সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নিজস্ব সংবাদদাতা ★ কলকাতা : শহরের রাজনীতিতে বৃহস্পতিবার সকাল শুরু হতেই চাঞ্চল্য। ভোর ছ’টা নাগাদ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট -এর আধিকারিকেরা হানা দেন ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আই-প্যাক (I-PAC) -এর কর্ণধার ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক জৈনের (Pratik Jain) বাড়িতে। কেন্দ্রীয় সংস্থার এই তল্লাশি ঘিরে মুহূর্তের মধ্যেই রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) নিজেও প্রতীক জৈনের বাড়িতে পৌঁছন বলে জানা যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কে এই প্রতীক জৈন, কী তাঁর পটভূমি, আর তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress- TMC ) সঙ্গে তাঁর সম্পর্কই বা কতটা গভীর?

রাজনৈতিক পরামর্শক সংস্থা আই-প্যাক গত এক দশকে দেশের একাধিক রাজ্যের নির্বাচনী কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। সেই সংস্থার অন্যতম প্রধান মুখ প্রতীক জৈন বরাবরই থেকেছেন পর্দার আড়ালে। কিন্তু সাম্প্রতিক ইডি অভিযান তাঁকে হঠাৎই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে। প্রতীক জৈনের শিক্ষাজীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তিনি মূলত প্রযুক্তিগত শিক্ষায় শিক্ষিত। লিঙ্কডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০০৮ সালে তিনি সুযোগ পান মুম্বইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা আইআইটি বম্বেte (IIT Bombay)। সেখান থেকে তিনি মেটালার্জিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেটেরিয়াল সায়েন্সে বি.টেক সম্পন্ন করেন। দেশের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা প্রতীক জৈনের বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও তথ্যভিত্তিক কাজের ঝোঁক সেখান থেকেই তৈরি হয় বলে মনে করেন অনেকেই।
পড়াশোনা শেষ করার পর প্রতীক জৈনের কর্মজীবনের শুরু হয় কর্পোরেট দুনিয়ায়। মুম্বইয়ে অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের (Axis Bank) অধীন অ্যাক্সিস মিউচুয়াল ফান্ডে তিনি দুই মাসের জন্য ইন্টার্নশিপ করেন। আর্থিক বাজার ও ডেটা বিশ্লেষণের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা সেখানেই অর্জন করেন তিনি। পরে ২০১২ সালে ডেলয়েট টাচ তোহমাতসু ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড-এ (Deloitte Touche Tohmatsu India Pvt Ltd) অ্যানালিস্ট হিসেবে যোগ দেন। প্রায় এক বছর তিন মাস তিনি সেখানে কাজ করেন। কর্পোরেট পরিসরে কাজ করার সময়েই নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক কাঠামো এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে তাঁর পরিচয় আরও গভীর হয়। উল্লেখ্য, কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে প্রতীক জৈন ধীরে ধীরে সমাজ ও রাজনীতিমুখী কাজে যুক্ত হন। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ‘সিটিজেন্স ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্ন্যান্স’ (Citizens for Accountable Governance) নামে একটি সংগঠন তৈরি করেন। এটি মূলত তাঁর নিজের উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি প্ল্যাটফর্ম, যার লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানো। ২০১৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তিনি এই সংস্থার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
এই সময়েই তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় রাজনৈতিক কৌশলবিদ প্রশান্ত কিশোরের (Prashant Kishor) সঙ্গে। দু’জনের যৌথ উদ্যোগেই গড়ে ওঠে ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আই-প্যাক। প্রতীক জৈন এই সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেন। বিগত দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি আই-প্যাকের কৌশল নির্ধারণ ও সংগঠনের পরিচালন কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আই-প্যাকের ব্যানারে প্রতীক জৈন একাধিক রাজ্যের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিহার (Bihar), পঞ্জাব (Punjab), উত্তর প্রদেশ (Uttar Pradesh) এবং অন্ধ্র প্রদেশ (Andhra Pradesh) -এর বিধানসভা ও রাজনৈতিক প্রচারে আই-প্যাকের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তথ্য বিশ্লেষণ, বুথভিত্তিক পরিকল্পনা, জনমত সমীক্ষা ও প্রচার কৌশল, এই সব ক্ষেত্রেই প্রতীক জৈনের দল কাজ করেছে বলে জানা যায়।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আই-প্যাকের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয় ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময়। তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটকৌশল তৈরিতে আই-প্যাক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিল। সেই সূত্রেই প্রতীক জৈনের নাম রাজ্য রাজনীতিতে পরিচিত হয়ে ওঠে। যদিও তিনি নিজে কখনও সরাসরি কোনও রাজনৈতিক পদে নেই, তবে নেপথ্যের কৌশল নির্ধারক হিসেবেই তাঁর পরিচিতি।
প্রসঙ্গত, ইডি-র হানা এবং মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি নতুন করে এই সম্পর্ককে সামনে এনে দিয়েছে। বিরোধীদের একাংশ দাবি করছে, রাজনৈতিক সংযোগের কারণেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এত আলোচনা। অন্যদিকে তৃণমূল শিবিরের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সংস্থা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে অভিযান চালাচ্ছে। প্রতীক জৈন জাতীয় রাজনীতির একটি আলোচিত নাম। প্রযুক্তিগত শিক্ষায় দীক্ষিত এই যুবক কীভাবে কর্পোরেট দুনিয়া পেরিয়ে দেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলকার হয়ে উঠলেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন আগ্রহী রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ। ইডি অভিযানের পরবর্তী পর্বে কী হয়, তার দিকেই নজর থাকবে সকলের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee, ED Raid, I-PAC Office | ইডি হানার প্রতিবাদে আই-প্যাক দফতরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা, কেন্দ্রকে তীব্র আক্রমণ




