সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বহরমপুর : বহরমপুরের রাজনৈতিক আবহ বৃহস্পতিবার বদলে গেল। জনস্রোতে ভরা সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) একের পর এক ইস্যুতে সুর চড়ালেন। সংখ্যালঘু অধিকার, ওয়াকফ সম্পত্তি, এসআইআর বিতর্ক, নাগরিকত্ব প্রসঙ্গ, গঙ্গা ভাঙন, কেন্দ্রীয় এজেন্সি, বিজেপি (BJP) -এর রাজনীতি কোনও ক্ষেত্রই বাদ গেল না তাঁর দীর্ঘ ভাষণে। মুখ্যমন্ত্রীর পরিষ্কার বার্তা, ‘বাংলার মানুষকে ভয় দেখিয়ে দমন করা যাবে না। নিরাপত্তা, অধিকার, সম্মান, সব রক্ষা করবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বাংলাকে দমন করতে পারছিল না বলে আগে রাজধানী স্থানান্তর করেছিল। ওয়াকফ (Waqf) নিয়ে যে যা প্রচার করুক, কান দেবেন না। নির্দলদের ভোট দেবেন না। ভোট নিজেরাই তুলবেন। কেউ কেউ বলছে সংখ্যালঘুদের ভোট কেন উঠবে? বেশি করে উঠবে। বাংলা সবসময় হৃদয়ের ভাষা। এখানে রোহিঙ্গা নেই। রোহিঙ্গা আছে বাংলাদেশে, অসমে। এসআইআর নিয়ে ভয় পাবেন না, কাগজপত্র ঠিক রাখলেই হবে। অমিত শাহ (Amit Shah) চালাকি করেছে। আমরা এতটা ‘বোকা’ নই। আমাদের ভাতে মারা যাবে না। কারও সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হবে না। যারা বিতাড়িত, তাদেরও ফিরিয়ে আনা হবে, যেমন মৎস্যজীবীদের ফিরিয়ে এনেছিলাম।’
সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে বিজেপিকে আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ‘বিজেপির অনেক মিডিয়া আছে। সবাই খারাপ নয়, তবে অনেকেই মানুষের মাথায় ভুল কথা ঢুকিয়ে দেয়। ভোটের আগে টাকা খেয়ে বিজেপির তাঁবেদারি করে-এরা দেশের শত্রু।’ বীরভূমে নিজের জন্মের প্রসঙ্গও টেনে এনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বর্ডারে জন্মেছি। তাই আমায় অনেকেই বাংলাদেশি বলত। ছিন্নমূল মানুষেরা আমার হৃদয়ের মানুষ। গলা কেটে দিলে ডিটেনশন ক্যাম্প করব না। রোহিঙ্গা কীভাবে আসবে? মিজোরাম-মণিপুর দিয়ে? বর্ডারে তো বিএসএফ (BSF), আইটিবিপি (ITBP) সবই কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ।’ আত্মনির্ভরতার কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘১২ লক্ষ সেল্ফ হেল্প গ্রুপের মহিলারা আজ স্বনির্ভর। সরকার জেলার জেলায় নতুন শপিং মল করছে, যার দু’টি তলা থাকবে মহিলাদের জন্য।’
সভায় ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে ছড়ানো গুজবকে ‘মিথ্যা’ বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘কাটেক্টরে খাতিয়ান নম্বর ১-এ নাকি মসজিদ, কবরস্থান নথিভুক্ত করা হয়েছে, এটা পুরো মিথ্যা। সব ধর্মেই কিছু গদ্দার থাকে। বিজেপির টাকা খেয়ে মিথ্যা প্রচার করে। এআই (AI) ব্যবহার করে ভুয়ো খবর ছড়াচ্ছে। গ্রামের মানুষই সব বোঝেন।’ ওয়াকফ-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘৮২ হাজার ওয়াকফ সম্পত্তি আমাদের আসার আগেই কেন্দ্রীয় পোর্টালে ছিল। আমরা নতুন WMC পোর্টাল করেছি। এখন আপলোড করার দায়িত্ব মতুয়ালিদের। আমরা সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছি যাতে আপলোডের দায়িত্ব সঠিকভাবে বণ্টন হয়। কোনও সম্পত্তি দখল করা যাবে না- নিশ্চিন্তে থাকুন।’
এসআইআর প্রসঙ্গে ফের বিজেপিকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এসআইআর, এ ৪০ জন মারা গেছেন। তাঁদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা দেব। যাঁরা হাসপাতালে আছেন, তাঁদের ১ লক্ষ। বিজেপি সংখ্যালঘু তাড়ানোর রাজনীতি করছে। বিহারে যে ১০ হাজার টাকা দিল ভোটের আগে, ভোট শেষ হতেই বুলডোজার চালাল।’ এরপর নিজের ধর্মীয় অবস্থানও স্পষ্ট করে দেন তিনি, ‘রমজানে গেলে আমাকে কেউ হিজাবি বলে। গুরুদ্বারে মাথায় কাপড় দিই—তখন বলে না। আদিবাসীদের অনুষ্ঠানে তাঁদের পোশাক পরি সম্মান করে। আমি যতদিন বাঁচব সব ধর্মকেই সম্মান করব। পুরহিতদের পাশাপাশি মোয়াজ্জেমদের ভাতা দিই। মুসলিম কবরস্থানও করেছি, আবার জগন্নাথ ধামও করি,’ বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
জনসভায় নাগরিকত্ব প্রসঙ্গ ঘিরে ‘ভোটার লিস্ট’ বিষয়েও কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী।
‘যতক্ষণ আপনারা সবাই নাম না তুলবেন, ততক্ষণ আমিও ভোটার লিস্টে নাম তুলব না। কোথাও সার্ভার ডাউন করে দিচ্ছে। হেয়ারিংয়ে ডাকলে যাবেন, নয়তো নাম কেটে দিয়ে বলবে নাগরিক নন। আমরা গ্রামসভায় ‘May I Help You’ ক্যাম্প করছি, যাঁদের যাঁদের সমস্যা আছে বলে দিন।’ তিজি গঙ্গাভাঙন প্রসঙ্গে কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও তোলেন।
‘ফরাক্কার ড্রেজিংয়ের জন্য ৭০০ কোটি দেবে বলেছিল, দেয়নি। ভাঙন রোধে দেড় হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা পাঠিয়েছি, উত্তর আসেনি। নদী ভাঙনে ২০০ কোটি বরাদ্দ করে ১৭টি স্কিম চলছে।’ এর পরেই তিনি জানান, ‘ছানাবড়া GI ট্যাগ পেয়েছে। প্রায় ৪০টি পণ্য আমাদের আমলে GI পেয়েছে। সাগরদিঘির ৬৬০ মেগাওয়াট পাওয়ার ইউনিট ১০ ডিসেম্বর থেকে বিদ্যুৎ দেবে। এই প্রকল্পে ২৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।’
ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বাবা সাহেব আম্বেদকর (B. R. Ambedkar) বাংলা থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। গান্ধিজি (Mahatma Gandhi) গুজরাটে জন্মালেও বাংলায় পড়ে থাকতেন। নেতাজির (Subhas Chandra Bose) ডানহাত ছিলেন শাহনাওয়াজ খান (Shahnawaz Khan)। এখন রাজ্যসভায় নোটিফিকেশন দিয়েছে, বন্দে মাতরম গাওয়া যাবে না!”
মুর্শিদাবাদের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা স্মরণ করিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বললেন, “মুর্শিদাবাদ অশান্তির রাজনীতি পছন্দ করে না। ধুলিয়ানের ঘটনার পর আমি সঙ্গে সঙ্গে এসেছিলাম। জঙ্গিপুরে একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল, ফোনে জাকিরদের বলেছিলাম, হিন্দুদের রক্ষা করো। মেজরিটি সবসময় মাইনরিটিকে রক্ষা করবে, এটাই বাংলা।’ প্রসঙ্গত, ২০২৫-এর ভোটকে কেন্দ্র করে তৃণমূল সুপ্রিমোর লড়াই আরও তীব্র হবে, আর বহরমপুরের সভা তার প্রস্তুতির অন্যতম বড় ইঙ্গিত।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee reaction, Primary teacher recruitment verdict | ‘চাকরি দেওয়া দরকার, খেয়ে নেওয়া নয়’ : হাই কোর্টের রায়ে স্বস্তির সুর মুখ্যমন্ত্রী মমতার গলায়




