মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ প্যারিস : দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। ফের মঞ্চে সেলিন দিওঁ (Celine Dion)। শনিবার প্যারিসের একটি মঞ্চে প্রায় ৩০ হাজার দর্শকের সামনে গান গেয়ে আবেগে ভেসে গেলেন কানাডার এই বিশ্বখ্যাত গায়িকা। দীর্ঘ অসুস্থতা, একের পর এক অনুষ্ঠান বাতিল ও মঞ্চ থেকে দূরে থাকার পর আবারও হাজার হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে গান গাইলেন তিনি। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আবেগ সামলাতে পারেননি সেলিন। চোখের জল মুছতে মুছতে দর্শকদের উদ্দেশ্য করে জানালেন, এত দিন তাঁদের থেকে দূরে থাকাটা কতটা কঠিন ছিল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেলিন বলেন, ‘আমি নিজেকে কথা দিয়েছিলাম, কাঁদব না। কিন্তু আপনাদের দেখে আমি খুব খুশি। আপনাদের খুব মনে পড়ত।’ তাঁর কথার পরই আবেগঘন হয়ে ওঠে গোটা অনুষ্ঠান। দীর্ঘ সময় ধরে প্রিয় শিল্পীকে মঞ্চে দেখতে না পাওয়া দর্শকরাও উচ্ছ্বাসে তাঁকে স্বাগত জানান। সেলিনের প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একটি গানের অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি, শিল্পী এবং তাঁর অনুরাগীদের মধ্যে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পরে ফের মিলনের মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল।
‘মাই হার্ট উইল গো অন’ (My Heart Will Go On) গানটির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে আরও বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন সেলিন। জেমস ক্যামেরনের (James Cameron) ‘টাইটানিক’ (Titanic) ছবির সঙ্গে যুক্ত এই গান তাঁর কণ্ঠকে পৌঁছে দিয়েছিল বিশ্বের অগণিত শ্রোতার কাছে। পাশাপাশি ‘দ্য পাওয়ার অফ লভ’ (The Power of Love) -সহ একাধিক গানের জন্য আন্তর্জাতিক সঙ্গীতজগতে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেন তিনি। পাঁচটি গ্র্যামি (Grammy Awards) -সহ বহু পুরস্কার রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া সঙ্গীতশিল্পীদের তালিকাতেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁর নাম রয়েছে। কিন্তু সাফল্যের সেই দীর্ঘ পথের মাঝেই আচমকা বড় ধাক্কা আসে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে সেলিন প্রকাশ্যে জানান, তিনি ‘স্টিফ পার্সন সিনড্রোম’ (Stiff Person Syndrome) -এ আক্রান্ত। এটি একটি বিরল স্নায়বিক অসুস্থতা, যার ফলে শরীরের পেশি শক্ত হয়ে যেতে পারে আর আচমকা তীব্র খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই শারীরিক সমস্যার প্রভাব হাঁটা, চলাফেরা, কথা বলা এবং গান গাওয়ার মতো স্বাভাবিক কাজেও পড়তে পারে।
অসুস্থতার কারণে সেলিনকে তাঁর পেশাগত জীবন থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকতে হয়েছে। একাধিক অনুষ্ঠান এবং সফর বাতিল করতে হয়েছিল। ২০২০ সালের পর দীর্ঘ সময় তিনি কোনও পূর্ণাঙ্গ মঞ্চানুষ্ঠান করতে পারেননি। যে শিল্পী নিয়মিত ভাবে বিশ্বের নানা প্রান্তে দর্শকদের সামনে গান গাইতেন, তাঁকেই তখন নিজের শারীরিক অবস্থার সঙ্গে লড়াই করে দিন কাটাতে হয়েছে। ধীরে ধীরে জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতিও কমে যায়। মঞ্চে ফেরার ইচ্ছা কখনও হারিয়ে ফেলেননি সেলিন। ২০২৪ সালে প্যারিস অলিম্পিক্সের (Paris Olympics) সমাপ্তি অনুষ্ঠানে একটি গান গেয়ে তিনি ফের মঞ্চে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ কনসার্ট ছিল না। ফলে শনিবারের অনুষ্ঠান তাঁর কাছে আরও বড় প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ বিরতির পর দর্শকদের সামনে একটি পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ পেলেন তিনি।
অসুস্থতার প্রভাব তাঁর কণ্ঠেও পড়েছে বলে এর আগে জানিয়েছিলেন সেলিন। কখনও কখনও তাঁর মনে হয়েছে, যেন গলা চেপে ধরা হচ্ছে। নিজের ইচ্ছেমতো কণ্ঠস্বরের ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। একজন পেশাদার গায়িকার কাছে এই সমস্যার গুরুত্ব কতটা, তা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। গানই যেখানে তাঁর পেশা ও পরিচয়ের অন্যতম প্রধান অংশ, সেখানে নিজের কণ্ঠের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা ছিল অত্যন্ত কঠিন অভিজ্ঞতা। শুধু কণ্ঠ নয়, শরীরের একাধিক অংশেও এই অসুস্থতার প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছিলেন সেলিন। পেট, মেরুদণ্ড, পাঁজর ও পায়ের পেশিতে খিঁচুনি হওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন তিনি। এমনকি রান্না করার সময় হাত বা আঙুল শক্ত হয়ে একই অবস্থায় আটকে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন। তীব্র খিঁচুনির সময়ে তাঁর পাঁজরের হাড় পর্যন্ত ভেঙে গিয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন এই গায়িকা।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই মঞ্চে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়া সেলিনের জন্য সহজ ছিল না। ‘স্টিফ পার্সন সিনড্রোম’-এর সম্পূর্ণ নিরাময়ের কোনও চিকিৎসা এখনও নেই। তাই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই এগোতে হয়েছে তাঁকে। সেই লড়াইয়ের পরে প্যারিসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গাওয়ার মুহূর্তটি তাই তাঁর কাছে অত্যন্ত আবেগের হয়ে ওঠে। দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে সেলিন আরও বলেন, ‘আমি কথা দিয়েছিলাম, ফিরে আসব। আবার মঞ্চে দাঁড়াব। আজ আমি এখানে। আপনাদের জন্য গান গাইছি, নিজের জন্যও গাইছি।’ তাঁর এই বক্তব্যে ধরা পড়ে দীর্ঘ বিরতির পরে আবার নিজের পরিচিত জগতে ফিরে আসার অনুভূতি। মঞ্চ, গান এবং দর্শক, তিনটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে কতটা গভীর, সেই অনুভূতিই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কথায়। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে আবেগ আরও বেড়ে যায়। সেলিন দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি আজ যা, তা সবই আপনাদের ভালবাসার জন্য।’ তাঁর কণ্ঠে তখন ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পরে পাওয়া স্বস্তি এবং অনুরাগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। গায়িকার কথা শুনে দর্শকরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এত দিন পরে প্রিয় শিল্পীকে সামনে পেয়ে তাঁদের উচ্ছ্বাসও বারবার প্রকাশ পেয়েছে করতালিতে।
সেলিনের প্রত্যাবর্তনের এই মঞ্চ তাঁর সঙ্গীতজীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রইল। কয়েক বছর আগে যেখানে অসুস্থতার কারণে গান গাওয়া নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে আবার হাজার হাজার দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠান করা নিঃসন্দেহে তাঁর জীবনের বড় মুহূর্ত। তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কঠিন এক লড়াইয়ের ইতিহাসও। ‘মাই হার্ট উইল গো অন’-এর সেই কণ্ঠ আবার প্যারিসের মঞ্চে শোনা গেল। দর্শকদের সামনে গান গেয়ে সেলিন যেন নিজের বহু দিনের প্রতীক্ষারও অবসান ঘটালেন। চোখে জল, মুখে হাসি এবং দর্শকদের উদ্দেশে কৃতজ্ঞতা, শনিবারের রাতের সেই ছবিই হয়ে থাকল তাঁর প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতি। দীর্ঘ অসুস্থতার পরে মঞ্চে ফিরে সেলিন জানিয়ে দিলেন, গান থেকে দূরে থাকা গেলেও গানকে নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Priyanka Chopra Nick Jonas first message, Nick Jonas asked photo timestamp Priyanka | প্রথম আলাপেই প্রমাণ চেয়েছিলেন নিক! প্রিয়াঙ্কার মুখে ফাঁস প্রেমের অজানা গল্প, ভাইরাল পুরনো চ্যাট




