের প্রেমের বা আত্মার সম্পর্ককে গভীর ভাবে সম্মানিত করল। ভাঙতে পারে সবাই, কিন্তু গড়তে পারে ক’জন? বর্তমান প্রজন্মের মানুষজন যদি এই কথাটা ভাবতেন, তাহলে সমাজ থেকে ডিভোর্স, সম্পর্কের ভাঙন কমে যেত নাকি? শু শিনান উচ্চ মানসিকতার জন্য এত বছর পরেও সকলের কাছে সম্মানিত। এবং ভবিষ্যতের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবেন শু শিনান ও ইয়াং লিউ। গভীর প্রেম এমনি হওয়া উচিৎ।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Govinda Sunita relationship, Sunita Ahuja interview | ৪০ বছরের দাম্পত্যের পর ‘শুধু সুনীতা’ হতে চান তিনি, গোবিন্দাকে ঘিরে অভিমানে কী বললেন স্ত্রী?



