সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ স্টাফ রিপোর্টার, তিরুবন্তপুরম : কেরলের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক মোড়। চার দশকের বাম প্রভাব ভেঙে তিরুবন্তপুরম পুরসভা নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party)। ১০১ সদস্যের পুরসভায় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসার পর থেকেই প্রশ্ন একটাই, তিরুবন্তপুরমের মেয়র কে হচ্ছেন? রাজনৈতিক মহলের জোরালো জল্পনা, এই পদে বসতে পারেন কেরলের প্রথম মহিলা আইপিএস এবং প্রাক্তন ডিজিপি আর শ্রীলেখা (R Sreelekha)।
গত শনিবার ভোটের ফল ঘোষণার পর কেরলের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে পরিবর্তনের ছবি ফুটে উঠেছে, তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপি একাই জিতেছে ৫০টি ওয়ার্ডে। বিপরীতে সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন এলডিএফ (LDF) পেয়েছে ২৯টি আসন এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ (UDF) থেমেছে ১৯-এ। এই ফলকে অনেকেই কেরলের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে ব্যাখ্যা করছেন। অন্যদিকে, এই ঐতিহাসিক জয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন ষষ্ঠমঙ্গলম (Sasthamangalam) ওয়ার্ডের বিজয়ী প্রার্থী আর শ্রীলেখা। নির্বাচনে এলডিএফ প্রার্থীকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে তিনি জয়ী হয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, এই ওয়ার্ডে এত বড় ব্যবধানে জয় আগে কখনও দেখেনি তিরুবন্তপুরম। স্বাভাবিকভাবেই মেয়র পদের সম্ভাব্য মুখ হিসেবে তাঁর নামই সবার আগে উঠে আসছে। এই প্রসঙ্গে আর শ্রীলেখা বলেন, “আমরা জেনেছি ষষ্ঠমঙ্গলম ওয়ার্ডে এত বড় ব্যবধানে কেউ কখনও জয়ী হননি। এই জয় একার নয়, এলাকার মানুষের জয়। আমি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ।” একই সঙ্গে বিরোধীদের আক্রমণের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, “নির্বাচনের সময় এলডিএফ এবং কংগ্রেস আমাকে কালিমালিপ্ত করার জন্য কোনও চেষ্টা বাকি রাখেনি। কিন্তু মানুষ তাঁদের সেই প্রচেষ্টার উপযুক্ত জবাব দিয়েছে।” মেয়র পদ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শ্রীলেখার সাফ কথা, “দল যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমি তা মাথা পেতে নেব।”
কে এই আর শ্রীলেখা, যাঁকে ঘিরে এখন তিরুবন্তপুরমের রাজনীতি উত্তাল? জন্ম ও বেড়ে ওঠা কেরলের রাজধানী শহরেই। ১৯৮৭ সালে ইতিহাস গড়ে কেরলের প্রথম মহিলা আইপিএস (Indian Police Service) অফিসার হিসেবে তিনি দায়িত্ব নেন। সেই সময় রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। সেই প্রেক্ষাপটে শ্রীলেখার উত্থান।
আরও পড়ুন : Thiruvananthapuram BJP win, Kerala municipal election 2025 | কেরল পুরভোট ২০২৫: তিরুবন্তপুরমে বিজেপির জয়, সামগ্রিকভাবে এগিয়ে কংগ্রেস
উল্লেখ্য, তিন দশকের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি কেরালার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেরালা পুলিশ, সিবিআই (CBI), কেরালা ক্রাইম ব্রাঞ্চ (Kerala Crime Branch), ভিজিল্যান্স (Vigilance), ফায়ার ফোর্স (Fire Force) এবং মোটরযান বিভাগ (Motor Vehicles Department) প্রায় সর্বত্রই তাঁর কাজের ছাপ স্পষ্ট। সিবিআইতে থাকাকালীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযানের জন্য তিনি পরিচিতি পান ‘রেইড শ্রীলেখা’ (Raid Sreelekha) নামে। প্রশাসনিক মহলে তাঁর সুনাম ছিল আপসহীন ও কঠোর আধিকারিক হিসেবে।
২০১৭ সালে তিনি কেরালা পুলিশের ডিজিপি (Director General of Police) পদে নিযুক্ত হন। এই পদে বসেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। সহকর্মী থেকে সাধারণ মানুষ, অনেকেই তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন। অবসর গ্রহণের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি হয়ত নীরব জীবনেই ফিরে যাবেন। কিন্তু ২০২৪ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নামার পর সেই ধারণা ভেঙে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শ্রীলেখার মতো একজন প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেত্রীকে সামনে রেখে বিজেপি কেরলে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চাইছে। বিশেষ করে তিরুঅনন্তপুরমের মতো শহরে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বামেদের আধিপত্য ছিল, সেখানে এই জয় বিজেপির কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপির অন্দরমহলেও শ্রীলেখার নাম ঘিরে উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের প্রবীণ একজন নেতা বলেন, “তিরুবন্তপুরমে এই জয় শুধু সংখ্যা নয়, বার্তাও। আর শ্রীলেখার মতো ব্যক্তিত্ব মেয়র হলে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা, দুটোই একসঙ্গে পাওয়া যাবে।” তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বাকি। দলীয় বৈঠক ও সমীকরণের পরই মেয়র পদের নাম ঘোষণা হবে। কিন্তু সব জল্পনা ছাপিয়ে একটাই সত্য, কেরলের রাজধানী শহরে বামদুর্গ ভেঙে বিজেপির উত্থানের মুখ হয়ে উঠেছেন আর শ্রীলেখা। ডিজিপি থেকে বিজেপি নেত্রী, আর এবার সম্ভাব্য মেয়র, এই যাত্রা কেরলের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে এক নজিরবিহীন অধ্যায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi praises Devabrata | কাশীতে তরুণ দেবব্রতর বৈদিক সাধনায় দেশ গর্বিত, প্রশংসায় মুখর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী




