সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে সোমবার একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ বিল পেশ করে বড় নীতিগত সংস্কারের ইঙ্গিত দিল কেন্দ্রীয় সরকার। লোকসভায় মোট তিনটি নতুন বিল উত্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিলটি হল নাগরিক পরমাণু শক্তি ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণের পথ খুলে দেওয়ার প্রস্তাব। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বশাসিত ও স্বাধীন করার লক্ষ্যে আনা হয়েছে নতুন শিক্ষা বিল। অপ্রয়োজনীয় ও অচল আইন বাতিল করতেও তৃতীয় একটি বিল পেশ হয়েছে। এই তিনটি বিল ঘিরে সংসদের ভিতরে যেমন চর্চা শুরু হয়েছে, তেমনই রাজনৈতিক মহলেও তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
সোমবার লোকসভায় যে বিলগুলি পেশ করা হয়, তার মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রের সংস্কার সংক্রান্ত বিলটি এনেছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান (Dharmendra Pradhan)। ‘বিকসিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল’ (Viksit Bharat Shiksha Adhishthan Bill) নামে এই প্রস্তাবিত আইনটির লক্ষ্য, দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আরও স্বাধীন ও স্বশাসিত করে তোলা। সরকারের দাবি, এই বিল কার্যকর হলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি প্রশাসনিক ও একাডেমিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা পাবে। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে গুণগত মান বজায় রাখা হবে। ধর্মেন্দ্র প্রধান সংসদে বিলটি পেশ করে বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তুলতেই এই উদ্যোগ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে যদি প্রকৃত অর্থে বিশ্বমানের করে তুলতে হয়, তবে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া জরুরি।’ সরকারের মতে, এই বিল ‘বিকসিত ভারত’-এর স্বপ্ন পূরণে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হতে চলেছে।
অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে নাগরিক পরমাণু শক্তি সংক্রান্ত বিলটি। ‘সাসটেইনেবল হারনেসিং অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অফ নিউক্লিয়ার এনার্জি ফর ট্রান্সফর্মিং ইন্ডিয়া’ বা সংক্ষেপে ‘শান্তি বিল’ (Sustainable Harnessing and Advancement of Nuclear Energy for Transforming India – SHANTI Bill) পেশ করেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং (Jitendra Singh)। এই বিলের মূল উদ্দেশ্য হল দেশের নাগরিক পরমাণু শক্তি ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা এবং বিদ্যমান দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন আনা। জিতেন্দ্র সিং সংসদে জানান, ‘এই বিলের মাধ্যমে পরমাণু ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত সিভিল লায়াবিলিটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।’ তাঁর কথায়, বর্তমান আইন কাঠামো বহু ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নতুন প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে সেই জটিলতা দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই বিল কার্যকর হলে ১৯৬২ সালের পরমাণু শক্তি আইন (Atomic Energy Act, 1962) এবং ২০১০ সালের নাগরিক পরমাণু ক্ষয়ক্ষতি দায় আইন (Civil Liability for Nuclear Damage Act, 2010) বাতিল হয়ে যাবে। শান্তি বিলের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি বোর্ডকে (Atomic Energy Regulatory Board) আইনি স্বীকৃতি দেওয়া। সরকারের মতে, এর ফলে পরমাণু নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হবে। যদিও বিরোধী শিবিরের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বেসরকারি সংস্থার প্রবেশে নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে।
তৃতীয় যে বিলটি লোকসভায় পেশ হয়েছে, সেটি আইন ব্যবস্থার সরলীকরণ সংক্রান্ত। আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল (Arjun Ram Meghwal) ‘রিপিলিং অ্যান্ড অ্যামেন্ডিং বিল, ২০২৫’ (Repealing and Amending Bill, 2025) পেশ করেন। এই বিলের মাধ্যমে মোট ৭১টি আইন বাতিল করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেগুলি সরকারের মতে এখন অপ্রাসঙ্গিক ও অচল হয়ে পড়েছে। এই ৭১টির মধ্যে ৬৫টি মূল আইনের সংশোধনী এবং ছ’টি সম্পূর্ণ আইন।সরকারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আইন বইয়ে পড়ে থাকা এই সব আইন প্রশাসনিক জটিলতা বাড়াচ্ছে। সেগুলি বাতিল হলে আইনি কাঠামো আরও সরল ও কার্যকর হবে। তবে এই বিল ঘিরেও সংসদে বিরোধিতা দেখা গিয়েছে। কংগ্রেস সাংসদ মনীশ তেওয়ারি (Manish Tewari), এন কে প্রেমচন্দ্রন (N K Premachandran), তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সৌগত রায় (Saugata Roy) এবং জোথিমণি (Jothimani) বিলগুলির বিরোধিতা করেন। তাঁদের অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলির খসড়া খুব দেরিতে সাংসদদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত সময় না পেয়ে তাঁরা বিলগুলি ভালভাবে খতিয়ে দেখতে পারেননি। বিরোধীদের মতে, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এই ধরনের তাড়াহুড়ো গ্রহণযোগ্য নয়। উল্লেখ্য যে, একদিনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পেশ করে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, নীতি সংস্কারের গতি আরও বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। শিক্ষা থেকে পরমাণু শক্তি এবং আইন সংস্কার, এই তিন ক্ষেত্রেই সরকার যে বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চাইছে, তা এই বিলগুলির মাধ্যমেই স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, সংসদের আলোচনার পর এই বিলগুলি কী রূপ নেয় এবং বিরোধীদের আপত্তি কতটা গুরুত্ব পায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : DA, 8th Pay Commission India | ডিএ-বেসিক মার্জার নিয়ে জল্পনা শেষ! লোকসভায় কেন্দ্রের স্পষ্ট বার্তা, এখনই ভাবনা নেই




