সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি: ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের মেনু এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর দেওয়া নৈশভোজে কোনও আমিষ পদ না থাকায় বিরোধী রাজনৈতিক মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে সামনে রেখে কেন সম্পূর্ণ নিরামিষ মেনু রাখা হল, তা নিয়েই শুরু হয়েছে বিতর্ক। আর সেই বিতর্কের মাঝেই প্রায় দুই দশক পুরনো একটি ঘটনার কথা সামনে এনে আলোচনায় নতুন মোড় আনলেন আইসল্যান্ডের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ওলাফুর রাগনার গ্রিমসন (Olafur Ragnar Grímsson)। সামাজিক মাধ্যমে ব্রিকসের নৈশভোজের নিরামিষ মেনু নিয়ে সমালোচনামূলক একটি পোস্টের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে গ্রিমসন স্মরণ করেছেন ভারতের প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম (A. P. J. Abdul Kalam) -এর আইসল্যান্ড সফরের কথা। তাঁর বক্তব্য, ভারতের রাষ্ট্রপতির প্রথম নর্ডিক দেশ সফরের সময় তিনি নিজে যে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন, সেখানেও সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল। সময়টা ছিল ২০ বছরেরও বেশি আগে। আরও তাৎপর্যের বিষয়, সেই আয়োজন হয়েছিল আইসল্যান্ডে, যেখানে নিরামিষভোজী খাবারের পরিসর ভারতের তুলনায় অনেক সীমিত।
গ্রিমসনের এই মন্তব্য সামনে আসতেই ব্রিকস নৈশভোজের মেনু নিয়ে চলা রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে কোনও নির্দিষ্ট খাদ্যরীতি বেছে নেওয়া একেবারে নতুন ঘটনা নয়। বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে অতিথির পছন্দ, আয়োজক দেশের সংস্কৃতি ও অনুষ্ঠানের বিশেষ ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবারের তালিকা তৈরি করার নজির রয়েছে। দিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনের নৈশভোজেও ভারতীয় খাবারের ঐতিহ্য ও দেশীয় খাদ্যশস্যকে সামনে রাখা হয়েছিল। মেনুতে ছিল খান্ডভি, পনির লাবাবদার, গুচ্ছি মারমিক, মিলেট পোলাও, মাশরুম গালৌটি ও জিলিপির মতো বিভিন্ন পদ। অর্থাৎ শুধু একটি নির্দিষ্ট ধরনের রান্না নয়, ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির বিভিন্ন প্রান্তকে তুলে ধরার চেষ্টা ছিল মেনুতে।
এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মিলেট বা ‘শ্রী অন্ন’। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের খাদ্যনীতিতে মিলেটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুষ্টিগুণের পাশাপাশি কম জলনির্ভর কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে তুলনামূলক সামঞ্জস্যপূর্ণ চাষের বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের নৈশভোজে মিলেটকে সামনে রাখার মধ্যে ভারতের খাদ্যসংস্কৃতি ও কৃষির একটি দিক তুলে ধরার প্রয়াস দেখা যায়। কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে মূলত মেনুতে আমিষ খাবারের অনুপস্থিতি নিয়ে। কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) সামাজিক মাধ্যমে এই প্রসঙ্গে সরব হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশের বড় অংশের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে এই মেনুর কোনও মিল নেই। তিনি দাবি করেছেন, ভারতের ৮০ শতাংশ মানুষ আমিষ খান। নিজের বক্তব্যে ভারতীয় আমিষ রান্নার বৈচিত্র্যের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
রাহুলের পাশাপাশি কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরাও (Pawan Khera) বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রকে নিশানা করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির এত বড় পরিসর থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক স্তরের একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে কেন শুধু নিরামিষ পদ বেছে নেওয়া হল। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে যে অসংখ্য আমিষ রান্না রয়েছে, সেগুলিও দেশের খাদ্যঐতিহ্যের অংশ বলে দাবি বিরোধীদের। রাজনৈতিক আক্রমণের কেন্দ্রে তাই শুধু খাবারের তালিকা নয়, খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্যের প্রশ্নটিও উঠে এসেছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলের খাবারের ধরন এক নয়। কোথাও নিরামিষ রান্নার আধিপত্য, কোথাও মাছ-মাংসের পদ দৈনন্দিন খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের মতো অনুষ্ঠানে কোন ধরনের খাবার থাকবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
গ্রিমসনের পুরনো স্মৃতি সেই বিতর্কের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত সামনে এনেছে। আইসল্যান্ডের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মনে করিয়ে দিয়েছেন, ২০ বছরেরও বেশি আগে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আবদুল কালামকে সম্মান জানাতে তাঁর দেওয়া নৈশভোজেও সম্পূর্ণ নিরামিষ মেনু রাখা হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল এমন একটি দেশে, যেখানে নিরামিষভোজীদের জন্য খাবারের বিকল্প তুলনামূলক ভাবে কম। কালাম ও গ্রিমসনের সেই সময়কার সাক্ষাৎ ও রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের প্রসঙ্গ ফের সামনে আসায় ব্রিকসের বর্তমান বিতর্কও অন্য মাত্রা পেয়েছে। এক দিকে বিরোধীরা ভারতের খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্যের কথা বলছেন, অন্য দিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির পুরনো নজির দেখিয়ে বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মেনু সব সময় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের সরাসরি প্রতিচ্ছবি হয় না।
ব্রিকস সম্মেলনের নৈশভোজের পরিকল্পনায় ভারতীয় সংস্কৃতির কোন দিকটি তুলে ধরা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অতিথিদের সামনে দেশীয় রান্না পরিবেশন করার পাশাপাশি স্থানীয় খাদ্যশস্যের গুরুত্ব তুলে ধরার সুযোগ ছিল এই অনুষ্ঠানে। সেই কারণেই মিলেট বা শ্রী অন্নের উপস্থিতিকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। খান্ডভি, পনির, গুচ্ছি, মাশরুম এবং জিলিপির মতো পদও ভারতের বিভিন্ন খাদ্যরীতির প্রতিনিধিত্ব করেছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ বহু সময় শুধু খাওয়াদাওয়ার আয়োজন থাকে না। আয়োজক দেশ তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষি, খাদ্যশস্য ও জীবনযাপনের নানা দিক তুলে ধরার সুযোগ পায়। ফলে মেনু নির্বাচনের মধ্যেও কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা থাকে। দিল্লির ব্রিকস নৈশভোজেও সেই দিকটি বিবেচনায় রাখা হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্ক থামেনি। বিরোধীদের বক্তব্য, ভারতীয় খাবারের বৈচিত্র্য দেখাতে হলে আমিষ ও নিরামিষ, দুই ধরনের পদই রাখা যেত। তাঁদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে দেশের খাদ্যসংস্কৃতির পূর্ণ পরিসর তুলে ধরার ক্ষেত্রে কোনও একটি খাদ্যরীতিকে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল কি না। অন্য দিকে, গ্রিমসনের মন্তব্য রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত সামনে এনেছে। তাঁর স্মৃতিতে আবদুল কালামের আইসল্যান্ড সফরের সেই নৈশভোজ আজকের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ তৈরি করেছে। দুই ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান দুই দশকেরও বেশি হলেও রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে নিরামিষ মেনু বেছে নেওয়ার বিষয়টি যে নতুন নয়, তাঁর বক্তব্যে সেটিই উঠে এসেছে। ফলে ব্রিকস ডিনারের মেনু এখন শুধু খাবারের তালিকা নয়, রাজনৈতিক বক্তব্য, খাদ্যসংস্কৃতি এবং কূটনৈতিক আয়োজন, তিনটি ক্ষেত্রের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এক দিকে রাহুল গান্ধী ও পবন খেরার প্রশ্ন, অন্য দিকে ওলাফুর রাগনার গ্রিমসনের কালাম-স্মৃতি, দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি একই ঘটনাকে ঘিরে সামনে এসেছে। ব্রিকস সম্মেলনের সেই নৈশভোজ শেষ হলেও মেনু নিয়ে বিতর্ক আপাতত শেষ হওয়ার পথে নয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi BRICS Speech, Rare Earth Minerals | জিনপিংয়ের সামনেই বিরল মৃত্তিকা নিয়ে মোদীর কড়া বার্তা, প্রযুক্তি-খনিজকে হাতিয়ার করার বিরুদ্ধে সরব ভারত




