Nobel Peace Prize 2025, Maria Corina Machado | নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৫: মারিয়া করিনা মাচাদোর নোবেল জয়, মহাত্মা গান্ধীর অনুপ্রেরণা

SHARE:

মাচাদো ২০০২ সালে ‘সুমাতে (Sumate)’ নামের একটি নাগরিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, যা ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক বিকাশ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের পক্ষে কাজ করে। সেই সময় থেকেই তিনি বলেছিলেন, 'আমরা বন্দুক নয়, ব্যালটকেই বেছে নিয়েছি (a choice of ballots over bullets)।' রাজনৈতিক নিপীড়ন, কারাবাস ও হুমকির মধ্যেও তিনি একটিবারও পিছিয়ে যাননি। তাঁর ভাষায়, 'গণতন্ত্রের সংগ্রাম মানে কেবল ভোট নয়, মানুষের মর্যাদার জন্য লড়াই।'

শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অন্ধকারে এক টুকরো আলো জ্বেলে বিশ্ববাসীকে তাক লাগালেন বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো (Maria Corina Machado)। ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার (Nobel Peace Prize 2025) জিতে তিনি হয়ে উঠলেন সেই নারীর প্রতীক, যিনি গণতন্ত্রের মশাল হাতে একা লড়ছেন একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার অসলোয় নরওয়ের নোবেল কমিটি এই ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে মারিয়া করিনা মাচাদোকে নিয়ে। কমিটির চেয়ারম্যান ইওরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস (Jorgen Watne Frydnes) জানিয়েছেন, ‘তিনি এমন এক নারী, যিনি অন্ধকারের মধ্যে থেকেও গণতন্ত্রের আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন। একদা বিভক্ত বিরোধী রাজনীতিকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেছেন। তাঁর সাহস ও নেতৃত্বই ভেনেজুয়েলায় স্বাধীনতার প্রতীক।’ এই ঘোষণার পরই বিশ্বজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে প্রশংসা, বিতর্ক ও চমক। কারণ, এই বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের দৌড়ে ছিলেন আরও এক বিতর্কিত নাম, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)।

২০২৫ সালের এই পুরস্কার শুধু এক ব্যক্তির নোবেল জয় নয়, এটি এক দর্শনেরও নোবেল জয়; যেখানে নারী নেতৃত্ব, মানবিক সাহস, এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এক হয়ে গিয়েছে। মারিয়া করিনা মাচাদো প্রমাণ করেছেন, সত্যের পথে হাঁটলে, একদিন না একদিন, ইতিহাস পুরস্কৃত করেই।
নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী, মারিয়া করিনা মাচাদো। ছবি : সংগৃহীত

পুরস্কার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হোয়াইট হাউস থেকে আসে তীব্র প্রতিক্রিয়া। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মুখপাত্র স্টিভেন চুয়াং (Steven Cheung) এক্সে (X) লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তির জন্য কাজ চালিয়ে যাবেন। তিনি যুদ্ধ শেষ করেছেন, প্রাণ বাঁচিয়েছেন, শান্তিচুক্তি এনেছেন। তাঁর মতো মানবিক নেতা পৃথিবীতে আর কেউ নেই, যিনি ইচ্ছাশক্তির জোরে পর্বত সরাতে পারেন।’ তবে নোবেল কমিটি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে, ‘আমরা রাজনৈতিক প্রভাব নয়, মানবিক ও গণতান্ত্রিক সাহসের স্বীকৃতি দিয়েছি,’ জানানো হয় সরকারি বিবৃতিতে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের সক্রিয় প্রচার ও লবিং এবার ব্যর্থ হয়েছে, কারণ নোবেল কমিটি স্পষ্টভাবে স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামকে গুরুত্ব দিয়েছে।

https://x.com/MariaCorinaYA/status/13221218315?ref_src=twsrc%5Etfw%7Ctwcamp%5Etweetembed%7Ctwterm%5E13221218315%7Ctwgr%5E36f179d112310e7d9d42a8ebfff49830b969d7d8%7Ctwcon%5Es1_c10&ref_url=https%3A%2F%2Fd-4243729537890729064.ampproject.net%2F2509031727000%2Fframe.html

ভাইরাল হল মারিয়ার পুরনো পোস্ট। এই পুরস্কারের পর হঠাৎই ভাইরাল হয়ে ওঠে মারিয়া করিনা মাচাদোর ২০১০ সালের একটি পুরনো এক্স (X) পোস্ট। তাতে তিনি উদ্ধৃত করেছিলেন মহাত্মা গান্ধীর (Mahatma Gandhi) এক বিখ্যাত উক্তি: “প্রায় সবকিছুই আমি যা করি, তা তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু সেটি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” স্প্যানিশ ভাষায় পোস্ট করা এই উদ্ধৃতি সেই সময় খুব একটা নজরে আসেনি, কিন্তু আজ, গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে ওঠার পর, সেটিই যেন তাঁর সংগ্রামের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, মহাত্মা গান্ধীর এই কথার মর্মার্থ, ছোট পদক্ষেপ হয়ত বিশাল পরিবর্তন আনে না, কিন্তু কর্মই পরিবর্তনের শুরু।
মারিয়ার রাজনৈতিক জীবনও যেন সেই দর্শনেরই প্রতিফলন, ছোট ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু করে আজ আন্তর্জাতিক সম্মান।

মহাত্মা গান্ধী ও নোবেল: অপূর্ণ এক অধ্যায় 

অবাক হওয়ার বিষয়, যাঁর উক্তি আজ নোবেলজয়ীর অনুপ্রেরণা, সেই মহাত্মা গান্ধীই কখনও পাননি নোবেল শান্তি পুরস্কার। মহাত্মা গান্ধীকে নোবেল মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল ১৯৩৭, ১৯৩৮, ১৯৩৯, ১৯৪৭ এবং ১৯৪৮ সালে, ঠিক তাঁর হত্যার কয়েক দিন আগে। তবুও নোবেল পুরস্কার তাঁর হাতে ওঠেনি। নোবেল কমিটির যুক্তি ছিল, গান্ধীর আন্দোলন ছিল রাজনীতি, ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের মিশ্রণ, যা তাদের প্রচলিত মানদণ্ডে পড়ত না। তাছাড়া, তিনি আন্তর্জাতিক শান্তিচুক্তির আলোচনায় যুক্ত ছিলেন না, কিংবা মানবিক সাহায্য সংস্থার প্রতিনিধি ছিলেন না। তবে আজ, মারিয়া করিনা মাচাদোর পুরস্কার যেন সেই ঐতিহাসিক অপূর্ণতাকে নতুনভাবে ছুঁয়ে গেল।

কে এই মারিয়া করিনা মাচাদো? 

১৯৬৭ সালে জন্ম মারিয়া করিনা মাচাদোর। ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফাইন্যান্সে পড়াশোনা করেছেন। বাণিজ্য জগত থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ তাঁর এক সাহসী সিদ্ধান্ত। ১৯৯২ সালে তিনি গড়ে তোলেন আতেনিয়া ফাউন্ডেশন (Atenea Foundation), যার লক্ষ্য ছিল কারাকাসের রাস্তার শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসন।পরবর্তীতে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী শিবিরের সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠ। নিকোলাস মাদুরো (Nicolas Maduro) -এর বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন। তাঁর দল ‘ভেন্তে ভেনেজুয়েলা’ (Vente Venezuela) দেশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে আন্দোলন চালায়।রাজনৈতিক নির্যাতন, গ্রেফতারি পরোয়ানা, হুমকি এসবকিছুর মধ্যেও তিনি দেশে থাকেন, জনগণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। তাঁর কথায়, ‘গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়, এটি ভয়কে জয় করার নাম।’

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং লাতিন আমেরিকার নানা সংগঠন মারিয়া করিনা মাচাদো -এর এই পুরস্কার প্রাপ্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। ইউরোপীয় সংসদের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘এটি শুধু একজন নারীর জয় নয়, এটি সমগ্র লাতিন আমেরিকার জনগণের স্বাধীনতার জয়।’ অন্যদিকে, অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই পুরস্কার ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নতুন দিশা দেখাবে। দেশটির সাধারণ মানুষও সোশ্যাল মিডিয়ায় আনন্দে ভাসছে। কারাকাসে রাস্তায় ব্যানার, পোস্টার, আলো, সব জায়গায় এখন একটিই মুখ, একটিই স্লোগান: ‘Democracia es Maria’ (গণতন্ত্র মানেই মারিয়া)।

মহাত্মা গান্ধীর উত্তরাধিকার ও মারিয়ার পথচলা 

এই দুই ব্যক্তিত্ব, একজন ভারতের অহিংস সংগ্রামের প্রতীক, অন্যজন লাতিন আমেরিকার গণতন্ত্রের যোদ্ধা। তাদের সময় ও ভৌগোলিক দূরত্ব আলাদা, কিন্তু দর্শন এক, হিংসা নয়, সাহস ও নৈতিকতার শক্তি।
মারিয়া করিনা মাচাদো এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,
‘গান্ধী আমাকে শিখিয়েছেন, ভয়কে জয় করার একমাত্র উপায় হল সত্য ও অধ্যবসায়। কখনও কখনও ছোট পদক্ষেপই ইতিহাস বদলায়।’ হ্যাঁ, আজ তাঁর সেই পদক্ষেপ নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখেছে।

রাজনীতির চেয়েও বড় বার্তা

২০২৫ সালের এই পুরস্কার শুধু এক ব্যক্তির নোবেল জয় নয়, এটি এক দর্শনেরও নোবেল জয়; যেখানে নারী নেতৃত্ব, মানবিক সাহস, এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এক হয়ে গিয়েছে। মারিয়া করিনা মাচাদো প্রমাণ করেছেন, সত্যের পথে হাঁটলে, একদিন না একদিন, ইতিহাস পুরস্কৃত করেই। নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৫ তাই একদিকে যখন বিশ্বের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি করেছে, অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধী -এর নীতি ও মানবতার পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে। গান্ধীর যে ‘তুচ্ছ’ কাজ একদিন মানবতার ইতিহাস বদলেছিল, আজ তারই ছায়া দেখা গেল এক ভেনেজুয়েলান নারীর সংগ্রামে।

ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Maria Corina Machado, Nobel Peace Prize 2025 | ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রের লড়াইয়ে সাহসী নারী মারিয়া কোরিনা মাচাদো পেলেন ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment