সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে ফের তুমুল বিতর্ক। ভেনেজ়ুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো (María Corina Machado) নিজের প্রাপ্ত নোবেল শান্তি পুরস্কার স্বেচ্ছায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) হাতে তুলে দেওয়ার পরেই শুরু হয়েছে প্রশ্নের ঝড়। নোবেল কী আদৌ এভাবে কাউকে দিয়ে দেওয়া যায়? তাতে কী বিজয়ীর পরিচয় বদলে যায়? পুরস্কারের বিপুল অর্থের মালিক কে হবেন? এই সমস্ত জল্পনার মাঝেই নরওয়ের নোবেল কমিটি (Norwegian Nobel Committee) আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেছে।প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে মাচাদোর নাম ঘোষণার পর থেকেই বিতর্কের বীজ রোপিত হয়েছিল। কারণ, তারও আগে ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে এই পুরস্কার তাঁরই প্রাপ্য। তাঁর যুক্তি ছিল, সাম্প্রতিক কালে বিশ্বের আটটি যুদ্ধ থামাতে তিনি মুখ্য ভূমিকা নিয়েছেন। সেই ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার কৃতিত্বেই’ নোবেল তাঁর পাওয়া উচিত বলে এমনি তিনি দাবি করেছিলেন। যদিও নোবেল কমিটি শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে নয়, ভেনেজ়ুয়েলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মুখ হিসেবে মাচাদকেই সম্মানিত করে।
নোবেল ঘোষণার পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। গত ৩ জানুয়ারি আমেরিকার সেনাবাহিনী ভেনেজ়ুয়েলায় অভিযান চালিয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে (Nicolás Maduro) সস্ত্রীক আটক করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেন মাচাদো। এরপরই তিনি হোয়াইট হাউসে গিয়ে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন এবং জানান, তিনি এই সম্মান ট্রাম্পকেই ‘উৎসর্গ’ করছেন। হোয়াইট হাউস সূত্র উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প এই পুরস্কার নিজের কাছেই রাখতে আগ্রহী। এই ঘটনাতেই প্রশ্ন ওঠে, নোবেল পুরস্কার কী ব্যক্তিগত সম্পত্তি, না কি তা কোনওভাবেই হস্তান্তরযোগ্য নয়? আরও বড় প্রশ্ন, এতে কি নোবেল বিজয়ীর নাম বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে? এই সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটাতে বিবৃতি দেয় নরওয়ের নোবেল কমিটি।বিবৃতিতে পরিষ্কার করে বলা হয়, ‘নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক, ডিপ্লোমা কিংবা পুরস্কারমূল্যের অর্থ, এই সবের উপর পূর্ণ অধিকার থাকে সেই ব্যক্তির, যাঁকে নোবেল কমিটি বিজয়ী হিসেবে মনোনীত করেছে। তিনি সেগুলি নিজের কাছে রাখতে পারেন, কাউকে দান করতে পারেন, বিক্রি করতে পারেন বা উৎসর্গ করতে পারেন। এই বিষয়ে নোবেল ফাউন্ডেশনের কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই।’ একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, ইতিহাসের পাতায় নোবেল বিজয়ীর নাম কখনওই বদলায় না। পুরস্কারটি যাঁকে দেওয়া হয়েছে, সম্মান ও স্বীকৃতি চিরকাল তাঁর নামেই যুক্ত থাকবে।
নোবেল কমিটির এই ব্যাখ্যায় ট্রাম্প বা মাচাদোর নাম আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, বিবৃতির সময় ও প্রেক্ষাপট থেকেই পরিষ্কার যে মাচাদোর সিদ্ধান্তকে ঘিরে ওঠা বিতর্কের জবাব দিতেই এই অবস্থান। নোবেল কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, মাচাদো কোনও নিয়ম ভাঙেননি। তিনি তাঁর পুরস্কার কী করবেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা তাঁর ছিল।কিন্তু, আর্থিক দিকটি নিয়েও কৌতূহল কম নয়। নোবেল শান্তি পুরস্কারের সঙ্গে শুধু পদকই নয়, একটি ডিপ্লোমা এবং প্রায় ১১ লক্ষ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার অর্থমূল্য যুক্ত থাকে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। প্রশ্ন উঠেছিল, এই অর্থও কী ট্রাম্পের হাতে যাবে? নোবেল কমিটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অর্থও মূল বিজয়ীর সম্পত্তি। অর্থাৎ, মাচাদো চাইলে সেই অর্থ ট্রাম্পকে দিতে পারেন, আবার চাইলে অন্য কোনও সামাজিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নোবেল পুরস্কার নিয়ে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়। অতীতেও একাধিক নোবেলজয়ী তাঁদের পদক বিক্রি বা দান করেছেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাটোভ (Dmitry Muratov) নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক নিলামে তুলে প্রায় ১০ কোটি ডলারে বিক্রি করেছিলেন। সেই অর্থ তিনি ইউক্রেনের উদ্বাস্তু শিশুদের সাহায্যের জন্য রাষ্ট্রপুঞ্জের শিশুসুরক্ষা তহবিলে দান করেন। সেই ঘটনাতেও নোবেল কমিটি স্পষ্ট করেছিল, পুরস্কার প্রাপ্তির মর্যাদা কোনওভাবেই বদলায় না। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মাচাদোর এই পদক্ষেপ বড় রাজনৈতিক ইঙ্গিতও বহন করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং ভেনেজ়ুয়েলার ক্ষমতার পালাবদলে আমেরিকার ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতেই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সমালোচকদের মতে, নোবেল শান্তি পুরস্কারের মতো আন্তর্জাতিক সম্মানকে এভাবে বিতর্কের কেন্দ্রে টেনে আনা তার মর্যাদাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। তবে, নোবেল কমিটির ব্যাখ্যায় আইনি ও নীতিগত প্রশ্নের উত্তর মিললেও রাজনৈতিক বিতর্ক যে থামবে না, তা স্পষ্ট। মাচাদোর সিদ্ধান্ত ইতিহাসে নজির হয়ে থাকল কি না, তা বলবে সময়ই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Maria Corina Machado, Nobel Peace Prize 2025 | ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রের লড়াইয়ে সাহসী নারী মারিয়া কোরিনা মাচাদো পেলেন ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার




