সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কেন্দ্রের চাপের মাঝেই বড় সিদ্ধান্ত নিল মেটা (Meta)। সংস্থার প্ল্যাটফর্মে শিশুদের যৌন নিগ্রহ বা শোষণ সংক্রান্ত বেআইনি কনটেন্টের সন্ধান মিললে এ বার ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সরাসরি তথ্য জানানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে মেটা। ফলে ইনস্টাগ্রাম (Instagram), ফেসবুক (Facebook) -সহ মেটার প্ল্যাটফর্মে শিশুদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ ধরা পড়লে তা শুধু কনটেন্ট সরিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও পৌঁছে যাবে তথ্য। মঙ্গলবার প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ।
কয়েক মাস ধরে ভারতে মেটার প্ল্যাটফর্মে শিশুদের যৌন শোষণমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ঘিরে চাপ বাড়ছিল। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামে অর্থের বিনিময়ে বেআইনি কনটেন্টের বিজ্ঞাপন দেখানোর অভিযোগ সামনে আসার পর কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক মেটার কাছে জবাব চেয়েছিল। জুলাই মাসে বিবিসি-র এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইনস্টাগ্রামে এমন কিছু অর্থপ্রদত্ত বিজ্ঞাপন দেখা গিয়েছিল, যেগুলি শিশুদের যৌন শোষণ সংক্রান্ত বেআইনি কনটেন্টের দিকে ব্যবহারকারীদের নিয়ে যাচ্ছিল। সেই প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পরই ভারত সরকার মেটার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের পথে হাঁটে। সরকারের নির্দেশ ছিল, শিশুদের যৌন শোষণমূলক কনটেন্ট প্রচার বা তার নাগাল সহজ করে দেয় এমন বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। একই সঙ্গে কী ভাবে মেটার বিজ্ঞাপন যাচাই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই ধরনের প্রচার চলে গেল, তা নিয়েও সংস্থার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। কেন্দ্রের এই অবস্থানের পর মেটা জানিয়েছিল, শিশুদের শোষণের বিরুদ্ধে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে এবং বেআইনি কনটেন্ট শনাক্ত ও সরানোর জন্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু বিতর্ক সেখানেই থামেনি। সেপ্টেম্বরেও মেটার প্ল্যাটফর্মে শিশুদের যৌন শোষণ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন থাকার অভিযোগ সামনে আসে। ওয়াশিংটনভিত্তিক টেক ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্ট (Tech Transparency Project) দাবি করে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে শতাধিক আপত্তিকর বিজ্ঞাপন পাওয়া গিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে ৩৩২টি বিজ্ঞাপনের কথা বলা হয়, যার মধ্যে ৮৪টি ভারতে চলেছিল বলে দাবি করা হয়। আগস্ট মাসেই ভারতে একাধিক বিজ্ঞাপন সক্রিয় ছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। এর পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয় মেটার জন্য। শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে জাতীয় স্তরের একাধিক সংস্থাও বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে। জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন বা এনসিপিসিআর (NCPCR) মেটা ইন্ডিয়ার কর্তাদের তলব করে। কমিশনের পদক্ষেপের পিছনে ছিল ইনস্টাগ্রামে শিশুদের যৌন শোষণ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রচারের অভিযোগ। সেপ্টেম্বরের শুরুতে মেটা ইন্ডিয়ার শীর্ষ কর্তাদের কমিশনের সামনে হাজির হতে বলা হয় এবং অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই মেটার নতুন সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি সূত্রের খবর, এখন থেকে মেটার প্ল্যাটফর্মে শিশুদের যৌন নিগ্রহ বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে তা ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। অর্থাৎ কোনও বেআইনি কনটেন্ট শনাক্ত হওয়ার পরে শুধু সেটি সরিয়ে দেওয়াই শেষ পদক্ষেপ হবে না। তদন্তের প্রয়োজন থাকলে সংশ্লিষ্ট তথ্য পুলিশের কাছেও যাবে। এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ইন্ডিয়ান সাইবারক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার বা আইফোরসি (I4C)। মেটা ভারতীয় সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিযোগ ও প্রয়োজনীয় তথ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে। আইফোরসি -এর ব্যবস্থার সঙ্গে দেশের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এবং বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশও যুক্ত রয়েছে। ফলে অনলাইনে শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ সামনে এলে তা তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর পথ আরও সরাসরি হতে পারে।
মেটার পক্ষ থেকেও শিশুদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। সংস্থার দাবি, শিশুদের শোষণমূলক কনটেন্টের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর নীতি রয়েছে ও এমন কনটেন্ট শনাক্ত করার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। মেটা জানিয়েছে, বিশ্ব জুড়ে তারা শিশু শোষণ সংক্রান্ত বিপুল সংখ্যক কনটেন্ট সরিয়ে দেয় এবং সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়। সংস্থার নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম থেকে শিশু শোষণ সংক্রান্ত ৩৬ মিলিয়নেরও বেশি কনটেন্ট সরানো হয়েছিল। ভারতের ক্ষেত্রে মেটা আরও জানিয়েছে, প্রযোজ্য আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিশু শোষণের ঘটনা সম্পর্কে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে তথ্য জানানোর ব্যবস্থা তাদের রয়েছে। সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতে এই ধরনের রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেন বা এনসিএমইসি (NCMEC) -এর ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হয়। নতুন করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি তথ্য আদানপ্রদানের সিদ্ধান্ত সেই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
কেন্দ্রের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে কঠোর। সরকারি সূত্রের বক্তব্য, অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও রকম আপস করা হবে না। যে সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম শিশুদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে না, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ফলে শুধু মেটা নয়, ভারতে কাজ করা অন্যান্য সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলির কাছেও এই সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শিশুদের যৌন শোষণ বা নিগ্রহ সংক্রান্ত বেআইনি কনটেন্টের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়ার বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই বিতর্কের সূত্রপাত মূলত ইনস্টাগ্রামের বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাকে ঘিরে। জুলাইয়ে প্রকাশিত বিবিসি আই (BBC Eye)-র অনুসন্ধানে অভিযোগ করা হয়েছিল, কিছু অর্থপ্রদত্ত বিজ্ঞাপন ব্যবহারকারীদের এমন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছিল, যেখানে শিশুদের যৌন শোষণ সংক্রান্ত বেআইনি উপাদান পাওয়া যাচ্ছিল। বিজ্ঞাপনগুলি কী ভাবে মেটার অনুমোদন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেল, সেটিই হয়ে উঠেছিল বড় প্রশ্ন। মেটা পরে জানায়, তারা ওই বিজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং আরও কিছু লিঙ্ক বন্ধ করেছে। এরপরও নতুন অভিযোগ সামনে আসায় মেটার কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরাল হয়। শিশুদের সুরক্ষার মতো গুরুতর বিষয়ে কেবল স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির উপর নির্ভর করা যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। মেটা অবশ্য জানিয়েছে, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত করে এবং অপরাধীদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরানোর চেষ্টা চালায়। সংস্থার দাবি, অপরাধীরা নিয়মিত তাদের শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে, তাই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাও নিয়মিত উন্নত করা হচ্ছে।
এখন মেটার নতুন সিদ্ধান্তের পর নজর থাকবে বাস্তবে এই রিপোর্টিং ব্যবস্থা কত দ্রুত কাজ করে তার দিকে। কোনও শিশুকে কেন্দ্র করে বেআইনি কনটেন্ট শনাক্ত হলে সেটি কত সময়ে সরানো হচ্ছে, কত দ্রুত সংশ্লিষ্ট তথ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পৌঁছচ্ছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত কতটা এগোচ্ছে—এই তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্ট এক বার ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত বহু মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই শনাক্তকরণ, অপসারণ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তথ্য দেওয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান কমানোই এখন বড় লক্ষ্য। মেটার এই পদক্ষেপকে কেন্দ্রের চাপের ফল হিসেবে দেখা হলেও, বিষয়টির গুরুত্ব আরও বড় জায়গায়। শিশুদের নিরাপত্তা এখন শুধু পরিবার, স্কুল বা স্থানীয় প্রশাসনের বিষয় নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির দায়িত্বও তার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের মতো বিপুল ব্যবহারকারীর প্ল্যাটফর্মে কোনও বেআইনি কনটেন্ট ঢুকে পড়লে তার প্রভাব দ্রুত ছড়াতে পারে। ফলে প্রযুক্তি সংস্থার দায়িত্ব কেবল আপত্তিকর কনটেন্ট মুছে ফেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, আইনি তদন্তের প্রয়োজনে তথ্য সরবরাহ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ভারতে মেটার বিরুদ্ধে শিশু সুরক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক অভিযোগগুলির পরিপ্রেক্ষিতে তাই নতুন সিদ্ধান্ত যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এখন থেকে শিশুদের যৌন নিগ্রহ বা শোষণ সংক্রান্ত কনটেন্ট শনাক্ত হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানানোর বিষয়ে মেটার সম্মতি কেন্দ্রের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এই ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ, দ্রুততা এবং নিয়মিত নজরদারিই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে অনলাইন দুনিয়ায় শিশুদের নিরাপত্তা কতটা বাড়ল।
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
আরও পড়ুন : Freshwater beneath ocean | মহাসাগরের নিচে মিষ্টি জলের ভান্ডার! ভবিষ্যতের পানীয় জল সঙ্কট মেটাতে আসছে নতুন আশার আলো




