শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : গণিতের দুনিয়ায় অনন্য স্বীকৃতি পেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত গবেষক রাজুলা শ্রীবাস্তব (Rajula Srivastava)। ২০২৫ সালের ‘Maryam Mirzakhani New Frontiers Prize’ পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে রাজুলা জার্মানির বিখ্যাত University of Bonn এবং Max Planck Institute for Mathematics-এর হির্জেব্রুখ রিসার্চ ইনস্ট্রাক্টর (Hirzebruch Research Instructor) হিসেবে কর্মরত। হরমনিক অ্যানালিসিস (Harmonic Analysis) ও নাম্বার থিওরির (Number Theory) সংযোগস্থলে তাঁর গবেষণাই তাঁকে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।
এই পুরস্কারটি বিজ্ঞানজগতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সম্মান হিসেবে বিবেচিত। বিশেষত গণিতের তরুণ গবেষকদের জন্য এটি এক বিশাল প্রেরণার উৎস হিসেবে দেখা হয়। এই পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে কিংবদন্তী ইরানি গণিতবিদ মারিয়ম মির্জাখানি (Maryam Mirzakhani)-এর নামে। মারিয়ম ছিলেন প্রথম মহিলা ফিল্ডস মেডেল জয়ী। পুরস্কার ঘোষণার পর রাজুলা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই স্বীকৃতি শুধু আমার কাজের নয়, সেই সমস্ত গবেষকদেরও, যাঁরা গণিতের জটিল শাখাগুলিকে একত্রে এনে নতুন ধারার সৃষ্টি করছেন। মারিয়ম মির্জাখানি আমার অনুপ্রেরণা, তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সম্মান পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
রাজুলা শ্রীবাস্তবের গবেষণা মূলত অ্যানালিটিক নাম্বার থিওরি (Analytic Number Theory) এবং অটোমরফিক ফর্মস (Automorphic Forms) -এর ওপর কেন্দ্রীভূত। তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য গণিতের দুই শাখা: হরমনিক অ্যানালিসিস এবং নাম্বার থিওরি-এর মধ্যে গভীর সম্পর্ক অনুধাবন করা। এই গবেষণার মাধ্যমে তিনি এমন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছেন, যা ভবিষ্যতে গণিতের আরও অনেক জটিল সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে।
গণিত বিশারদদের মতে, রাজুলার গবেষণা আধুনিক গণিতের একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। ইউনিভার্সিটি অব বনের গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর আন্দ্রেয়াস শ্মিট (Andreas Schmidt) বলেন, ‘রাজুলার কাজ তাত্ত্বিক গণিতের জগতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছেন। তিনি গণিতের বিমূর্ত ধারণাগুলিকে এমনভাবে বাস্তব রূপ দিয়েছেন, যা তরুণ গবেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’
‘Maryam Mirzakhani New Frontiers Prize’ সাধারণত সেইসব মহিলা গণিতবিদদের দেওয়া হয়, যাঁরা পিএইচডি-পরবর্তী প্রাথমিক গবেষণার পর্যায়ে থেকেই মৌলিক ও গভীর অবদান রাখেন। এই পুরস্কারের মূল্য এক লক্ষ মার্কিন ডলার, যা গণিত গবেষণায় ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বৃদ্ধির জন্য প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য যে, রাজুলা শ্রীবাস্তব ভারতের দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি গণিতের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। দিল্লি ইউনিভার্সিটি থেকে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি পিএইচডি করেন Princeton University থেকে। এরপর থেকেই তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে। গণিত গবেষণায় তাঁর একাগ্র কাজকে অনেকেই আধুনিক যুগের রামানুজন (Ramanujan) -এর প্রভাবের ধারাবাহিকতা বলে মনে করেন। যেমন একজন গণিতবিদ মন্তব্য করেন, ‘রাজুলা গণিতের বিমূর্ত জগতে যেভাবে ছন্দ ও সংগীতের মতো যুক্তি খুঁজে পান, তা হরমনিক অ্যানালিসিসের নামের সঙ্গে সত্যিই মানানসই।’
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট (Max Planck Institute) -এর ডিরেক্টর প্রফেসর ফ্রান্স উইলকিনসন (Franz Wilkinson) বলেন, ‘রাজুলা শুধু একজন গবেষক নন, তিনি নতুন প্রজন্মের মহিলা গণিতবিদদের অনুপ্রেরণা। তাঁর গবেষণা গণিতের পুরনো ধ্যানধারণা ভেঙে নতুন পথ দেখাচ্ছে।’ আবার, এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে, গণিত আর শুধুমাত্র ‘পুরুষ-প্রধান’ বিষয় নয়। নারীরাও সমান দক্ষতায় জটিলতম তত্ত্ব উদ্ভাবন করে বিশ্বকে চমকে দিতে পারেন। রাজুলার মতো তরুণ গবেষকরা সেই নতুন যুগের প্রতীক। বর্তমানে রাজুলা শ্রীবাস্তব তাঁর গবেষণার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি বক্তা হিসেবেও কাজ করছেন। ভবিষ্যতে তিনি Langlands Program-এর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে কাজ করতে চান বলে সূত্রের খবর।
এই পুরস্কার ঘোষণার পর সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দনের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণিতবিদরা। অনেকে লিখেছেন, ‘রাজুলা গণিতের আকাশে নতুন এক তারা।’ বিশ্বজুড়ে গণিত গবেষণায় ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে। রাজুলা শ্রীবাস্তব সেই ধারায় একটি উজ্জ্বল নাম, তিনি প্রমাণ করলেন, জটিল সংখ্যা আর কঠিন সমীকরণের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে সৌন্দর্য, যুক্তি আর সৃজনশীলতার অনন্য সুর।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Nobel Peace Prize 2025, Maria Corina Machado | নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৫: মারিয়া করিনা মাচাদোর নোবেল জয়, মহাত্মা গান্ধীর অনুপ্রেরণা




