সংবেদন শীল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, লখনউ : রেলস্টেশন কেবল যাত্রা শুরুর বা শেষের জায়গা নয়, বহু নিখোঁজ শিশুর জন্য দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের নাম। ভিড়, অচেনা মুখ, আর সুযোগের অপেক্ষায় থাকা পাচারচক্র এই সমস্ত কিছুর মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছিল একের পর এক শিশু। ঠিক সেই অন্ধকার জায়গাতেই আলো হয়ে উঠেছেন উত্তরপ্রদেশের রেল সুরক্ষা বাহিনীর (আরপিএফ) মহিলা অফিসার চন্দনা সিং (Chandana Singh)। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিশেষ অভিযানে রাজ্যজুড়ে প্রায় ১৫০০ নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই অসামান্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে রেলের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অতি বিশিষ্ট রেল সেবা’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। রেল সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর ধরেই উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন রেলস্টেশন থেকে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বাড়ছিল। কেউ বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়ে এসে ট্রেনে উঠে পড়ছে, কেউ বা পরিবারের সঙ্গে ভিড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই শিশু পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছিল এই নিখোঁজের ঘটনা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে চন্দনা সিং একটি বিশেষ দল গঠন করেন। এই দলের মূল লক্ষ্য ছিল, রেলস্টেশনে ঘোরাফেরা করা অসহায়, একা বা সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে থাকা শিশুদের চিহ্নিত করা এবং দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়া।
চন্দনার নেতৃত্বে এই অভিযান শুরু হয়েছিল লখনউয়ের চারবাগ স্টেশন (Charbagh Station) থেকে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা রাজ্যে। ২০২৪ সালে তাঁর নেতৃত্বেই শুরু হয় বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন নান্হে ফরিস্তে’ (Operation Nanhe Farishte)। এই অভিযানের মাধ্যমে শুধু নিখোঁজ শিশু উদ্ধার নয়, পাচারচক্রের হদিস করাও ছিল অন্যতম লক্ষ্য। চন্দনা ও তাঁর দল একাধিক শিশু পাচারচক্রের সন্ধান পায় এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়। পরিসংখ্যান বলছে, চন্দনা সিং নিজে সরাসরি ১৫২ জন শিশুকে পাচার হওয়ার হাত থেকে উদ্ধার করেছেন। পাশাপাশি তাঁর নেতৃত্বাধীন দল রাজ্যজুড়ে মোট ১৫০০ শিশুকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই এই দল ১০৩২ জন শিশুকে উদ্ধার করে, যার মধ্যে ৩৯ জন ইতিমধ্যেই পাচার হয়ে গিয়েছিল। তাদেরও নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হয়। এই সংখ্যাগুলি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এর প্রতিটি সংখ্যার পিছনে রয়েছে একটি করে বাঁচানো শৈশব, একটি করে পরিবারে ফেরার গল্প। চন্দনার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন সিনিয়র ডিভিশনাল সিকিউরিটি কমিশনার দেবাংশ শুক্ল (Devansh Shukla)। তাঁর কথায়, ‘চন্দনা যে দলটি তৈরি করেছেন, সেটি অত্যন্ত দক্ষ এবং সংবেদনশীল। পারস্পরিক সমন্বয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বহু অভিযান সফল হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এই দল বহু শিশুকে নতুন জীবন দিয়েছে।’ রেল কর্তৃপক্ষের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করা হবে।
ব্যক্তিগত জীবনেও চন্দনার পথচলা অনুপ্রেরণামূলক। তিনি ছত্তীসগড়ের বিলাসপুর (Bilaspur, Chhattisgarh) জেলার বাসিন্দা। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি কর্মী। ছোটবেলা থেকেই শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা চন্দনা ২০১০ সালে রেল সুরক্ষা বাহিনীতে যোগ দেন। তবে তাঁর এই পেশায় আসার স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল আরও আগে। চন্দনা জানিয়েছেন, আশির দশকের জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘উড়ান’ (Udaan) -এর আইপিএস অফিসার কল্যাণী সিং (Kalyani Singh) চরিত্রটি তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর কথায়, ‘ওই প্রথম আমি একজন মহিলাকে উর্দি পরে দেখেছিলাম। সেই দৃশ্যই আমার জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দিয়েছিল।’ চন্দনার মতে, নিখোঁজ শিশু উদ্ধারের কাজ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি মানবিক দায়িত্বও। অনেক শিশু ভয়, ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। তাদের সঙ্গে কথা বলা, বিশ্বাস অর্জন করা, এই সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন অফিসারের কঠোরতার পাশাপাশি সংবেদনশীল মন থাকা প্রয়োজন। তাঁর দলকেও সেই শিক্ষাই দিয়েছেন চন্দনা।
এই সাফল্যের পরেও থেমে থাকতে চান না চন্দনা সিং। ভবিষ্যতে আরও সংগঠিত ভাবে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। রেলস্টেশনগুলিকে শিশু-বান্ধব করে তোলা, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করার দিকেও জোর দেওয়ার কথা তিনি জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে যখন নিখোঁজ শিশু উদ্ধারের গল্প শোনা যায়, তখন চন্দনা সিংয়ের নাম স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। রেলের সর্বোচ্চ সম্মান শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি প্রমাণ করে যে নিষ্ঠা, সাহস ও মানবিকতার মিলনে কীভাবে সমাজ বদলানো সম্ভব। হাজার হাজার শিশুর চোখে ফিরে আসা হাসিই তাঁর আসল পুরস্কার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Dayanidhi Maran women empowerment remark | নারী ক্ষমতায়নের মঞ্চে উত্তর-দক্ষিণ বিতর্ক, দয়ানিধি মারানের মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে




